ফিকহ্ মুহাম্মদী
আল্লামা মহিউদ্দীন
ফিকহ্ মুহাম্মদী [১ম ও ২য় খন্ড]
আল্লামা মহিউদ্দীন
অনুবাদ : মাওলানা মুহাম্মদ শামাউন আলী
লিসান্স মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব
প্রকাশনায়
আহসান পাবলিকেশন
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের সম্মানিত (সাবেক) সভাপতি (মরহুম) আল্লামা ডক্টর মুহাম্মদ আব্দুল বারী সাহেবের
অভিমত
স্নেহভাজন মাওলানা মুহাম্মদ শামাউন আলী উপমহাদেশে বহুল পঠিত ও সমাদৃত এবং মুসলিম ব্যবহারিক জীবনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উর্দু ভাষায় লিখিত ফিক্হ মুহাম্মাদী গ্রন্থটি বাংলায় তরজমা করেছেন জেনে আমি আনন্দিত। তার তরজমা দেখার তেমন সুযোগ আমার হয়নি। তবে আমি নিশ্চিত যে, বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষায় তার দখল এবং কুর’আন ও হাদীসে তার জ্ঞান তাকে একটি সুন্দর অনুবাদগ্রন্থ উপহার দিতে সাহায্য করবে।
ফিকহ্ন মুহাম্মাদী ইতিপূর্বে কয়েকজনই অনুবাদ করেছেন তবে আমার জানামতে এ পর্যন্ত কেউই সমগ্র গ্রন্থটির অনুবাদ প্রকাশ করতে সমর্থ হননি। মুসলিম জীবনে চলার পথে সকল হিদায়াতের দুই মৌল উৎস আল কুরআনুল কারীম এবং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের হাদীসকে ভিত্তি করে রচিত আল্লামা মুহীযূদ্দীনের এই গ্রন্থটির পূর্ণ তরজমা প্রকাশিত হলে এদেশের মুসলিমরা অশেষ উপকৃত হবেন। এই খেদমত আঞ্জাম দেয়ার জন্য আমি শামাউন আলীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাই এবং দো’আ করি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার এই উদ্যোগকে কবুল করুন।
ওয়া আখিরু দা’ওয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।
মুহাম্মদ আবদুল বারী
সভাপতি
বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস
ঢাকা, ৭ই জানুয়ারী ১৯৯৩।
ভূমিকা
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অসংখ্য শুকর দীর্ঘ প্রত্যাশার পর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য একটি দূর্লভ ফেকাহ গ্রন্থ বাংলা ভাষায় বের হতে পারছে। আল্লামা মহিউদ্দীন সাহেব প্রণীত ফিকহ মুহাম্মদী কিতাবটির প্রতিটি বক্তব্য হাদীসের দলীল দিয়ে লিখা। এ ধরনের ফিকাহর কিতাব ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের দীর্ঘ দিনের দাবী। যাঁরা আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন -কায়েম করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের পথ বাছাই করে নিয়েছেন তাঁরা সর্বাবস্থায় সতর্কভাবে চলতে চান। যাতে চোরাগলির কোন ছিদ্র পথ দিয়ে বাস্তব জীবনের ছোট বড় কোন ক্ষেত্রেই শিরক, বিদআত বা প্রচলিত কোন গুমরাহী তাদেরকে স্পর্শ করতে না পারে। এ জন্য তাদেরকে মেনে চলতে হবে:
১. হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নিকট হতে যে হিদায়াত ও আইন বিধান প্রামাণ্য সূত্রে পাওয়া যাবে তা দ্বিধাহীন ও অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করা।
২. কোন কাজে উদ্যোগী হওয়া বা কোন নিয়মপদ্ধতি অনুসরণ হতে বিরত থাকার জন্য রাসূল (সা.) এর নিকট হতে প্রাপ্ত আদেশ বা নিষেধকেই যথেষ্ট মনে করা।
৩. রাসূলুল্লাহ (সা.) ব্যতীত অপর কারো স্বয়ংসম্পূর্ণ নেতৃত্ব মেনে না নেয়া।
৪. জীবনের সকল ব্যাপারেই আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাতকে অকাট্য প্রমাণ, বিশ্বস্তসূত্র ও নির্ভুল জ্ঞানের একমাত্র উৎস গণ্য করা।
৫. মন মগজকে এমনভাবে মুক্ত করা ও কারো ভালবাসা বা অন্ধ ভক্তিতে এমনভাবে বন্দী না হওয়া যার দরুন তা রাসূল (সা.) এর উপস্থাপিত সত্যের প্রতি ভালবাসা ও ভক্তির উপর জয়ী কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৬. মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর জীবন চরিতকে কুরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা এবং উহাকেই সকল ব্যাপারে সত্যের একমাত্র মাপকাঠি (মি’য়ারে হক) হিসেবে মেনে নেয়া। আল্লাহর রাসূল ব্যতীত আর কাকেও ভুলের উর্ধে মনে না করা। কারো অন্ধ গোলামীতে নিমজ্জিত না হওয়া বরং প্রত্যেককেই আল্লাহর দেয়া এই মাপকাঠিতে যাঁচাই ও পরখ করে যা মর্যাদা হবে তাকে সেই মর্যাদা দেয়া।
৭. হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নবুওয়াতের পরে কোন ব্যক্তির এমন কোন মর্যদা মেনে না নেয়া, যার আনুগত্য করা বা না করার উপর ঈমান ও কুফর সম্পর্কে ফায়সালা হতে পারে।
শুধু তাই নয় স্থায়ী কর্মনীতি হিসেবে যা সব সময়ে মনে রাখতে হবে তা হল:
“কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা কোন কর্মপন্থা গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর নির্দেশ ও বিধানের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করবে।”
উপরোক্ত বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে আমল করার জন্য মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যাবলীকে সামনে রেখেই প্রণীত হয়েছে ‘ফিকহ্ মুহাম্মদী’। এ কিতাবটি বাংলায় অনুবাদ করার উদ্যোগ নিয়ে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা মুহাম্মদ শামাউন আলী ইসলামী আন্দোলনের একটি মহৎ কাজ করেছেন। ব্যস্ততার মাঝেও আমি তার অনুবাদটি একবার দেখেছি। ভাষার পরিপক্কতা না থাকলেও মূল কথাটি সহজভাবেই বোধগম্য হয়েছে। সম্ভবত: অনুবাদ করায় এটিই তার প্রথম প্রয়াস। দোয়া করি আল্লাহ তার এ শ্রমকে কবুল করুন। আমীন।
পরিশেষে আমি আশা করি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জীবনকে রাসূল (সা.) এর পথে পরিচালনার জন্য ফিকহ মুহাম্মদী কিতাবটি ইসলামী সাহিত্য জগতে মাইল ফলক হিসাবে গৃহীত হবে।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।
মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান
প্রাক্তন সংসদীয় দলনেতা
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ
তারিখ: ৮/১/৯৩ ইং
প্রসঙ্গ কথা
সমস্ত প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। যিনি আমাদেরকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। অত:পর তার প্রেরিত রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের ওপর বর্ষিত হোক দরুদ ও সালাম। আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের পথ চলার জন্য রাসূলুল্লাহর মাধ্যমে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কুরআন ও হাদীসের আলোকেই আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, চলাফেরা, ইবাদত, পাক-পবিত্রতা, মুয়ামালাত সবকিছু হওয়া উচিৎ। এ ব্যাপারে বাংলা ভাষায় অনেক কিতাব-পত্র বের হয়েছে কিন্তু সরাসরি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে এবং কুরআন ও হাদীসকে অগ্রাধিকার দিয়ে রচিত কিতাবের খুব অভাব। আল্লামা মহিউদ্দীন বহুপূর্বে উর্দু ভাষায় এ ধরনের একটি কিতাব লিখেছিলেন যা ‘ফিকহ্ মুহাম্মদী’ নামে পরিচিত।
এ কিতাবখানা ছাত্র জীবনে পড়ার সময় এর বঙ্গানুবাদ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। কর্ম জীবনে পদার্পন করে এর অনুবাদের কাজে হাতে দেই। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ শেষ করা সম্ভব হয়েছে। সাত খণ্ডের এ কিভাবখানি ক্রমান্বয়ে অনুবাদ করার ইচ্ছা রয়েছে, বাকী আল্লাহর মর্জি।
অনুবাদের ক্ষেত্রে সহজ-সরল ভাষা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। এরপরও কোন ভুলত্রুটি পরিলক্ষিত হলে এবং কোন সুহৃদয় পাঠক আমাকে অবহিত করলে পরবর্তীতে তা সংশোধন করার চেষ্টা করবো। এ কাজে যাঁরা আমাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন এবং উৎসাহ যুগিয়েছেন বিশেষভাবে বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের সম্মানিত (সাবেক) সভাপতি বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ (মরহুম) আল্লামা ডক্টর মুহাম্মদ আব্দুল বারী এবং আমার শ্রদ্ধেয় দুই সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ও মাওলানা মীম ওবায়দুল্লাহ সাহেব, তাদের সকলকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, তাহলো এত অল্প সময়ে এ বইটির ৬ষ্ঠ সংস্করণ বের হতে যাচ্ছে যা একমাত্র মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে তাঁর দ্বীনকে বুঝে কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
বিনীত
অনুবাদক
ঢাকা, জুলাই ২০০৫
بسم الله الرحمن الرحيم
ফিকহ মুহাম্মদী ১ম খণ্ড
পানির বিবরণ
পানি কম হোক কিংবা বেশি হোক তাতে অপবিত্র জিনিস পড়ার কারণে যদি তার রং পরিবর্তন হয়ে যায়, বা তাতে গন্ধ আসে অথবা তার স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় তাহলে সে পানি অপবিত্র। [টিকা- ইবনে মাজাহ-আবু উমামা আল বাহেলী (রা.)।] যদি প্রায় সোয়া ছয় মণ পরিমান পানি কোন স্থানে জমে থাকে তাতে অজু করা জায়েয। অজুর অঙ্গ প্রতঙ্গের পানি তাতে পড়লে নাপাক হবে না। [টিকা-সুনানে আরবা- ইবনে উমর (রা.)।] কিন্তু অপবিত্র অবস্থায় (গোসল ফরজ হওয়া অবস্থায়) তার মাঝে বসে গোসল করা নিষেধ। তার কিনারায় বসে তা হতে পানি উঠিয়ে গোসল করবে। [টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
পেশাব-পায়খানার বিবরণ
পায়খানা জিন ও শয়তানদের থাকার জায়গা। যে ব্যক্তি পায়খানায় যাবে সে এ দোয়া পড়বে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি নাপাক পুরুষ জিন এবং নাপাক স্ত্রী জিন হতে। [টিকা- ইবনে মাজাহ- আনাস ইবনে মালেক (রা.)]
যখন পায়খানা থেকে বের হবে তখন এ দোয়া পড়বে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهَبَ عَنِّى الأذى وَعَافَنِي –
অর্থাৎ- সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমার কষ্ট দূর করেছেন এবং আমাকে সুস্থতা দিয়েছেন।[টিকা- আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, দারেমী- হযরত আয়েশা (রা.)।]
পায়খানা হতে বের হবার সময় এ দোয়াটিও পড়া জায়েয:
غفرانك -অর্থাৎ- হে প্রভু! আমি তোমারই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি।[প্রাগুক্ত।]
পায়খানা এবং পেশাব করার সময় কিবলার দিকে মুখ বা পিঠ করে বসা নিষেধ। কিন্তু দালান-কোঠার মাঝে (ঘেরা দেয়ালের বা ঘরের মাঝে) জায়েয আছে। [টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু আইউব (রা.)] ডান হাতে এস্তেঞ্জা করা অর্থাৎ ঢিলা বা পানি ব্যবহার করা নিষেধ। [ মুসলিম- সালমান (রা.)] তিন ঢিলার কম নিয়ে পায়খানা যাবে না। কিন্তু তিনটি ঢিলা না পাওয়া গেলে দু’টিই যথেষ্ট।[টিকা-বুখারী ‘বনে মাসউদ (রা.)] যতদুর সম্ভব বেজোড় ঢিলা নিবে এবং যে ব্যক্তি বেজোড় ঢিলা নেবে না তার গুনাহ হবে না।”[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী- আবু হুরায়রা (রা.)] গোবর, হাড় এবং কয়লা দ্বারা এস্তেঞ্জা করা নিষেধ। কেননা এ তিন বন্ধু জিনদের খোরাক।[টিকা-আবু দাউ– ইবনে মাসউদ (রা.)] এ তিন বস্তুর দ্বারা এস্তেঞ্জা করলে পবিত্রতা অর্জন হবে না।[টিকা-মারকুতনী- আবু হুরায়রা (রা.)] লোকের চলার পথে, ছায়ায় এবং গোসলখানায় পায়খানা-পেশাব করলে (তার উপর খোদার) লানত (অভিসম্পাত) হয়।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মুয়াজ (রা.)] গোসলখানায় এবং গর্তে অর্থাৎ কোন ছিদ্রের মুখে পেশাব করা নিষেধ।[টিকা- প্রাগুক্ত] পেশাব করার সময় ডান হাতে লজ্জাস্থান ধরা এবং ডানহাতে পায়খানায় ঢিলা ব্যবহার করা না জায়েয।[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ-আনাস (রা.)] পায়খানায় যাবার সময় মাটির নিকটবর্তী হবার পূর্বে লজ্জাস্থান খোলা নিষেধ।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ] পায়খানা করার সময় যদি দু’জন লোক নিজেদের লজ্জাস্থান খুলে বসে এবং নিজেদের মাঝে কথপোকথন করে তাহলে তারা আল্লাহর কোপানলে পড়বে। মেয়েদের জন্যও এ হুকুম।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ] পায়খানা করার পর শুধু ঢিলা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন হয়। কিন্তু মহিলাদের জন্য পানি ব্যবহার জরুরী এবং পরুষদের জন্য তা উত্তম।[টিকা-মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)]
জ্ঞাতব্য: যদি ঢিলা দিয়ে মুছার সময় হাতে ময়লা লেগে যায় তাহলে হাত মাটিতে ঘষে নিয়ে ধৌত করা সুন্নত এবং যদি নাজাসাত না লাগে তবে মাটিতে ঘষে ধৌত করার প্রয়োজন নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ (স:) একবার পায়খানা থেকে এসে খাবার খেয়েছিলেন এবং হাত ধৌত করেননি।[টিকা-মুসলিম]
(প্রয়োজন বশত) দাঁড়িয়ে [টিকা-যে হাদীসের দ্বারা দাঁড়ায়ে পেশাব করা জায়েয বলা হয়েছে তাহলো “একদা নবী করীম (সা.) এক গোত্রের আস্তাকুঁড়ে উপস্থিত হয়ে দাঁড়ায়ে পেশাব করেছিলেন।” আস্তাকুঁড় উচু ছিল এবং তিনি নীচের নিকে ছিলেন। বসে পেশাব করলে তাঁর দিকে গড়ায়ে আসতো। সেজন্য তিনি দাঁড়িয়ে পেশাব করেছিলেন। তাই কারণ বশত দাঁড়ায়ে পেশাব করা জায়েয অন্যখার বসে পেশাব করাটাই উত্তম। (শরহে নববী)] পেশাব করা জয়েষ।[টিকা-মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] রাতে পেয়ালায় পেশাব করা সুন্নত (অর্থাৎ ভয় বা অন্য কোন কারণ বশত পেয়ালায় বা কোন পাত্রে পেশাব করে নিবে এবং সকালে তা ফেলে দিবে।)[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ।]
পায়খানার জন্য এতদূর যাবে যেন কেউ দেখতে না পায় এবং পেশাব (পায়খানা) করার সময় সালামের জবাব দেয়া নিষেধ।[টিকা-আবু দাউদ] যে আগুটিতে আল্লাহর নাম রয়েছে তা পায়খানায় নিয়ে যাবে না।[টিকা-আবু দাউদ- আনাস (রা.)] যে ব্যক্তির পেশাব পায়খানার বেগ আসবে সে প্রথমে পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন মিটিয়ে নিবে অতপর নামাজ পড়বে।[টিকা-আবু দাউদ- আব্দুলাহ ইবনে আরকাম (রা.)]
অপবিত্র বস্তু হতে পবিত্রতা অর্জনের বিবরণ
যদি কোন ব্যক্তি মসজিদে পেশাব করে দেয় তাহলে উক্ত স্থানে এক বালতি পানি প্রবাহিত করলে পবিত্র হয়ে যাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা:)] যদি জুতার সাথে অপবিত্র বস্তু লেগে যায় তাহলে পবিত্র মাটির উপর ভা ঘষলেই পাক হয়ে যায়।[টিকা- আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান- আবু হুরায়রা (রা.)] নাপাক জায়গার উপর দিয়ে চলার কারণে যদি মহিলার আঁচল (কাপড় বা চাদরের আঁচল) নাপাক হয়ে যায় তাহলে পবিত্র মাটির উপর দিয়ে চলার ফলে তা আবার পাক হয়ে যাবে।[টিকা-আহমাদ, মুয়াত্তা মালেক, তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] কোন ব্যক্তি যদি খালি পায়ে (পায়ে জুতাও নাই এবং ময়লাও লাগেনি) মসজিদে চলে যায় তাহলে গুনাহ নাই।” [টিকা-তিরমিযী- হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)] দুগ্ধপোষ্য পুত্র সন্তান যে এখনও কোন খাদ্য দ্রব্য খায়না যদি কাপড়ে পেশাব করে দেয় তাহলে তা ধোয়া জরুরী নয়। পানির ছিটা দিলেই তা পাক হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কন্যা সন্তান পেশাব করে দেয় তাহলে তা নাধুলে পাক হবে না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- লুবাবা বিনতে হারেস (রা.)] যদি কাপড়ে বীর্য লেগে যায় এবং ধোয়ার পরও তার চিহ্ন দূর না হয় তাহলে কোন অসুবিধা নাই।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] বীর্য যদি কাপড়ে লেগে শুকিয়ে যায় এবং ঘর্ষণের ফলে তা উঠে যায় তাহলে কাপড় পাক হয়ে যাবে। অর্থাৎ ধুয়ার প্রয়োজন হবে না।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] মুযী বের হলে অযু নষ্ট হয়ে যাবে। লজ্জাস্থান ধুয়ে অযু করতে হবে।”[টিকা-বুখারী, মুসলিম-হযরত আলী (রা.); কাম তাবের উদয় হলে (বীর্যপাতের পূর্বে) পুরুষাঙ্গ হতে যে এক প্রকার তরল পদার্থ বের হয়, তাকে মুযী বলে।]
স্বর্ণ এবং রৌপ্যের বাসনে পানাহার করা নিষেধ। কেননা এগুলি দুনিয়ায় কাফেরদের জন্য এবং পরকালে মুসলমানদের জন্য।[টিকা-বুখারী, মুসলিম-হুজায়ফা (রা.)] যে ব্যক্তি স্বর্ণ এবং রৌপ্যের বাসনে পানাহার করে সে নিজের পেট দোজখের আগুন দিয়ে পূর্ণ করে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম উম্মে সালমা (রা.)] কিন্তু যদি কারো পাত্র ভেঙ্গে বা ফেটে যায় তাহলে সেটা রৌপ্যের তার দিয়ে বাঁধা জায়েয।[টিকা-বুখারী- আনাস (রা.)] যে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগবে, সে নিজ হাত তিনবার ধুয়ে নিবে। কেননা ঘুমের ঘোরে তার হাত কোথায় লেগেছিল তা সে জানে না।[টিকা- বুখারী, মুসলিম আবু হুরায়য়া (রা.)] হালাল জীবজন্তুর মল বা মুত্র যে জায়গায় থাকে (অবশ্য তা শুষ্ক হতে হবে) সেখানে নামাজ পড়া জায়েয।[টিকা-বুখারী] যদি, কারও পাত্রে কুকুর মুখ দেয় বা খায় কিংবা পান করে তাহলে প্রথমে উক্ত পাত্রটিকে একবার মাটি দিয়ে মাঁজবে অতপর ছয়বার পানি দিয়ে ধুয়ে নিবে। এ ও বিধান রয়েছে যে, কুকুর উচ্ছিষ্ট পাত্রটি প্রথমে সাতবার পানি দিয়ে ধুয়ে নিবে, অষ্টমবার মাটি দিয়ে মেজে নিবে।[টিকা-মুসলিম] বিড়ালের উচ্ছিষ্ট (ঝুটা) পাক।[টিকা-সুনানে আরবা- আবু কাতাদা (রা.)] জুতা পরে নামাজ পড়া সুন্নত।[টিকা-আবু দাউদ] অর্থাৎ জুতা পাক সাফ থাকলে কেউ তা পরে নামায পড়তে পারে। মৃত পশুর চামড়া দাবাগত করলে (লবণ ও অন্যান্য দ্রব্য দিয়ে পাকান প্রক্রিয়া) পাক হয়ে যায়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু সালমা (রা.)] মদের সিরকা বানানো এবং তা পান করা হারাম।[টিকা-বুখারী- হফয়ত সাওনা (রা.)]
ফরজ গোসলের বিবরণ
পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ (খাতনার স্থান পর্যন্ত) যদি স্ত্রী অঙ্গের মাঝে প্রবেশ করে তাহলে উভয়ের উপর গোসল ওয়াজিব হবে।[টিকা- মুসলিম, আহমাদ, তিরমিযী-আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তি ঘুম থেকে জেগে কাপড় ভিজা দেখবে অর্থাৎ বীর্যপাত দেখবে তার উপর গোসল ওয়াজিব হবে যদিও স্বপ্নের কথা মনে না থাকে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)] আর যে ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে (অর্থাৎ যেন সে সঙ্গম করছে) এবং কাপড় ভিজা না পায় তাহলে তার উপর গোসল ওয়াজিব নয়।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী আয়েশা (রা.)] মেয়েদের ক্ষেত্রেও এ বিধান। কেননা তাদেরও স্বপ্নদোষ হতে পারে। স্বপ্নদোষ হলে তারাও গোসল করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] মহিলার ফরজ গোসলের পানি যদি কোন পাত্রে অবশিষ্ট থাকে তবে তাতে পুরুষের গোসল করা জায়েজ।[টিকা-মুসলিম, আহমাদ- ইবনে আব্বাস (রা.)] নাপাক অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ে এক পাত্র হতে পানি উঠায়ে গোসল করার সময় একে অপরের হাতে ঠেকা লাগলে কোন অসবিধা নেই।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] পুরুষের গোসল করার পর নাপাক স্ত্রীর সাথে শয়ন করা এবং তার শরীরে শরীর লাগানো জায়েয।[টিকা-তিরতিবী, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)] নাপাক অবস্থায় কিছু খেতে চাইলে বা শু’তে চাইলে প্রথমে লজ্জাস্থান ধুয়ে নিবে অতপর নামাযের জন্য যেভাবে অযু করে সেভাবে অযু করে নিবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] কিন্তু নাপাক অবস্থায় কিছু খেতে চাইলে শুধু হাত ধোয়াও যথেষ্ট।[টিকা-নাসাঈ- আয়েশা (রা.)] যে ঘরে কুকুর বা প্রাণীর ছবি অথবা নাপাক লোক থাকে সে ঘরে (রহমতের) ফেরেস্তা আসে না।[টিকা-নাসাঈ হযরত আলী (রা.)] মুশরিক ব্যক্তিকে দাফন করলে গোসল করা ওয়াজিব।[টিকা-প্রাগুক্ত]
ফরজ গোসল করার সময় প্রথমে নিজ হাত তিনবার ধু’বে, অতপর ডানহাত দ্বারা বাম হাতের উপর পানি ঢেলে লজ্জাস্থান এবং উরু ধু’বে। অতপর দু’হাত মাটির উপর ঘষে নিবে, অতপর অযু করবে। অতপর মাথায় তিনবার পানি, ঢালবে এবং চুলের গোড়ায় আঙ্গুল ফিরাবে এবং গোসল করবে। অতপর সেখান থেকে সরে গিয়ে পা ধু’বে এবং (প্রয়োজন না থাকলে) কাপড় দ্বারা শরীর মুছবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম; গরমের সময় একদিন রাসূল (সা.) গোসলের পর কাপড় নেননি। হাত দিয়ে মাথা ও শরীরের পানি ঝেড়ে ফেলেছিলেন। শীতলতার দরকার ছিল বা রুমাল ময়লা যুক্ত ছিল বলে। না জায়েয বলে নয়। সুতরাং রুমাল বা কাপড় দিয়েও মুছতে পারে বা হাত দিয়েও পানি ঝেড়ে ফেলতে পারে। (ফতহুল বারী)] ফরজ গোসলের পূর্বে যে অযু করবে, সে অযুই যথেষ্ঠ। গোসলের পরে অযু করা জরুরী নয়।[টিকা-সুনানে আরবা- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তি একাধিক স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে তার জন্য শেষে একবার গোসল করাই যথেষ্ট।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)] কেহ স্ত্রীর সাথে দ্বিতীয়বার সহবাস করার ইচ্ছা করলে (মধ্যখানে) অযু করে নিবে।[টিকা-নাসাঈ- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] ফরজ গোসলের পূর্বেই কেহ মাথা ধুয়ে নিলে গোসলের সময় মাথায় পানি না ঢাললেও কোন অসুবিধে নাই এবং খিতমীর (এক প্রকার গাছ) পাতা পানিতে দিয়ে মস্তক ধুয়া সুন্নাত।[টিকা-আবু দাউদ] ফরজ গোসলের সময় যদি একটি চুলও শুকনো থাকে তাহলে এর জন্য দোজখের আগুনে ফেলা হবে। হযরত আলী (রা:) এ কারণে মাথায় চুল রাখা কাজটিকে শত্রু মনে করতেন।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, দারেমী] অপবিত্র মহিলার গোসলের সময় মাথার চুল (খোপা বা বেনী) খোলা জরুরী নহে। তিনবার পানি দিয়ে চুলের গোড়া ভিজিয়ে নেয় তাহলেই যথেষ্ঠ।[টিকা-মুসলিম- উম্মে সালমা (রা.)] কিন্তু ঋতুবতী মহিলা যখন হজ্বের এহরাম বাঁধার জন্য গোসল করবে তখন চুল খোলা জরুরী।[টিকা-নাসাঈ আয়েশা (রা.)] নাপাক অবস্থায় মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করা হালাল নয় [টিকা-আবু দাউদ, ইবনে খুজায়মা আয়েশা (রা.)] এবং নাপাক অবস্থায় কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করা নিষেধ।[টিকা- তিরমিযী- ইবনে উমর (রা.)]
মিসওয়াকের বিবরণ
রাসূলূল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন যে, আমি যদি আমার উম্মতের উপর কঠিন মনে না করতাম তাহলে এশার নামায বিলম্বে পড়তে হুকুম দিতাম এবং প্রত্যেক নামাযের জন্য মিসওয়াক করতে আদেশ করতাম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] যে নামায বিনা মিসওয়াকে পড়া হয় সে নামায হতে মিসওয়াক করে নামায পড়া সত্তর গুণ বেশি মর্যাদা সম্পন্ন।[টিকা-মিশকাত- আয়েশা (রা.)] অন্যের মিসওয়াক অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত-আয়েশা (রা.)] মিসওয়াক কলমের ন্যায় মোটা হওয়া উচিৎ এবং নামাযের সময় তা কলমের মত কানে গুজে রাখা যায়।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- আবু সালমান (রা.)] আংগুলি দ্বারা মিসওয়াক করা জায়েয।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী]
অযু ও গোসলের পানির পরিমাণের বর্ণনা
গোসলের জন্য এক সা’ এবং অযুর জন্য এক মুদ পরিমাণ পানিই যথেষ্ঠ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম-আনাস (রা.)] (এক মুদের পরিমাণ প্রায় ৬২৫ গ্রাম। চার মুদে এক সা’ হয়। এক সা’র পরিমাণ হলো প্রায় আড়াই কেজি)। এ কথার উপর মুসলমানদের ইজমা আছে যে, অযু এবং গোসলের জন্য পানির কোন পরিমাণ নির্দিষ্ট নেই যদিও পানির পরিমাণ বেশি হয়। পানি বেশি কিংবা কম হোক তাতে অযু এবং গোসলের শর্ত পাওয়া গেলেই যথেষ্ট। এর শর্ত হচ্ছে অযুর অঙ্গ-প্রতঙ্গের উপর এবং গোসলে সর্বাঙ্গে পানি প্রবাহিত হওয়া।[টিকা-নববীসহ মুসলিম]
মশরু অর্থাৎ সুন্নাত গোসলের বিবরণ
জুমার দিনে, কুলিয়া লাগালে এবং মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিলে, গোসল করা সুন্নাত।[টিকা-আবু দাউদ- আয়েশা (রা:)] যে ব্যক্তি পবিত্র দ্বীন-ইসলাম গ্রহণ করবে, সে পানিতে কূল পাতা মিশিয়ে গোসল করবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী- কায়স বিন আ’সেম (রা.)] দুই ঈদের দিন ঈদগাহে যাবার আগে গোসল করবে।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক- না’ফে (রা.)] হজ্বের ইহরাম বাঁধার সময় গোসল করবে [টিকা-তিরমিযী-জায়েদ বিন সাবেত (রা.)] এবং মক্কা শরীফে প্রবেশের সময় গোসল করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
জুতা, মোজা ও জওরাবের উপর মাসহ করা
রাসূলুল্লাহ (সা.) মোজার (চামড়ার মোজা) উপর মাসহ করতেন।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ- মুগীরা (রা.)] মোজার উপর মাসহ করার সময়-কাল হচ্ছে তিনদিন এবং তিনরাত মুসাফিরের জন্য আর একদিন একরাত মুকিম (স্থায়ী বাসিন্দা) এর জন্য।[টিকা-মুসলিম- শোরায়হ ইবনে হানী (রা.)] যে কোন মোজা পরা লোকের উপর গোসল করা ফরজ হলেই মাসহ করার সময় শেষ হয়ে যায়। তখন মোজা খুলে ফেলবে।[টিকা-তিরমিযী, নাসাঈ- সাফ অন বিন আসসাল (রা.)]
জ্ঞাতব্য: জমহুরে উলামার নিকট মাসহ করার প্রথম সময় শুরু হয় তখন, যখন অযু নষ্ট হয়। যেমন এক ব্যক্তি দুপুরের সময় অযু করে মোজা পরলো এবং সন্ধ্যায় তার অযু নষ্ট হল। তা হলে সন্ধ্যা থেকে একদিন একরাত গণনা করবে। মোজা মাসহ করার পন্থা হচ্ছে যে, হ্যাতের পাঁচ আঙ্গুলি পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিবে এবং তা পায়ের আঙ্গুলের মাথা থেকে শুরু করে পাতার উপর দিয়ে গিরা পর্যন্ত টেনে আনবে। যে সব জিনিসে অযু ভঙ্গ হয় সে সব জিনিসে মাসহও ভঙ্গ হয়। দরকার বশত মোজা খুলে ফেললেও মাসহ ভঙ্গ হয়। জুতার উপর মাসহ করা চলে। জওরাব অর্থাৎ সুতা, উল এবং রেশমের মোজার উপরে মাসহ করা জায়েয।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ আবু যর (রা.)]
তায়াম্মুমের বিবরণ
যদি দশ বছর পানি না পাওয়া যায় তায়াম্মুম করবে। যে সময় পানি পাবে সে সময়ই অযু করা ফরজ হবে।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ আবু যর (রা.)] যদি কেউ পানি এবং মাটি এ দু’টির কোনটিই না পায় তবে বিনা অযু এবং তায়াম্মুমে নামায পড়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] তায়াম্মুমের পূর্বে প্রথমে অন্তরে নিয়্যত করবে, অতপর বিসমিল্লাহ বলে দু’হাত পাক মাটির উপর মারবে, (হাতে) ফুঁ দিয়ে মুখ মন্ডলের উপর হাত ফিরাবে অতপর হস্তদ্বয়ের কব্জিসহ মুছবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- হযরত আম্মার (রা.)]
জ্ঞাতব্য: হস্তদ্বয় কনুই পর্যন্ত মুছা জরুরী নয়। কেননা একথা কোন সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়নি। কাপড়, পাথর, লাকড়ী, লোহা ইত্যাদির উপর তায়াম্মুম করা জায়েয নয়। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা কুরআন মজীদে বলেছেন,
فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طيبا .
অর্থাৎ- তোমরা যদি পানি না পাও তাহলে পাক মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো।
আল্লাহ তায়ালা কাপড় প্রভৃতির উপর তায়াম্মুম করার হুকুম দেননি এবং তার রাসূল (সা.)-ও এ ধরনের হুকুম দেননি। পানি না পেলে অথবা পানি ব্যবহারে ক্ষতির আশংকা থাকলে অযু গোসল করে যে সমস্ত কাজ করা জায়েয তায়াম্মুম করেও তা করা জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ] যে সমস্ত কারণে অযু ভঙ্গ হয়ে যায় সেই সমস্ত কারণে তায়াম্মুমও ভঙ্গ হয়ে যায়। তায়াম্মুম করে নামায পড়ার পর পানি পাওয়া গেলে উক্ত নামায পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ-আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] কোন ব্যক্তি নাপাক অবস্থায় পানি না পেলে তায়াম্মুম করে নামায পড়ে নিবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইমরান (রা.)] যদি কারো শরীরে আঘাত বা ক্ষত থাকে, তাহলে উক্ত ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে তার উপরে মাসহ করবে এবং সমস্ত শরীর ধুয়ে ফেলবে।[টিকা-আবু দাউদ- জাবের (রা.)] যদি কারো গোসলের প্রয়োজন হয় আর গোসল করলে পীড়া বৃদ্ধির আশংকা থাকে তবে তায়াম্মুম করে কয়েক ওয়াক্তের নামায পড়া জায়েয।[টিকা-নাসাঈ- আবু যর (রা.)]
হায়েজ (মাসিক স্রাব) এর বিবরণ
হায়েজের মুদ্দত (কমপক্ষে তিনদিন বা উর্ধপক্ষে দশদিন) অথবা এ ধরনের সীমা নির্ধারণ সম্বন্ধে দলিল রূপে গ্রহণযোগ্য কোন হাদীস বর্ণিত হয়নি। ঋতুবতী স্ত্রীলোক যখন মনে করবে যে, সে হায়েজ হতে পাক-সাফ হয়ে গেছে, তখন গোসল করে নামায পড়বে এবং রোজা রাখবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরফিী, ইবনে মাজাহ- হিমনা বিনতে জাহশ (রা.)] ঋতুবতী হায়েজ হতে পাক হয়ে যখন গোসল করবে তখন পানিতে লবণ মিশিয়ে নিবে। হায়েজ হতে পাক হয়ে গোসল করার পর ন্যাকড়া কিংবা তুলায় খুশবু লাগিয়ে লজ্জাস্থানে রাখবে।[টিকা-আবু দাউদ- উমাইয়া বিনতে আবী সলত (রা.)] ঋতুবতী ঋতু অবস্থায় নামায পড়বে না এবং রোযা রাখবে না।[টিকা- নাসাঈ আয়েশা (রা.)] ঋতুবতীর সঙ্গে সঙ্গম ব্যতীত আর সবই জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু সাঈদ (রা.)] হায়েজের অবস্থায় যে ব্যক্তি হালাল মনে করে নিজের স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে সে ফাফির।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী- আবু হুরায়রা (রা.)]
জ্ঞাবত্য: কেউ হারাম জেনেও যদি হায়েজের অবস্থায় সঙ্গম করে তাহলে কবীরা গুনাহ অর্থাৎ মহাপাপ হবে এবং তার সদকা করা ওয়াজিব। যদি রক্ত লালবর্ণ থাকা অবস্থায় (অর্থাৎ প্রথম দিকে) সঙ্গম করে তবে একদিনার সদকা দিবে।[টিকা-তিরমিযী] এক দিনার প্রায় ছয় আনা পরিমাণ। স্বর্ণ ষোল টাকা তোলা হলে এক দিনারের মূল্য ছয়টাকা ও অর্ধ দিনারের মুল্য তিন টাকা হবে।)
হায়েজ ওয়ালীর জন্য নামায মাফ এবং রোযার (পরবর্তী সময়ে) কাযা করতে হবে।[টিকা- বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] ঋতুবতীর কুরআন শরীফ পড়া (অপরকে পড়ানো এবং তাতে হাত লাগানো) নিষেধ। অবশ্য আপন ঋতুবতী স্ত্রীর শরীরে শরীর লাগানো জায়েয।[টিকা-তিরমিযী- ইবনে উমর (রা.)] ঋতুবতী স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কুরআন শরীফ পড়া দুরুস্ত। (বড় চাদর হলে) অর্ধেক চাদর ঋতুবর্তী স্ত্রীর উপর রেখে বাকী অর্ধেক চাদর নিজের উপর নিয়ে নামায পড়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] ঋতুবর্তী মহিলার জন্য মসজিদে যাওয়া এবং বায়তুল্লাহর তওয়াফ করা নিষিদ্ধ। সে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ভিতর হতে কোন জিনিস উঠিয়ে নিলে তাতে কোন দোষ নেই।[টিকা-মুসলিম] ঋতুবতী কোন পাত্রের যে স্থানে মুখ রেখে কোন কিছু খায় বা পান করে সে জায়গায় তার স্বামীর মুখ রেখে খাওয়া বা পান করা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] স্বামীর ইতেকাফের অবস্থায় তার ঋতুবতী স্ত্রীর দ্বারা মসজিদ হতে মাথা বের করে ধুয়ে নেয়া জায়েয।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] নিজ ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সঙ্গম ব্যতীত হাস্য-রসালাপ করা, সঙ্গদান করা এবং একত্রে বসবাস করা জায়েয। কিন্তু সে অবস্থায় (স্ত্রীর) নাভী হতে হাঁটু পর্যন্ত কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা একান্ত প্রয়োজন।[টিকা-নাসাঈ- আয়েশা (রা.)] যদি কাপড়ে রক্ত লেগে যায়, তবে প্রথমে খড়ি দিয়ে ধুয়ে পরে ফুলের পাতা পানিতে মিশিয়ে ধুবে।[টিকা-নাসাঈ- মায়মুনা (রা.)] ঋতুবতী ঈদের দিন ইদগাহে মুসলমানদের সাথে দোয়ায় শরীক হবে, কিন্তু নামায পড়বে না।[টিকা-নাসায়ী-উম্মে কয়স বিনতে মুহসিন (রা.)]
নিফাসের বিবরণ
নিফাসের অতিরিক্ত সময়সীমা চল্লিশদিন। (এবং সর্বনিম্ন সময়ের কোন সীমা নেই।) রক্তপাত বন্ধ হলেই গোসল করে নামায পড়বে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম-উম্মে সালমা (রা.)]
জ্ঞাতব্য: নিফাস হায়েজের মতই। অর্থাৎ সে অবস্থায় পুরুষের সাথে সঙ্গম করা, নামায পড়া, রোযা রাখা, কুরআন শরীফ পড়া, অপরকে পড়ান, তাতে হাত লাগান, কাবা শরীফ তওয়াফ করা এবং মসজিদে যাওয়া নিষেধ। নিফাসেও নামায মাফ এবং রোযা কাযা করতে হবে। সন্তান প্রসবের পর জরায়ু বা রেহেম হতে যে রক্তপাত হয় তাকে নিফাস বলে। ৪০ দিনের পরও যদি রক্তস্রাব হতে থাকে তাহলে তা ইস্তিহাযা বা রোগ বিশেষ।
ইস্তিহাযার (রক্ত প্রদর) বিবরণ
স্ত্রীলোক যখন হায়েজের রক্ত ব্যতীত অন্য কোন রক্ত দেখবে তখন সে মুস্তাহাযা অর্থাৎ রক্তপ্রদরে আক্রান্ত। মুস্তাহাযা পাক মহিলার মত। (অর্থাৎ তার সাথে সঙ্গম করা জায়েয। সে নামায রোযা আদায় করবে।) ইস্তিহাযা হবার পূর্বে প্রত্যেক মাসে যে কয়দিন মাসিক হতো সে কয়দিন অপেক্ষা করবে। অর্থাৎ নামায, রোযা ইত্যাদি কাজ, যা ঋতুবতী মহিলার জন্য নিষেধ তা করবে না। ঠিক সে কয়দিন গত হলে রক্ত ধুয়ে ফেলবে এবং গোসল করবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহহ] অতপর প্রত্যেক নামাযের জন্য নতুন অযু করে নামায পড়বে।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] আর এরূপ বিধানও আছে যে, মুস্তাহাযা পাঁচ ওয়াক্ত নামাষের জন্য তিনবার গোসল করবে। অর্থাৎ এক গোসলে যোহর এবং আসর জমা করে পড়বে। আরেক গোসলে মাগরিব এবং এশা পড়বে এবং ফজরের পূর্বে গোসল করে ফজর পড়বে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] আর সে পাঁচ ওয়াক্তের নামাযে পাঁচবার গোসল করেও নামায পড়তে পারে।[টিকা-আবু দাউদ- হিমনা বিনতে জাহশ (রা.)] মুস্তাহাযার সাথে মিলন করা জায়েয।[টিকা-তিরমিযী]
জ্ঞাতব্য: মুস্তাহাযার পাঁচ ওয়াক্তের নামায পাঁচ গোসলে বা তিন গোসলে পড়ার কথা যা বলা হয়েছে তা ওয়াজিব নয়। অবশ্য উত্তম বটে।[টিকা- মুসলিম-আয়েশা (রা.)]
অযুর বিবরণ
অযু করার সময় প্রথমে অন্তরে নিয়ত করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উমর (রা.)] অতপর বিসমিল্লাহ বলে [টিকা-মিশকাত- সাঈদ ইবনে যায়দ (রা.)] দু’হাত কব্জিসহ তিনবার ধুবে। অতপর (ডান) হাতে পানি নিয়ে অর্ধেক দ্বারা কুলি করবে এবং অর্ধেক নাকের মাঝে প্রবেশ করিয়ে (বাম হাত দিয়ে) নাক ঝেড়ে ফেলবে [টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)] আবার মুখমণ্ডল ধৌত করবে (দাড়ি থাকলে) পূর্ণ এক অঞ্জলি পানি নিয়ে দাড়ির নিচ দিয়ে খিলাল করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] অতপর ডান হাত কনুইসহ তিনবার ও বামহাত কনুইসহ তিনবার খুবে। উভয়হাত দু’দু বার ধুয়ার বিধানো রয়েছে।[টিকা-আবু দাউদ] হাত ধোয়ার সময় হাতের আঙ্গুলিতে খেলাল করবে এবং আংটি থাকলে তা ঘুরায়ে ফিরায়ে ধৌত করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] তারপর মাথা মাসহ করবে। ডান হাতে পানি নিয়ে বাম হাতে দিয়ে দু’হাত কপালে উপরের চুল হতে আরম্ভ করে মাথার উপর দিয়ে পিছনে নিয়ে যাবে। পিছন হতে পুনরায় আরম্ভ করার স্থানে দু’হাত ফিরিয়ে আনবে।[টিকা-ইবনে মাজাহহ] পাগড়ীর উপর মাসহ করাও জায়েয।[বুখারী, মুসলিম- আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ বিন আ’সেম (রা.)] (মাথা) মাসহ করার জন্য নুতন পানি নিবে।[টিকা-মুসলিম- আব্দুল্লাহ বিন জায়দ (রা.)] অতপর কান মাসহ করার জন্য নতুন পানি নিবে।[টিকা-বায়হাকী- আব্দুল্লাহ বিন জায়দ (রা.)] কান মাসহ করার নিয়ম হলো দু’হাতের তর্জনী আঙ্গুলীদ্বয় দু’কানের ভিতরে প্রবেশ করাবে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলিদ্বয় কানের বাহিরের দিক দিয়ে নিচ হতে উপরের দিতে টেনে মাসহ করবে।[টিকা-নাসাঈ-ইবনে আব্বাস (রা.)] তারপর ডান পা গিরা সহ (টাখনুসহ) তিনবার ধুবে এবং বাম পা গিরাসহ তিন বার ধুবে [টিকা-বুখারী, মুসলিম- উসমান (রা:)] এবং পায়ের আঙ্গুলি সমূহে খিলাল করবে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ-ইবনে আব্বাস (রা.)] তারপর এ দোয়া পড়বে:
أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لأَشَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ محَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ –
অর্থাৎ- “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক তার কোন শরীক নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল।”
যে ব্যক্তি অযুর পরে এ দোয়া পাঠ করবে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খোলা থাকবে, যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[টিকা-মুসলিম-উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)] অযু করার সময় অন্য কারো দ্বারা অযুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গে পানি ঢেলে নেয়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- মুগীরা (রা.)]
অযুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এক এক বার ও দুই দুই বার ধোয়াও জায়েয।[টিকা-বুখারী] যে ব্যক্তি অজুর অবয়ব তিন বারের অধিক ধুবে, সে খারাপ আচরণ করলো এবং সীমা লংঘন ও জুলুম করলো।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ-আমর ইবনে শোয়াইব (রা.)] অযু করার সময় যদি নখ পরিমাণ জায়গাও শুকনো থেকে যায় তবে পুনরায় অযু করতে হবে।[টিকা-আহমদ, আবু দাউদ- খালিদ ইবনে মা’দান (রা.); যদি অযু করার সময় কোন জায়গা গুকনো থাকে তবে তা খুলে বা ভিজালেই জায়েয হবে। অবশ্য পুনরায় অযু করাটা উত্তম। (আবু দাউদ)] (প্রয়োজন না পড়লে) অযুর অংগ সমূহ রুমাল বা চাদর দিয়ে মুছবে না [টিকা-বুখারী, মুসলিম- মায়মুনা (রা.)] এবং অযুর শেষে পাজামা বা কাপড়ের উপর শরমণাহের দিকে পানির ছিটা দিবে (তাতে সন্দেহ দূর হয়)।[টিকা-আবু দাউদ- হাকাম বিন সুফিয়ান (রা.)] এক অযুতে কয়েক ওয়াক্তের নামায পড়াও জায়েয।[টিকা-মুসলিম- বুরারদা (রা.)]
যদি অযু করার সময় কোন জায়গা শুকনো থাকে তবে তা খুলে বা ভিজালেই জয়েয হবে। অবশ্য পুনরায় অযু করাটা উত্তম। অযু করার সময় যখন কেউ কুলি করে, নাকে পানি দেয়, নাক ঝাড়ে তখন তার মুখের এবং নাকের ভিতরের গুনাহ গুলি খসে পড়ে। অতপর যখন মুখমণ্ডল ধোয়, তখন মুখমণ্ডলের গুনাহ পানির সাথে দাড়ির দু’পাশ দিয়ে ঝরে পড়ে। যখন দুই হাত কনুই পর্যন্ত ধোয়, তখন তার গুনাহ গুলি আঙ্গুলের ডগা দিয়ে পানির সাথে ঝরে পড়ে। অতপর যখন মাথা মাসহ করে, তখন তার গুনাহ সমূহ কেশের পার্শ দিয়ে ঝরে পড়ে। যখন দুই পা গিরাসহ ধোয় তখন তার পাপরাশি পায়ের আঙ্গুলির ডগা দিয়ে খসে পড়ে। তারপর যদি সে নামাযে দাঁড়ায় এবং আল্লাহ তা’য়ালা যে রূপ সম্মানের অধিকারী, সে রূপে তার গুণগান করে এবং হুজুর দিলে নামায পড়ে তবে সে আপন গুনাহ হতে সদ্যজাত সন্তানের মত পাক পবিত্র হয়ে ফিরে আসে।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক]
অযু ভঙ্গকারী বস্তুসমূহের বিবরণ
কারো অযু না থাকলে বা অযু সঠিক না হলে নামায কবুল হয় না।[টিকা-বুখারী- আবু হুরায়রা (রা.)] বায়ু নির্গত হলে নতুন ভাবে অযু করে নামায পড়বে।[টিকা-প্রাগুক্ত]
জ্ঞাতব্য: বায়ু বের হলে, পায়খানা ও পেশাবের রাস্তা দিয়ে কিছু বের হলে এবং যে সমস্ত কারণে গোসল ওয়াজিব হয়, সে সমস্ত কারণে অযুও নষ্ট হয়ে যায়।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহহ- আলী বিন তলক (রা.)] নামাযের মধ্যে বাতকর্ম হয়েছে কিনা? কারো এরূপ সন্দেহ হলে- যে পর্যন্ত শব্দ না শুনে বা গন্ধ না পায়, যে পর্যন্ত অযু করবে না।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
শুয়ে ঘুমালে অযু নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু বসে তন্দ্রা আসলে অযু নষ্ট হয় না।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] (অনাবৃত) পুরুষাঙ্গে হাত লাগলে অযু নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু মাঝে যদি কাপড় বা কোন কিছুর আড় থাকে তবে অযু নষ্ট হয় না। এইরূপ মহিলার গুপ্তাঙ্গে হাত লাগালে (বিনা পর্দায়) মহিলার অযু নষ্ট হয়ে যাবে।[টিকা-আহমাদ, নায়লুল আওতার]
জ্ঞাতব্য: হাদীসে যে শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে তাহলে فرج (ফারজ)। فرج বলতে পুরুষ এবং স্ত্রীলোক উভয়ের পেশাব-পায়খানার রাস্তাকে বুঝায়। সুতরাং উভয়েরই পেশাব এবং পায়খানার রাস্তায় বিনা পর্দায় হাত লাগালে অজু নষ্ট হবে।[টিকা-নায়লুল আওতার] মুযী বের হলে অজু নষ্ট হয়ে যায়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- হযরত আলী (রা.)] বমি হলে ও নাক দিয়ে রক্ত পড়লে অযু নষ্ট হবে।[টিকা-তিরমিযী- আবু দারদা (রা.); এ হাদীসটি দুর্বল। সুতরাং তাতে অবু নষ্ট হবে না। পেশাব ও পায়খানার রাস্তা ব্যতীত অন্য কোন স্থান হতে রক্ত বের হলে অযু নষ্ট হবে না (আগুনুল মা’বুদ, তোহফা)] উটের গোস্ত খেলে অযু নষ্ট হয়ে যায়।[টিকা-আবু দাউদ- আয়েশা (রা.)]
নামাযের ওয়াক্তের বিবরণ
সূর্য ঢলে পড়লেই যোহরের ওয়াক্ত হয়ে যায় [টিকা-মুসলিম-জাবের ইবনে সামরা (রা.)] এবং সূর্য এতদূর থাকতে আসরের নামাযের ওয়াক্ত হয়ে যায়, যেন চার ক্রোশ (আট মাইল) যাওয়ার পর সূর্য্য অস্ত যায়।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
জ্ঞাতব্য: প্রত্যেক বস্তুর ছায়া এক ছায়া হতে আরম্ভ করে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত আসরের সময়।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী] সূর্য ডুবলেই মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে যায় এবং পশ্চিম আকাশের লাগ রেখা বিলীন না হওয়া পর্যন্ত এর ওয়াক্ত থাকে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)]
এশা’র নামাযের ওয়াক্ত পশ্চিমাকাশের লাল আভা বিলীন হওয়ার পর হতে অর্ধরাত পর্যন্ত থাকে।[টিকা-মুসলিম- আব্দুল্লাহ বিন জায়দ (রা.)] সুবহে সাদিক অর্থাৎ পূর্বাকাশ শ্বেত বর্ণ হতে আরম্ভ করে সূর্য উঠা পর্যন্ত ফজরের সময়।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] ভীষণ গরমের সময় যোহরের নামায কিছু দেরী করে পড়া ভাল [টিকা-বুখারী, মুসলিম-আবু হুরায়রা (রা.)] এবং শীতের সময় যোহরের নামায তাড়াতাড়ি পড়বে।[টিকা-বুখারী] যে ব্যক্তি আসরের নামায আখেরী ওয়াক্তে পড়ে, তার নামায মুনাফিকের নামাযের মত।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)] যে ব্যক্তি আসরের নামায পড়ে না, তার আমল নষ্ট হয়ে যায়। (অর্থাৎ- তার পূর্বের নামাযও নষ্ট হয়ে যায়)।[টিকা-আহমাদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ- বুয়ায়দা (রা.)] ফজরের নামায অন্ধকার থাকতে পড়া উচিৎ।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)] ফজরের নামায যতদূর সম্ভব মুক্তাদীদের ধৈর্য অনুযায়ী লম্বা কিরায়াত পড়বে কিন্তু তাদেরকে অসুবিধায় বা কষ্টে নিপতিত করা উচিৎ নয়।[টিকা-শরহুস্ সুন্নাহ- মুয়ায বিন জাবাল (রা.)] গরমের মওসুমে ফজরের নামায ফর্সা করে পড়া উচিৎ। কারণ তখন রাত ছোট হয়ে থাকে।[টিকা-শরহুস সুন্নাহ্]
কাযা নামায পড়ার নিয়ম
কোন কারণে নামায ছুটে গেলে পূর্বের বাকী নামায এবং আদা-হালী নামাযের মাঝে তরতীব ওয়াজিব। অর্থাৎ আগের নামায আগে ও পরের নামায পরে পড়তে হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জাবের (রা.)]
ভুলবশত এবং ঘুমিয়ে যাওয়ার জন্য নামায পড়া না হয়ে থাকলে তা পড়ার বিবরণ:
যে ব্যক্তি নামায পড়তে ভূলে যাবে, সেটি যখনই তার স্মরণে আসবে তখনই তা পড়ে নিবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] যদি ঘুমের অবস্থার নামাযের সময় শেষ হবার উপক্রম হয় বা চলে যায়, তাহলে যখন ঘুম হতে জাগবে তখনই নামায পড়ে নিবে।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)]
নামায তরককারীর (বেনামাযীর) বর্ণনা
যে নামায পড়ে না সে কাফির অর্থাৎ ধর্মহীন।[টিকা-সুনানে আরবা- বুরারদা (রা.)] বেনামাযীকে সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কাফির জানতেন।[টিকা-তিরমিযী- আব্দুল্লাহ ইবনে শাকীক (রা.)]
[টিকা-নামায তরককারীর দু’টি অবস্থা। (এক) নামায ফরজ হবার কথা জেনে বুঝেও আদায় করতে অস্বীকার করা। এরকম হলে উলামাদের সম্মিলিত মতে সে কাফির এবং তার শান্তি হচ্ছে মৃত্যুদন্ড। (দুই) নামায ফরজ জেনেও অবহেলা করে নামায আদায় করে না। যেমনটি আজ অধিকাংশ মুসলমানদের অবস্থা। এ অবস্থায় তাকে তওবা করার নির্দেশ দেয়া হবে। এ সুযোগ সে গ্রহণ না করলে শরিয়ত মোতাবেক তার শাস্তির ব্যাপারে উলামাদের মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে। ইমাম আহমাদের (রহ.) মতে সে কাফির এবং তাকে হত্যা করা হবে। ইমাম মালেক এবং শাফেরীর (রহ:) মতে সে ফাসিক এবং তাকে ‘হদ’ হিসেবে হত্যা করা হবে। ইমাম আবু হানিফার (রহ.) মতে তাকে নামায না পড়া পর্যন্ত বন্দী করে রাখতে হবে। (নায়লুল আওতার খ. ১, পৃ. ২৯১)]
আযানের বিবরণ
উত্তম নিয়ম এটাই যে আযান দাতা প্রথমে অজু করবে।[টিকা- তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] তারপর নিম্ন লিখিত রূপে আযান দিবে [টিকা-আবানের হাদীসটি আবু দাউদ, তিরমিযীসহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে]:
اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ
(অর্থ: আল্লাহ সর্ব শ্রেষ্ঠ। ৪ বার)
أَشْهَدُ أَنْ لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
(অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। ২ বার)
اشهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ الله ، أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ الله
(অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল। ২ বার)
حى على الصلوة ، حَيَّ عَلَى الصلوة
(অর্থ: নামাযের জন্য এসো, নামাযের জন্য এসো। ২ বার)
حى عَلَى الْفَلَاحِ ، حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ
(অর্থ: মঙ্গলের জন্য এসো, মঙ্গলের জন্য এসো। ২ বার) তারপর শুধু
ফজরের ওয়াক্তে বলবে-
الصَّلاةُ خَيْرٌ مِنَ النوم، الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنَ النَّوْمِ .
(অর্থ: ঘুম হতে নামায উত্তম। ২ বার)
اللهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ ، لَا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ .
(অর্থ: আল্লাহ সর্ব শ্রেষ্ট। (২ বার) আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই)।
তরজীর সঙ্গে আযান দেয়াও সুন্নত। তার নিয়ম এই যে, শুধু আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ২ বার অনুচ্চস্বরে ও আশাহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ ২ বার অনুচ্চস্বরে বলে পুনরায় আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চ স্বরে বলবে এছাড়া এর উপরের অংশ ও নীচের অংশগুলি পূর্বোল্লিখিত ভাবেই বলবে।[টিকা-আবু দাউদ- আবু মাহযুরা (রা.)] আযানদাতা দুই তর্জনী আঙ্গুলী দু’কানের ছিদ্রের মাঝে দিয়ে আযান দিবে। (ডান দিকে) ঘাড় ফিরায়ে হাইয়া আলাস্ সলাহ্ ২ বার ও (বাম দিকে) ঘাড় ফিরায়ে হাইয়া আলাল ফালাহ্ ২ বার বলবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, বুলুগুল মারাম- আবু হুজায়ফা (রা.)] আযান শ্রবনকারী মুয়ায্যীনের সাথে আযানের শব্দগুলি বলে যাবে। শুধু হাইয়া আলাস্ সলাহ ও হাইয়া আলাল ফালাহ্ বলার সময় لا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ الا بالله বলবে। আযান শেষ হলে রাসূলের উপর এভাবে দরুদ পড়বে,
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ – اللَّهُمَّ بَارِكْ على مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وعلى اللِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা.) ও তার বংশধরগণের উপর অনুগ্রহ কর, যেমন ইব্রাহীম (আ.) ও তার বংশধরগণের উপর অনুগ্রহ করেছে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানী। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা.) ও তার বংশধরগণের উপর বরকত নাজিল কর, যেমন ইব্রাহীম (আ.) ও তার বংশধরগণের উপর বরকত নাজিল করেছে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানী।[টিকা-মুসলিম]
অতপর এ দোয়া পড়বে-
اللهم رب هذه الدعوة التامة والصلوة القائمة أت مُحَمَّدًا نِ الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةً وَابْعَثْهُ مُقَامًا مَحْمُودًا نِ الذي وعدته .
অর্থাৎ- ‘হে এই পরিপূর্ণ আহব্বান (আযান) ও প্রতিষ্ঠিত নামাযের প্রভু! মুহাম্মদ (সা.)-কে অসিলা (বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থান) ও সম্মান দান কর এবং তাকে মাকামে মাহমুদে পৌঁছাও; যার তুমি ওয়াদা করেছ।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এ দোয়া পড়বে, কিয়ামতের দিন তার শাফায়াত করা আমার উপর ওয়াজিব হয়ে যাবে।[টিকা-মুসলিম- সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা.)]
আযানের শেষে নিম্নলিখিত দোয়াটি পড়ার বিধানও রয়েছে:
أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِمُحَمَّدٍ رَّسُوْلًا وبالاسلام دينا –
অর্থাৎ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তিনি এক, তার কেউ শরীক নাই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) তার বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে রব হিসেবে, মুহাম্মদ (সা.)-কে রাসূল হিসেবে এবং ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট আছি।[টিকা-আহমান, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)]
উচ্চস্বর বিশিষ্ট লোককে মুয়াযযিন নিযুক্ত করা ও উচুস্থান হতে আযান দেয়া উচিত [টিকা-আহমাদ] এবং যে ব্যক্তি বিনা বেতনে আযান দিবে তাকে মুয়াযযিন নিযুক্ত করা উচিত।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- উসয়ান বিন আবীল আ’স (রা.)]
যে আযান দিবে, সে তকবীর (ইকামত) বলারও হকদার।[টিকা- বুখরী, মুসলিম] সফরেও আযান ও তকবীর দিয়ে নামায পড়া উচিৎ এবং যিনি উপস্থিত সকল লোক হতে শ্রেষ্ঠ তাকেই ইমাম নিযুক্ত করতে হবে।[টিকা-বুখারী] এক মসজিদে দু’জন মুয়াযযিন নিযুক্ত করা মুস্তাহাব। একজন সুবহে সাদেকের পূর্বে আযান দেয়ার জন্যে এবং দ্বিতীয়জন সুবহে সাদেকের পরে আযান দেয়ার জন্যে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- আব্দুল্লাহ বিন জায়ন আনসারী (রা.)][টিকা-রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে দুইজন মুরাযযিন নিযুক্ত করেছিলেন। একজন সেহরী খাবার পূর্বে আযান দিতেন এবং অপর জন সেহরীর সময় শেষ হলে আযান দিতেন]
আযান এবং তকবীর বলার মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া কবুল হয়।[টিকা-আহমাদ]
তাকবীর বা ইকামত বলার নিময়
নামযের জন্য তাকবীর বা ইকামত নিম্নলিখিত রূপে বলবে [টিকা-আবু দাউদ]:
اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، أَشْهَدُ أَنَّ محَمَّدًا رَسُولُ اللهِ ، حَيَّ عَلَى الصَّلوةِ ، حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ . قَدْ قَامَتِ الصَّلُوةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلُوةُ ، اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لا اله الا الله .
আযান শ্রবনকারী যেভাবে মুয়াযযিনের সঙ্গে সঙ্গে আযানের শব্দগুলি বলে, তকবীর শ্রবণকারীও সেভাবে মুকাব্বিরের সঙ্গে সঙ্গে তকবীরের শব্দগুলি (অনুচ্চস্বরে) বলবে। কেবল মাত্র মুকাব্বির যখন কাদ কা মাতিস্ সালাহ্ বলবে, তখন শ্রবনকারী أَقَامَهَا اللَّهُ وَأَذَامَهَا )অর্থ- আল্লাহ পাক নামাযকে কায়েম রাখেন ও চিরস্থায়ী করেন।) পূর্বাপর অন্যান্য শব্দগুলি তকবীর দাতার মতই বলবে।[টিকা-আবু দাউদ]
মসজিদের বিবরণ
যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে মসজিদ তৈরী করে, আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্য জান্নাতে ঘর তৈরী করেন।[টিকা-আবু দাউদ]
মসজিদে প্রবেশ করার সময় এ দোয়া পড়বে:
اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابِ رَحْمَتِكَ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি আমার জন্য রহমতের দরজা সমূহ খুলে দাও।[টিকা-বুখরী, মুসলিম- উসমান (রা.)]
এবং মসজিদ হতে বের হবার সময় এ দোয়া পড়বে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমারই করুণা চাচ্ছি।[টিকা-মুসলিম- আবু উসাইদ (রা.)]
মসজিদে প্রবেশ করার সয়ম এ দোয়াটি পড়ার বিধানও এসেছে:
أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَبِسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ .
অর্থাৎ- আমি মহান আল্লাহ নিকট তার সম্মানিত সত্তা এবং তার রাজত্বের যা অতিব পুরাতন- মাধ্যমে আশ্রয় চাচ্ছি বিতাড়িত শয়তান হতে।[টিকা-আবু দাউদ- আমর ইবনুল আ’স (রা.)]
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করার সময় এ দোয়া পাঠ করে তখন শয়তান বলে এ বান্দা আমার অনাচার হতে সারাদিন রক্ষা পেল।[টিকা-বুখারী মুসলিম- আবু কাতাদাহ (রা.)] যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে, সে বসার পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়বে।[টিকা- তিরমিযী- ইবনে উমর (রা.)] মসজিদের মাঝে শোয়া জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি ভালভাবে অযু করে নামায পড়ার জন্য মসজিদে যায় এবং তার পৌছার আগেই জামায়াত হয়ে যায়, তাহলে সে জামায়াতের সওয়াব পাবে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আনাস (রা.)] বাড়িতে নামায পড়ার চেয়ে ওয়াক্তিয়া মসজিদে নামায পড়লে পঁচিশ গুণ, জামে মসজিদে পড়লে পাঁচশ’ গুণ, মসজিদে আকসায় এবং মসজিদে নববীতে পড়লে পঞ্চাশ হাজার গুণ এবং কাবা ঘরে নামায পড়লে এক লাখ গুণ বেশি নেকী হয়। নাপাকী (আবর্জনা) ফেলার জায়গায়, পশু যবহ করার স্থানে, রাস্তার মাঝখানে, গোসল খানায়, উট বাঁধার জায়গায় এবং কাবাঘরের (মূল ঘরের) ছাদের উপর নামায পড়া নিষেধ।[টিকা-তিরমিবী, ইবনে মাজাহ- ইবনে উমর (রা.)] মসজিদের মাঝে নামাযের অবস্থায় কেবলার দিকে থুথু ফেলা গুনাহর কাজ যদি অগত্যা ফেলতে হয়, তাহলে বাম দিকে অথবা পায়ের নীচে ফেলবে। আর উত্তম হচ্ছে, কাপড়ে থুথু ফেলে তা কাপড়ের সাথে মিশিয়ে ফেলা।[টিকা-বুখারী- আনাস (রা.)]
মসজিদে থুথু ফেলার কাফ্ফারা হলো তা মুছে ফেলা।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] খুব মন্দকাজ সমূহের মাঝে সবচেয়ে মন্দ ও খারাপ কাজ হলো, মসজিদে থুথু ফেলে তা মুছে না ফেলা।[টিকা-মুসলিম] মসজিদ হতে যার বাড়ী যত দূর হবে, তার চলার প্রতি ধাপের নেকী তার আমলনামায় লেখা যাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু মুসা (রা.)] যে ব্যক্তি মসজিদে হারানো জিনিস খোজ করে, তাকে বলা উচিত, খোদা করুন যে তুমি এটা না পাও।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] যদি কেউ মসজিদে বেচাকিনা করে, তাহলে তাকে বলা উচিৎ যে, খোদা যেন এ ব্যবসায় তোমাকে লাভবান না করেন।[টিকা-নাসাই- আৰু হায়রা (রা.)] কাঁচা পেয়াজ ও রসুন খেয়ে মসজিদে যাওয়া নিষেধ। কেননা এতে ফেরেস্তাদের কষ্ট হয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জাবের (রা.)] মসজিদে বাতি জ্বালালে বা তেল দিলে অনেক নেকী পাওয়া যায়।[টিকা-আবু দাউদ- মায়মুনা (রা.)] মসজিদে ঝাড়ু দিলে ও আবর্জনা তুলে ফেললে অনেক সওয়াব হয়।[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ- আনাস (রা.)]
যে ব্যক্তি নামায পড়ে অযু ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত উক্ত জায়নামাযে বসে থাকে, উঠে না দাড়ায় তাহলে সে পর্যন্ত ফেরেস্তারা এ দোয়া করতে থাকে, প্রভু হে। তাকে ক্ষমা কর, প্রভু হে! তার উপর রহমত কর।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি আযান শুনে মসজিদ থেকে চলে যায়, সে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর অবাধ্য হয়ে যায়।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- আবু শা’শা (রা.)] কিন্তু যে মসজিদে বিদআতের কাজ হয় এবং বিদআতের কারণেই যদি আযান শুনে চলে যায় তবে কোন গুনাহ নাই।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)]
সতর ঢাকার বিবরণ
যে স্ত্রীলোকের হায়েজ আরম্ভ হয়েছে অর্থাৎ সাবালিকা হয়েছে, তার নামায আল্লাহ পাক বিনা চাদর-ওড়নায় কবুল করবেন না। অর্থাৎ সমস্ত শরীরের উপর কাপড় দিয়ে ঢেকে নামায পড়বে। জামা-পাজামার উপরও চাদর জড়াতে হবে।[টিকা-বুখারী-মুহাম্মদ বিন মুনকাদার (রা.)] একাধিক কাপড় থাকলেও (পুরুষের জন্য) একখানা কাপড়ে নামায পড়া জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ সালামা ইবনুল আক’অয়া (রা.)] পুরুষের জন্য একই (লম্বা) জামা পরে নামায পড়া জায়েয। কিন্তু জামার বোতাম বা গুন্টি অবশ্যই লাগাতে হবে।[টিকা-আবু দাউদ- উম্মে সালমা (রা.)] যে জামা পায়ের পৃষ্ঠদেশ ঢেকে নেয়, স্ত্রীলোকদের সে জামা ও চাদর পরে বিনা তহবন্দে নামায পড়া জায়েয[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]। শুধু তহবন্দ পরে আরো একখানা কাপড় কাঁধে না দিয়ে নামাজ পড়বে না।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] যে কাপড় মাথা কিংবা কাঁধের উপর থাকে, তার দুই প্রান্ত ঝুলিয়ে রেখে নামায পড়বে না। বরং বগল মেরে (প্রান্তদ্বয় কাঁধের উপরে উঠায়ে) নামায পড়বে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবূ হুরায়রা (রা.)]
নামাযীর সামনে দিয়ে গমনাগমনের বর্ণনা
নামাযীর সম্মুখ দিয়ে নামায পড়ার সময় যাতায়াত করলে কি পরিমাণ গুণাহ হয়? যার জানা আছে, তার পক্ষে শত বছর দাঁড়িয়ে থাকাও ভাল তবুও যেন সে তার সামনে দিয়ে না যায়।[টিকা-ইবনে মাজাহহ] আর এ রকমও বর্ণিত আছে যে, নামাযী ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাতায়াত করলে কি পরিমাণ গুনাহ হয় তা কারো জানা থাকলে সে মাটি ধ্বসে তার তলায় বিলীন হয়ে যাওয়াকেও সহজ মনে করবে তার সামনে দিয়ে যাওয়ার চেয়ে।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক- কা’ব ইবনে আহবার (রা.)] যে ব্যক্তি নামায পড়বে সে তার সামনে সুতরা গেড়ে নিবে। তবুও যদি কেহ সুতরার মধ্যদিয়ে যায় তাকে নিষেধ করবে। যদি না শুনে তাহলে (লড়াই করবে) হাত দিয়ে বাধা দিবে। কেননা তার সঙ্গী হচ্ছে শয়তান।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)]
নামায পড়ার নিয়ম
প্রথমে (অন্ত:করণে) নামাযের জন্য নিয়্যত করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উমর (রা.)][নিয়্যাত বলতে অন্তরের ইচ্ছাকেই বুঝায়। এ কারণে মুখে নিয়াতের উচ্চারণ করাকে বিদআত বলা হয়েছে। দেখুন দূররে মুখতার ৪৯/১ আয়নুল হিদায়া ২২/১] অতপর কেবলার দিকে মুখ করে হাত উঠায়ে আল্লাহু আকবার বলবে।[টিকা-বুখারী- আবু হুমাইদ সায়েদী (রা.)] হাতের আঙ্গুলীগুলো খোলা রাখবে [টিকা-তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] এবং হস্তদ্বয় কাঁধ কিংবা কান পর্যন্ত উঠাবে।[টিকা-মুসলিম] অতপর ডান হাত বাম হাতের উপরে করে বুকের উপরে বাঁধবে।[টিকা-ইবনে খুজাইমা, নায়লুল আওতার] তারপর মনে মনে এ দোয়া পাঠ করবে:
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتُ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ نَقْنِي مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدُّنَسِ اللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ والثلج وَالْبَرَدِ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমার এবং আমার পাপরাশির মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমের মত ব্যবধান করে দাও। হে আল্লাহ! আমাকে গুনাহ হতে পরিস্কার কর যেমন সাদা কাপড় ময়লা হতে পরিষ্কার করা হয়। হে প্রভু। আমার সমস্ত পাপ পানি, বরফ এবং শিলার পানি দিয়ে ধুয়ে দাও।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
তারপর চুপে চুপে এভাবে তা’আউয পড়বে,
أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ .
অর্থ: আমি আশ্রয় চাচ্ছি, মহাজ্ঞানী শ্রবনকারী আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তানের পাপ- প্রবঞ্চনা ও কুমন্ত্রণা হতে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী]
অতপর চুপে চুপে بِسمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ পড়বে।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)
জ্ঞাতব্য: ফজর, মাগরিব এবং এশা নামাযে বিসমিল্লাহ জোরে পড়াও জায়েয। কিন্তু অধিকাংশ সহীহ হাদীসে নীরবে পড়ার কথাই সাব্যস্ত রয়েছে। যদি কেউ জোরে বিসমিল্লাহ পড়ে তাহলে তাকে নিন্দা (ভর্ৎসনা) করা চলবে না।
তারপর ফরজ, মাগরিব ও এশা নামাযে জোরে এবং যোহর ও আসর নামাযে আস্তে সূরা ফাতিহা পড়বে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
সূরা ফাতিহা:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ – الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعُلَمِينَ -الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ – مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ – إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ . (أمين ).
অর্থাৎ- “সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক। (যিনি) পরম করুণাময় ও দায়ালু। (তিনি) বিচার দিনের মালিক। আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করছি এবং তোমারই নিকট সাহায্য চাচ্ছি। তুমি আমাদের সরল পথের হেদায়াত দাও। তাদের পথ যাদের উপর তুমি অনুগ্রহ করেছ। যাদের উপর তুমি রাগান্নিত ও যারা পথ ভ্রষ্ট তাদের পথ নয়।”
সূরা ফাতিহা পড়া ছাড়া নামায সঠিক হয় না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উবাদা বিন সাযেত (রা.)] ইমামের পিছনে মুক্তাদীও চুপে চুপে সূরা ফাতিহা পড়বে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ- উবাদা বিন সামেত (রা.)] ফজর, মাগরিব ও এশার নামাযে ইমাম সূরা ফাতিহার পর জোরে ‘আমীন’ বলবে [টিকা-তিরমিজী, আবু দাউদ, দারেমী- অয়েল বিন হুজুর (রা.)] এবং মুক্তাদীও ইমামের আমীনের শব্দ শুনে জোরে আমীন বলবে।[টিকা-বুখারী- আতারেদ (রা.)] এরূপ বিধানও আছে যে, ইমাম যখন وَلَا الضَّالِّينَ বলবে তখন মুক্তাদী জোরে ‘আমীন’ বলবে।[টিকা-বুখারী-আবু হুরায়রা (রা.)] আমীন বলার পর একটু চুপ থাকবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী)] তারপর বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়বে।[টিকা-দারকুতনী- আবু হুরায়রা (রা.)] তারপর কুরআন মজীদ হতে যে কোন সূরা তা ছোট হোক বা বড় হোক যা স্মরণে আছে পড়বে।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক- আমর বিন শোয়াইব (রা.)]
জ্ঞাতব্য: সাধারণ স্বল্পশিক্ষিত লোকদের জন্য সূরা ইখলাস পাঠ করাও যথেষ্ট।
সূরা ইখলাস
قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ – اللهُ الصَّمَدُ – لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ – وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كَفَوًا أَحَدٌ .
অর্থাৎ- ‘বলুন, তিনি আল্লাহ একক। আল্লাহ মুখাপেক্ষিহীন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।’
জ্ঞাতব্য: এ সূরায় আল্লাহর গুণাবলীর বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্যই অন্য সূরা পাঠ করার চেয়ে অশিক্ষিত লোকদের জন্য এ সূরা পাঠ করাই ভাল মনে করা হয়েছে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] ইমাম যদি সূরা ত্বীন পড়ে, যখন তিনি
الَيْسَ اللَّهُ بِأَحْكَمِ الْحَاكِمِينَ .
(অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা কি সব বিচারকের বিচারক নন?) বলবে তখন (ইমাম ও মুক্তাদী) এ দোয়া পাঠ করবে-
بَلَى وَأَنَا عَلَى ذلِكَ مِنَ الشَّاهِدِينَ .
(অর্থাৎ- হাঁ এবং আমি এর উপর সাক্ষ্যদাতাদের অন্তর্ভুক্ত।) আর যদি সূরা কিয়ামতের শেষ আয়াতের এ অংশটুকু পড়ে
اليس ذلك بقادِر عَلَى أَنْ يُحْيِي الْمَوْتَ .
(অর্থাৎ- আল্লাহ তা’য়ালা কি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম নন?) তাহলে বলবে بلی (অর্থাৎ হাঁ! তিনি সক্ষম) আর সূরা মুরসালাতের এ আয়াত পাঠ করলে – فبأي حديث بعده يؤمنون (অর্থাৎ এরপর আর কোন কথার দ্বারা ঈমান আনবে?) তাহলে منا بالله। (আমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি) বলবে। আর যদি سبح اسم رَبِّكَ الأَعْلَى (অর্থাৎ তোমরা মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা বর্ণনা কর) পড়ে তাহলো- سبحان ربی الاعلى (আমার মহান প্রতিপালক অতি পবিত্র) বলবে।[টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত]
ইমাম সাহেব যোহর ও আসরের প্রথম দু’রাকাতে সূরা ফাতিহা এবং আরো দু’টি সূরা পড়বে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু কাতাদাহ (রা.)] আর শেষ দু’রাকাতে যদি শুধু সূরা ফাতিহা পড়ে তাহলেই যথেষ্ট। অবশ্য সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা পাঠ করাই উত্তম।[টিকা-মুসলিম- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] যোহর এবং আসরের নামাযে সূরা লাইল ও সূরা আ’লা পড়বে কিংবা বুরুজ ও তারেক বা অনুরূপ সূরাগুলি পড়বে।[টিকা-মুসলিম, নাসাঈ] মাগরিবের নামাযে সূরা তুর পাঠ করবে অথবা সূরা মুরসিলাত [টিকা-বুখারী, মুসলিম- উম্মে ফজল বিনতে হারেস (রা.)] কিংবা উভয় রাকাতে সূরা আ’রাফ পাঠ করবে [টিকা-নাসাঈ আয়েশা (রা.)] অথবা সূরা কাফিরুন ও সূরা ইখলাস পড়বে।[টিকা-মিশকাত]
এশার নামাযে সূরা শামস ও সূরা যোহা অথবা সূরা লাইল ও সূরা আ’লা পাঠ করবে।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] ফজরের নামাযে সূরা কাফ এবং অনুরূপ অন্য সূরা সমূহ পাঠ করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা:)] জুমার দিন ফজরের প্রথম রাকাতে আলিফ লাম মীম তানজীল (সূরা সাজদা) এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা দাহার পাঠ করবে।[টিকা-আবু দাউদ] আর যদি সময় কম থাকে তাহলে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়বে।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] অথবা উভয় রাকাতেই সূরা জিলজাল পাঠ করবে।[টিকা-মুসলিম-উমর (রা.)] আর ফজরের দু’রাকাত সুন্নাত নামাযে সূরা কাফিরুন এবং সূরা ইখলাস পড়বে।[টিকা-মুসলিম- নোমান বিন বশীর (রা.)] জুমা এবং দুই ঈদের প্রথম রাকাতে সূরা কাফ এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কামার পড়বে। অথবা প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা গাশিয়া পাঠ করবে এবং জুমার প্রথম রাকাতে সূরা জুমার এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা মুনাফিকুন পড়ার কথাও রয়েছে।[টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত][রাসূলুল্লাহ (সা.) একই নামাযে বিভিন্ন সূরা পড়েছেন এবং অনুরূপ সূরা পড়ার কথা বলেছেন। মোট কথা কুরআন মজীদ হতে যে কোন সূরা পাঠ করতে হবে। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) যে নামাযে যে সুরা পড়েছেন তা পড়াই উত্তম। (আওনুল মা’বুদ)] নামাযে কেরাত পড়ার সময় প্রত্যেকটা অক্ষর আলাদা আলাদা করে উচ্চারণ করবে (স্পষ্ট উচ্চারণ করবে) এবং (আয়াতের) শেষ শব্দে টান দিবে। প্রত্যেক আয়াতের শেষে থামবে এবং কুরআন মজীদ (যথা সম্ভব) সুমিষ্ট স্বরে পাঠ করবে।[টিকা-আবু দাউদ]
যে সমস্ত নামাযে জোরে কেরাত পাড়ার বিধান রয়েছে সে সমস্ত নামাযে যে কয় রাকাত ইমামের সাথে নামায পাওয়া যাবে না, (সে কয় রাকাত মুক্তাদী) জোরে কেরাত পড়ে নিবে।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক- না’ফে (রা.)]
অতপর আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যাবার সময় দুই হাত কাঁধ বা কান পর্যন্ত উঠাবে [টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা.)] এবং হাতের আঙ্গুলগুলো খোলা রাখবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- মালেক বিন হুঅয়রেস (রা.)] রুক করার সময় মাথা উঁচু নিচু করবে না, সমান রাখবে এবং উভয় হাত দিয়ে উভয় হাঁটু শক্ত করে ধরবে।[টিকা-মুসলিম] রুকুতে নিম্নলিখিত দোয়াগুলোর মাঝে যে কোনটি পড়বে।
প্রথম দোয়া:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي –
অর্থাৎ- তুমি পবিত্র, হে আমাদের রব! তোমার প্রশংসার সাথে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা কর।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
سبوح قدوس رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ –
অর্থাৎ- অতি পূত-পবিত্র; ফেরেস্তাগণ এবং রূহের প্রতিপালক।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
তৃতীয় দোয়া:
سُبْحَانَ رَبِي الْعَظِيمِ
অর্থাৎ- আমার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক অতি প্রবিত্র।[টিকা-সুনানে আরবায়া, দারেমী-হুজায়ফা (রা.)]
উত্তম হচ্ছে রুকুতে দশবার তসবীহ পাঠ করা। তবে তিন তসবীহ এর কম পড়বে না [টিকা- তিরমিযী, আবু দাউদ] এবং রুকুতে কুরআন শরীফ পড়বে না (পড়া নিষেধ)।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
অতপর যখন রুকু হতে মাথা উঠাবে তখন দু’হাত কাঁধ অথবা কান পর্যন্ত উত্তোলন করবে এবং সোজাভাবে দাঁড়াবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] যদি ইমাম হয় তাহলে নিম্ন লিখিত দোয়াগুলির মধ্যে যেটা ইচ্ছা পড়বে।
প্রথম দোয়া:
سمع اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ
অর্থাৎ- আল্লাহ্ তায়ালা শুনেছেন, যে তার প্রশংসা করেছে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلأُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمِلأَ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ .
অর্থাৎ- আল্লাহ তায়ালা শুনেছেন, যে তার প্রশংসা করেছে। হে আমাদের রব! তোমার আকাশ সমূহ এবং দুনিয়া ভর্তি (সমস্ত দুনিয়া জোড়া) এবং তুমি এর পরে যে পরিমাণ চাও, সে পরিমাণ প্রশংসা।[টিকা-মুসলিম- আব্দুল্লাহ ইবনে আওফা (রা.)]
তৃতীয় দোয়া:
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلأُ السَّمَوَاتِ والأَرْضِ وَمِلاً مَا شِئْتَ مِنْ شَيْئ بَعْدُ، أَهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ أَحَقُّ مَا قَالَ الْعَبْدُ وَكُلُّنَا لَكَ عَبْدٌ – اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدَ مِنْكَ الْجَدُّ
অর্থাৎ- আল্লাহ তা’আলা শুনেছেন, যে তার প্রশংসা করেছে। হে আমাদের রব। তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা আকাশ সমুহ পরিপূর্ণ এবং জমিনভর্তি এবং তুমি এর পরও যা কিছু ভর্তি চাও সে সমস্ত ভর্তি প্রশংসা, তুমিই প্রশংসার পাত্র। তুমি সে সব প্রশংসার হকদার যা তোমার বান্দা বলেছে এবং আমরা সকলেই তোমার বান্দা। হে আল্লাহ! তুমি যা দিয়েছ তাতে বাধা দেয়ার কেউ নাই। আর তুমি যা বন্ধ রেখেছ (দাওনা) তা দেয়ার কেউ নেই। কোন প্রচেষ্টাকারীর প্রচেষ্টা উপকারে আসবে না (তোমার আজাব হতে রক্ষা করতে)।[টিকা-মুসলিম- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)]
মুক্তাদীগণ নিম্নলিখিত দোয়াগুলির মধ্যে যেটি ইচ্ছা পাঠ করবে:
اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ – : অর্থাৎ- হে আমাদের রব। তোমার জন্যই সমস্ত প্রশংসা।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
ربَّنَا لَكَ الْحَمْدُ حَمْداً كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ .
অর্থাৎ- হে আমাদের রব! তোমার জন্যই অসংখ্য পবিত্রতা এবং বরকতময় (সমৃদ্ধশালী) প্রশংসা।[টিকা-বুখারী- রিফাআ বিন রা’ফে (রা.)]
অতপর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সিজদায় যাবে এবং নিম্নলিখিত দোয়াগুলির যে কোন একটি পড়বে:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
অর্থাৎ- তুমি পবিত্র, হে আমাদের রব! তোমার প্রশংসার সাথে তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা কর।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া: سبوح قدوس رَبُّ الْمَلَائِكَةِ وَالرُّوحِ .
অর্থাৎ- অতিপুত পবিত্র ফেরেশতাগণ এবং রূহের প্রতিপালক।[টিকা-বুখারী- আয়েশা (রা.)]
তৃতীয় দোয়া : – سبحان ربي الأعلى
অর্থাৎ- আমার মহান প্রভু পবিত্র।[টিকা-সুনানে আরবা, দারেমী-হুজায়ফা (রা.)]
চতুর্থ দোয়া:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ دِقَهُ وَجِلَّهُ وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ وَعَلَانِيْتَهُ وَسِرَّهُ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমার ছোট বড় আগের ও পরের এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সমস্ত গুনাহ মাফ করে দাও।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
সিজদা করার সময় (ধুলা বালি লাগার ভয়ে) কাপড় এটে ধরবে না।[টিকা-বুখারী- আবু হুরায়রা (রা.)] কপাল, নাক, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের অগ্রভাগের দ্বারা সিজদা করবে।[টিকা-আবূ দাউদ, নাসায়ী] সিজদায় দশবার তসবীহ পড়াই উত্তম। কিন্তু তিন তসবীহর কম যেন না পড়ে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিজী, ইবনে মাজাহ- আউন ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)] আর সিজদায় গিয়ে কুরআন মজীদ পড়বেনা।[টিকা-মুসলিম আবু হুরায়রা (রা.)] সিজদার সময় দু’হাতের আঙ্গুলগুলো না ফাক করবে, না এঁটে রাখবে (বরং স্বাভাবিক অবস্থায় রাখবে) এবং দু’পায়ের আঙ্গুলগুলো কেবলামুখী করে রাখবে।[টিকা-বুখারী-আবু হুমাইদ (রা.)] আর দুই হাত মাটির উপর কান বরাবর রাখবে এবং কনুই এতদূর উঁচু করবে যেন এর নীচ দিয়ে ছাগলের বাচ্চা ইচ্ছা করলে যেতে পারে। আর বগলের মাঝে শ্বেতাংশ ভাগ দৃষ্টি গোচর হয়। সিজদার সময় কুকুরের মত দুই হাত (মাটিতে কনুইসহ) বিছাবে না।[টিকা-মুসলিম] অতপর প্রথম সিজদা হতে মাথা উঠিয়ে বা পা বিছায়ে তার উপর বসবে (ডান পা আঙ্গুলির ভরে খাড়া করে রাখবে।) এবং শরীরের হাড় বা অস্থিগুলি আপন আপন স্থানে ঠিক হতে যে সময় লাগে ততক্ষণ বসে থাকবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] বসাকালীন সময়ের এ দোয়া পড়বে:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَاهْدِنِي وَعَافِنِي وَارْزُقْنِي .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা কর, আমার প্রতি রহম কর, আমাকে হেদায়াত দান কর, আমাকে সুস্থ, বিপদ মুক্ত রাখ এবং আমাকে রিজিক দান কর।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
তারপর ‘আল্লাহ আকবার’ বলে দ্বিতীয় সিজদা করবে এবং এতেও প্রথম সিজদায় যেভাবে তসবীহ পড়া হয়েছিল তা পড়বে।[টিকা-আবু দাউদ তিরমিযী, ইবনে মাজাহহ, দারেমী- আবু হুমইদ (রা.)] অতপর ‘আল্লাহ আকবার’ বলে সিজদা হতে মাথা উঠিয়ে বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসবে এবং যতক্ষণ না শরীরের অস্থিসমূহ আপন স্থানে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত বসে থাকবে।[টিকা-বুখারী- ইবনে মাজাহহ (রা.)] তারপর মাটির উপর দু’হাত ঠেস দিয়ে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবু দারদা (রা.)] প্রথম রাকাত যে ভাবে পড়া হয়েছে, সেভাবেই দ্বিতীয় রাকাত পড়বে কিন্তু দোয়ায়ে ইস্তেফতা (সানা) পড়বে না।[টিকা-মুসলিম- আবূ হুরায়রা (রা.)] দ্বিতীয় রাকাতের উভয় সিজদা সমাপ্ত করার পর বাম পা বিছায়ে তার উপরে বসবে এবং ডান পা খাড়া করবে (আঙ্গুলির উপর ভর করে বসবে)[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- ইবনে বাকরাহ (রা.)] এবং বাম হাত বাম হাঁটুর উপর এবং ডান হাত ডান হাঁটুর উপরে রাখবে।[টিকা-আহমাদ, রাজ্জাক, হাকেম- আব্দুর রহমান বিন আউস (রা.)] এ বিধানও রয়েছে যে, ডান হাত ডান জানুর উপর এবং বাম হাত বাম জানুর উপর রাখবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] তারপর (ডান হাতের) আঙ্গুলি ৫৩ এর মত করে মুঠা ধরবে অর্থাৎ তর্জনীর গোড়ায় বৃদ্ধাঙ্গুলির অগ্রভাগ রেখে তর্জনী মুঠা বন্ধ করত তার দ্বারা ইশারা করবে।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] এ বিধানও রয়েছে যে, তর্জনী ব্যতীত সব আঙ্গুলগুলো দিয়ে মুঠা বাধবে এবং ইশারা করার সময় আঙ্গুলির দিকে চেয়ে থাকবে।[টিকা-আহমাদ-না’ফে (রা.)] আর এভাবে তাশাহ্হুদ পড়বে-
التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلواتُ وَالطَّيِّبَتُ السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ أَشْهَدُ أن لا إلهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عبده ورسوله –
অর্থাৎ- মৌখিক, দৌহিক ও আর্থিক সমস্ত ইবাদতই একমাত্র আল্লাহর জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি শান্তি, আল্লাহর রহমত এবং বরকত নাজিল হোক। আমাদের ও আল্লাহর নেককার বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই এবং আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল।[টিকা- বুখারী- ইবনে মাসউদ (রা.)]
অতপর তৃতীয় রাকাতের জন্য উঠার সময় দু’হাত মাটিতে ঠেস দিয়ে উঠবে এবং দাঁড়ায়ে দুই হাত কাঁধ বা কান পর্যন্ত উঠাবে।[টিকা-বুখারী] তারপর তৃতীয় এবং চতুর্থ রাকাত, প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাতের মত পড়বে।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহহ] অতপর যখন সালাম ফিরার জন্য শেষ রাকআতে বসবে তখন ডানপার নীচ দিয়ে বাম পা বের করে এবং বাম নিতম্বের উপর বসবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী] তারপর (চুপে চুপে) তাশাহ্হুদ, দরুদ ও অন্যান্য দোয়া পড়বে। তাশাহহুদ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে বাকী দরুদ ও দোয়া উল্লেখ করা হলো।
দরুদ:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى
ابرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ – اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা.) ও তার বংশধরগণের উপর অনুগ্রহ কর, যেমন ইব্রাহীম (আ.) ও তার বংশধরগণের উপর অনুগ্রহ করেছে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানী। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ (সা.) ও তার বংশধরগণের উপর বরকত নাজিল কর, যেমন ইব্রাহীম (আ.) ও তার বংশধরগণের উপর বরকত নাজিল করেছে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানী।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
দোয়া মাসুরা:
اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إلا أنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةٌ مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আমার নাফসের উপর অনেক জুলুম করেছি এবং তুমি ছাড়া কেহ পাপ সমূহ ক্ষমাকারী নেই। অতএব তুমি স্বীয় অনুগ্রহে আমাকে ক্ষমা কর এবং আমার প্রতি করুনা কর। নিশ্চয় তুমিই ক্ষমাশীল করুনাময়।[টিকা-আহমাদ- না’কে (রা.)]
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ فِتْنَةِ (3) الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَايَ وَفِتْنَةِ الْمَمَاتِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ .
(অর্থ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট কবরের আযাব হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং দাজ্জালের ফিতনা হতে আশ্রয় চাচ্ছি। আরও আশ্রয় চাচ্ছি দুনিয়ার জীবনের ফিতনা ও বিপর্যয় এবং মৃত্যুর যাতনা হতে। হে আল্লাহ। আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি সমস্ত গুনাহ এবং সব রকমের দেনার (কর্জের) দায় হতে।[টিকা-বুখারী- ইবনে মাসউদ (রা.)]
অতপর ডান দিকে (ঘাড়সহ) মুখ ফিরিয়ে বলবে-
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ .
অতপর বাম দিকে (ঘাড়সহ) মুখ ফিরিয়ে বলবে [টিকা-সুনানে আরবা]- السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ –
সালাম ফিরার সময় ওয়াবারাকাতুহ যোগ করে- السَّلامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ-বলাও জায়েজ।[টিকা-আবু দাউদ]
সালাম ফিরার পর যিকির ও দোয়ার বিবরণ
যখন নামায পড়ে ইমাম সালাম ফিরবে তখন মুক্তাদীদের দিকে মুখ করে বসবে। কোন সময় ডান দিকে এবং কোন সময় বাম দিকে মুখ করে বসবে।[টিকা-বুখারী]
এরপর এসব দোয়াগুলো পড়বে।
প্রথম দোয়া:
اسْتَغْفِرُ اللَّهَ ، أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ ، أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ ، اللَّهُمَّ أَنْتَ السلامُ وَمِنْكَ السَّلامُ تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالإِكْرَامِ –
অর্থাৎ- আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি (৩ বার) হে আল্লাহ! তুমি শান্তিময়। তোমা হতেই সব শান্তি (তুমি শান্তিদাতা) বরকতময় আমাদের রব, হে মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী প্রভু।[টিকা-মুসলিম- সওবান (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُ اللَّهُمَّ لَأَمَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطَى لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ .
অর্থাৎ- আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই। একমাত্র তার জন্যই রাজত্ব ও প্রশংসা এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ। তুমি যা দিয়েছ তাতে বাধা দেয়ার কেউ নেই। আর তুমি যা বন্ধ রেখেছ (দাওনা) তা দেয়ার কেউ নেই এবং কোন প্রচেষ্টাকারীর প্রচেষ্টা উপকারে আসবে না। (তোমার আযাব হতে রক্ষা করতে)।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- মুগীরা ইবনে শো’বা (রা.)]
তৃতীয় দোয়া:
لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لأَشَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ – لا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَلَا نَعْبُدُ إِلَّا إِيَّاهُ ، لَهُ النِّعْمَةُ وَلَهُ الْفَضْلُ وَلَهُ التَّنَاءُ الْحَسَنُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ –
অর্থাৎ- আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই। তার জন্যই রাজত্ব এবং প্রশংসা। আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া পাপ হতে বিরত থাকা এবং পুন্য কার্য করা যায় না। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। তাঁরই (নিকট হতে) সমস্ত নিয়ামত এবং তাঁর জন্যই শ্রেষ্ঠত্ব ও উত্তম প্রশংসা। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। একান্তভাবে আমরা তাঁর আরাধনা করি যদিও মুশরিকগণ তা অপছন্দ করে।[টিকা-মুসলিম- আবদুল্লাহ বিন জুবাইর (রা.)]
চতুর্থ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَرَدَّ إِلَى أَرْذَلِ الْعُمُرِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الدُّنْيَا وَعَذَابِ الْقَبْرِ
অর্থাৎ- হে আল্লাহ। আমি কাপুরুষতা ও কৃপণতা হতে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি। আর অত্যধিক বার্ধক্য হতে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি এবং দুনিয়ার ফিতনা এবং কবরের আযাব হতে তোমরা নিকট আশ্রয় প্রাথনা করছি।[টিকা-বুখারী-মুসআ’ব (রা.)]
পঞ্চম দোয়া:
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشَكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমাকে তোমার স্মরণ, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং উত্তমভাবে তোমার ইবাদত করতে সাহায্য কর।[টিকা-আহমান, আবু নাউদ, নাসাঈ মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)]
ষষ্ঠ দোয়া:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ –
অর্থাৎ- হে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। আমাদেরকে দুনিয়া ও পরকালে কল্যাণ দান কর এবং দোযখের আগুন হতে রক্ষা কর।[টিকা-বুখারী- আনাস (রা.)]
সপ্তম দোয়া:
لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ وَسُبْحَانَ اللهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ –
অর্থাৎ- আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। আল্লাহ পবিত্র, মহান এবং তার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। আর আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া পাপ হতে বিরত থাকা ও পুন্য কাজ করা যায় না।[টিকা-নাসায়ী- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)]
অষ্টম দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ زَوَالِ نِعْمَتِكَ وَتَحَولِ عَافِيَتِكَ وفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ وجميع سخطك
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় চাচ্ছি তোমার নেয়ামতের বিনাশ হওয়া থেকে, তোমার দেয়া শাস্তি ও নিরাপদতার পরিবর্তন হতে, তোমার সহসা আযাব শাস্তির আগমন হতে এবং তোমার সর্বপকার অসন্তোষ হতে।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
নবম দোয়া:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي وَجَهْلِي وَإِسْرَافِي فِي أَمْرِي
وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي – اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي جَدِّي وَهَزْلِي وَخَطَائِي وَعَمْدِى وَكُلُّ ذَلِكَ عِنْدِي – اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قدَّمْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي وَأَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমার পাপ, অজ্ঞতা ও কাজের মধ্যে সীমা লংঘন যা আমার চাইতে তুমি বেশি অবগত আছ, সবই ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ! আমার পাপ কাজের চেষ্টা, অন্যায় কথাবার্তা, ভুলত্রুটি এবং ইচ্ছাকৃত অন্যায় তুমি ক্ষমা করে দাও, এসবই আমার মাঝে রয়েছে। তুমি ক্ষমা কর যা আমি আগে ও পরে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে করেছি, যা তুমি আমার চেয়ে ভালভাবে অবগত। তুমি অনাদি ও অনন্ত এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।[টিকা-বুখারী, মুসলিম, আবু মুসা আল-আশয়ারী (রা.)]
দশম দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنَ الْخَيْرِ كُلِّهِ عَاجِلِهِ وَاجِلِهِ مَا عَلِمْتُ مِنْهُ وَمَا لَمْ أَعْلَمُ وَأَعُوذُبِكَ مِنَ الشَّرِّ كُلِّهِ عَاجِلِهِ واجله ما عَلِمْتُ مِنْهُ وَمَا لَمْ أَعْلَمُ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرٍ سأَلَكَ بِهِ عَبْدُكَ وَنَبِيكَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا أَعَاذَبِهِ عَبْدُكَ وَنَبِيُّكَ – اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَمَا قَرَّبَ إِلَيْهَا مِنْ قَوْل أو عمل وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ وَمَا قَرَّبَ إِلَيْهَا مِنْ قَوْلِ أَوْ عمَلٍ وَأَسْأَلُكَ أَنْ تَجْعَلَ كُلُّ قَضَاء قَضَيْتَهُ لِي خَيْرًا .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট সমস্ত কল্যাণ কামনা করছি, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যা আমি জানি এবং যা জানি না এবং তোমার আশ্রায় কামনা করছি বর্তমান ও ভবিষ্যতের অমঙ্গল হতে যা আমি জানি এবং যা জানি না। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট সেই সব কল্যাণ কামনা করছি যা তোমার বান্দা ও নবীগণ চেয়েছিলেন এবং সেই সব অকল্যাণ ও অনিষ্ট হতে আশ্রায় চাচ্ছি। যা হতে তোমার বান্দা ও নবী আশ্রায় চেয়ে ছিলেন। হে আল্লাহ! আমি তোমার, নিকট জান্নাত প্রার্থনা করছি এবং যে সমস্ত কাজ ও কথা তার নিকটবর্তী করে দেয় তা কামনা করছি এবং দোযখ হতে পরিত্রান চাচ্ছি ও যে সমস্ত কথা ও কাজ দোযখের নিকটবর্তী করে তা হতে তোমার আশ্রায় কামনা করছি এবং তুমি অদৃষ্টে যা কিছু ফয়সালা করেছ, তা কল্যাণকর ও মঙ্গলময় কর এই প্রার্থনাই করছি।[টিকা-ইবনে মাজাহহ- আয়েশা (রা.)]
একাদ্বশ দোয়া:
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدًا مَا اسْتَطَعْتُ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ شَرِّ ما صنعت وأبوء لك بنعمتك على وأبوء عِنْدَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি আমার প্রভু, তুমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, তুমি আমাকে সৃষ্টি “রেছ। আমি তোমার বান্দা এবং আমি সাধ্যানুযায়ী তোমার ওয়াদা-অঙ্গীকারের উপর ঠিক রয়েছি। আমি তোমার নিকট আমার নিজ কৃত অন্যায় আচরণ হতে আশ্রয় চাচ্ছি। আমি স্বীকার করছি তোমার নিকট আমার দেয়া নেয়ামতের, যা তুমি আমাকে দিয়েছ এবং আমি তোমার নিকট আমার গুনাহের স্বীকার করছি, সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কেননা তুমি ব্যতীত আর কেহ পাপ সমূহ ক্ষমা করতে পারে না।[টিকা-বুখারী- শাদ্দাদ বিন আউস (রা.)]
জ্ঞাতব্য: রাসূলুল্লাহ (সা.) এ দোয়াকে সাইয়েদুল ইসতেগফার বা গুনাহ মাফের শ্রেষ্ঠ দোয়া বলে অবহিত করেছেন।
দ্বাদশ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةً فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَأَهْلِي وَمَا لِي – اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِي وَآمِنْ رَوْعَاتِي وَاحْفَظْنِي مِنْ بَيْنِ يَدَى وَمِنْ خَلْفِي وَعَنْ يَمِينِي وَعَنْ شِمَالِي وَمِنْ
فوقي وأعوذ بعظمتك أَنْ أَغْتَالَ مِنْ تَحْتِي .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ। আমি তোমার নিকট আমার দ্বীন, দুনিয়া, পরিবার এবং ধন সম্পদের মাঝে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ। আমার দোষ (কলঙ্ক) সমূহ গোপন কর এবং ভয়ভীতি (সন্ত্রাস) হতে আমাকে নিরাপত্তা দান কর, আর অগ্র-পশ্চাত ও ডানে বামে এবং উপরের দিক হতে হেফাজত কর এবং আমি নীচের দিকে পুঁতে যাওয়া (ধ্বংস হওয়া) হতে তোমার শ্রেষ্ঠত্বের দ্বারা আশ্রয় চাচ্ছি।[টিকা-নাসাঈ, ইবনে মাজাহ- ইবনে উমর (রা.)]
জ্ঞাতব্য: রাসূলুল্লাহ (সা:) সকাল বেলায় এ দোয়াটি পড়তেন। কখনও এটা পড়া থেকে বিরত থাকতেন না।
ত্রয়োদশ দোয়া:
سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ سُبْحَانَ اللَّهِ الْعَظِيمِ .
অর্থাৎ- আল্লাহ পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র তারই জন্য। আল্লাহ পবিত্র, মহান মর্যাদাশীল।
জ্ঞাতব্য: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন “এই কালেমা ২টি মুখে বলতে খুবই সহজ, ওজনে ভারী এবং আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয়। অর্থাৎ ঐ বাক্য ২টি পাঠ করা সহজ কিন্তু এর নেকী কিয়ামতের দিনে ওজনে অনেক বেশি হবে এবং তা আল্লাহর নিকট খুবই পছন্দনীয় কথা।[টিকা-বুখারী, মুসলিম, এটি বুখারী শরীফের সর্বশেষ হাদীস]
চতুর্দশ দোয়া:
سُبْحَانَ اللَّهُ (আল্লাহ পবিত্র) ৩৩ বার। অত:পর الْحَمْدُ لله (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য) ৩৩ বার। অত:পর اللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহ মহান-সর্বশ্রেষ্ঠ) ৩৩ বার এবং শেষে পড়বে:
لا إِلهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لأَشَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
অর্থাৎ- “আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তার কোন অংশীদার নেই। তারই জন্য সমস্ত সাম্রাজ্য ও প্রশংসারাজি। তিনি সব কিছুর উপর পরাক্রমশালী।”
যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাযের পর এ দোয়া পড়বে তার পাপ সমূহ আল্লাহ তা’য়ালা মাফ করে দিবেন, যদিও তা সমুদ্রের ফেনারাশির মত অসীম হয়।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)][প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়তাল কুসরী পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যহ করজ নামাযের পর আয়ভাল কুরসী পড়বে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (নাসাঈ)] যে ব্যক্তি প্রত্যহ একশত বার سبحان الله পাঠ করবে, তার আমল নামায় প্রতিদিন এক হাজার নেকী লিখা হবে।[টিকা-তিরমিযি]
জ্ঞাতব্য: একশত বার পড়লে এক হাজার নেকী এ জন্য হবে যে, আল্লাহ তা’য়ালা একটি নেকীর জন্য দশগুণ নেকী নির্দিষ্ট করেছেন। সে হিসেবে একশতে এক হাজার নেকী হবে।
দোয়ার সময় হাত উঠান ও তা মুখের উপর ফিরান [ফরজ নামাজের পর সম্মিলিতভাবে হাত উঠিয়ে দোয়া করার বিধান রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সাবস্ত নয়। এজন্য ফরজ নামাজের পর হাত ১১য়ে সম্মিলিতভাবে দোয়া করাকে বিদজ, লে মুহ কঁক আলেমগণ মনে করেন (বিস্তারিত দেখুন, ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ, খ. ২২, পৃ. ৫১২; শাহে সিফরুস আ’আনাহ, পৃ. ১২২; আইনী তুহফা সলাতে মুস্তফা, খ. ২, পৃ. ৫২-৫৩)]
দোয়া করার সময় দুই হাত উঠিয়ে মুখের সামনে রাখবে এবং দোয়া করে উভয় হাত দিয়ে মুখমণ্ডল মুছবে।[টিকা-তিরমিযী] দোয়া করার সময় উভয় হাতের ভিতরের দিক মুখের সামনে রাখবে উপরের দিকে নয়, অর্থাৎ উল্টা হাতে দোয়া করবে না।[টিকা-আবু দাউদ- মালেক বিন ইয়াসার (রা:)] অবশ্য ইসতিষ্কার সময় উল্টা হাতেই দোয়া করবে [টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)] এবং ফরজ নামাজের পর হাত উঠিয়ে দোয়া করবে।[টিকা-ইবনে আবী শারবা]
নামাযে জায়েয ও নাজায়েয বিষয়ের বিবরণ
নামাযরত অবস্থায় কোন কিছু ঘটলে পুরুষ হলে সুবহানাল্লাহ বলবে এবং মহিলা হাততালি দিবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- সাহল বিন সা’দ (রা.)] নামাযরত অবস্থায় হাত দিয়ে একবার সিজদার স্থানে হতে কঙ্কর (বা ঐ ধরনের কিছু) সরানো জায়েয [টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] এবং নামাযে এদিক সেদিক তাকানো নিষেধ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] নামাযরত অবস্থায় যদি কারো হাই আসে তাহলে যথাসম্ভব মুখ বন্ধ করতে হবে। কেননা হাই হলে শয়তান হাসে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] নামাযে হাই হলে হাত দিয়ে মুখ বন্ধ করা জায়েয।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহহ- আবু হুরায়রা (রা.)]
নাজাযে কারো হাঁচি হলে এ দোয়া পড়বে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا عَلَيْهِ كَمَا يُحِبُّ رَبُّنَا وَيَرْضَى –
অর্থাৎ- সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, অসংখ্য প্রশংসা বরকত পূর্ণ, তার উপর বরকত যাকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং পছন্দ করেন।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ রেফাআ বিন রা’ফে (রা.)]
নামাযে যে ব্যক্তি হাঁচি আসার কারণে উক্ত দোয়া পড়বে, তার জবাবে يَرْحَمَكَ اللَّهُ বলা নিষেধ।[টিকা-মুসলিম- মুয়াজ বিন হাকাম (রা.)]
সহু সিজদার বিবরণ
যদি নামাযে কারো সন্দেহ দেখা দেয় যে, সে কি তিন রাকাত পড়েছে নাকি চার রাকাত? তাহলে তার যত রাকাতের পড়ার ব্যাপারে ইয়াকীন (দৃঢ় প্রত্যয়) হয় তার উপর ভিত্তি করবে এবং সালামের পূর্বে দুটি সিজদা করবে।[টিকা-মুসলিম- আতা (রা.)] যদি সে পাঁচ রাকাত পড়ে থাকে তাহলে এই দুই সিজদা তার জন্য এক রাকাত হয়ে যাবে, অর্থাৎ তার চার রাকাত ফরজ এবং দুই রাকাত নফল হিসেবে গণ্য হবে। আর সে যদি চার রাকাত পড়ে থাকে তাহলে এই দুই সিজদা শয়তানের জন্য অপমান এবং লাঞ্ছনা স্বরূপ হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে মাসউদ (রা.)] ইমাম যদি প্রথম বৈঠকে না বসেন এবং দাঁড়িয়ে যান, তাহলে মুক্তাদীদেরকেও দাঁড়িয়ে যেতে হবে অত:পর শেষ রাকাতে সালাম ফিরার পূর্বে ইমাম বসে বসে দুই সিজদা দিবে এবং মুক্তাদীরাও ইমামের সাথে সিজদা করবে।[টিকা-মুসলিম- ইমরান বিন হুসাইন (রা.)] যে ব্যক্তির চার রাকাত নামায পড়া আবশ্যক ছিল সে যদি তিন রাকাত নামায পড়ে সালাম ফিরে দেয় এবং চতুর্থ রাকাত না পড়ে থাকে এমতাবস্থায় সে যদি বাড়ীও চলে যায় অথবা কথাবার্তা বলে থাকে তাহলেও উক্ত বাকী এক রাকাত নামায পড়ে সালাম ফিরতে হবে। অত:পর দুই সিজদা দিয়ে আবার সালাম ফিরতে হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে সিরীন (রা.)] কোন ব্যক্তি যদি চার রাকাতের স্থলে দুই রাকাত নামায পড়ে এবং সালাম ফিরে মসজিদ হতে বের হয়ে যায় অথবা কথাবার্তা বলে তবুও সে বাকী উক্ত দুই রাকাত নামাযই পড়বে এবং সালাম ফিরবে। অত:পর তাকবীর দিয়ে দুইটি সিজদা করবে এবং সালাম ফিরবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে মাসউদ (রা.)]
যে ব্যক্তি চার রাকাতের স্থলে পাঁচ রাকাত পড়ে ফেলে তবে নিজে নিজেই অথবা কারো বলার ফলে যদি একথা স্মরণে আসে তাহলে সে সালামের পর দুইটি সিজদা দিবে।[টিকা-আহমাদ- আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.)]
ইমাম যদি ভুলে যান তাহলে কোন মুক্তাদী তাকে সুবহানাল্লাহ বলে স্মরণ করিয়ে দিবে।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারকুতনী- মুগীরা (রা.)] নামাযে যে ব্যক্তির সংশয় হয় যে, সে কি এক রাকাত নামায পড়েছে না দুই রাকাত তাহলে এক রাকাত বলে ধরে নিবে। আর যদি কারো সন্দেহ হয় যে, সে কি দুই রাকাত নামায পড়লো না তিন রাকাত, তাহলে দুই রাকাত ধরে নিবে এবং সালামের পূর্বে দুইটি সিজদা দিয়ে নিবে।[টিকা-তিরমিযী, বায়হাকী উমর (রা.)] যে ব্যক্তি সন্দেহের বশবর্তী হয়ে প্রথম বৈঠকে না বসে এবং উঠে দাঁড়ায় অত:পর বসে যায়, তাহলে সালাম ফিরার পূর্বে দুইটি সিজদা করে নিবে। আর যদি কেহ সম্পূর্ণ না দাঁাঁড়িয়ে বসে পড়ে তাহলে তার উপর সিজদায়ে সহ আবশ্যক নয়।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারকুতনী- সাওবান (রা.)] মুক্তাদী যদি নামাযে কোন কিছু ভুলে যায় তাহলে সহুসিজদা দিবে না। কিন্তু যদি ইমাম সাহেব কোন কিছু ভুলে করেন তাহলে তিনি সহু সিজদা করবেন এবং মুক্তাদীরাও ইমামের সাথে সিজদা করবে।[টিকা-তিরমিযী, বায়হাকী- উমর (রা.)] নামাযে একাকী অবস্থায় বা ইমাম হিসেবে নামায পড়ার সময় কোন কিছু ভুল হলে সহসিজদা করে নিবে।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহহ]
তিলাওয়াতে সিজদার বিবরণ
কুরআন মজীদের ১৫ জায়গায় তিলাওয়াতে সিজদা করা সুন্নত।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা.)] (১) সূরা আ’রাফের শেষে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবু দাউদ] (২) সূরা রা’দ والاصال এর পর (১৫ নং আয়াত)। (৩( সূরা নহলে يؤمرون এর পর (৫০ নং আয়াত)। (৪) সূরা বনী ইসরাঈলে خشوعا -এর পর (১০ নং আয়াত) (৫) সূরা মরিয়মে এর পর (৫৮ নং আয়াত (৬) সূরা হজ্জে প্রথম সিজদা يشاء -এর পর (১৮ নং আয়াত) (৭( সূরা হজ্বে দ্বিতীয় সিজদা تفلحون এর পর (৭৭ নং আয়াত) (৮) সূরা ফুরকানে نفورا এর পর (৬০ নং আয়াত) (৯) সূরা নমলে العظيم -এর পর (২৬ নয় আয়াত)। কারো নিকট تعلنون এর পর (২৫ নং আয়াত)। )১০) সূরা সিজদায় لا يستكبرون এর পর (১৫ নং আয়াত) (১১) সূরা স’দে واناب এর পর (২৪ নং আয়াত) (১২) সূরা ফুসসলাতে لا يسنمون -এর পর (৩৮ নং আয়াত)। (১৩) সূরা নজমের শেষে। (১৪) সূরা ইনশিকাকের لا يسجدون এর পর (২১ নং আয়াত) এবং (১৫) সূরা আলাকের শেষে।
তেলাওয়াতে সিজদা অযু ছাড়াও করা যায়।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
শুকুরানা সিজদার বিবরণ
কারো যদি আনন্দদায়ক বা খুশীর কোন কাজ ঘটে, তবে তার শুকুরানা (কৃতজ্ঞতা) সিজদা করা উচিৎ।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আবু বাকরা (রা.)] সিজদারত অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত থাকবে।[টিকা-আহমাদ, রাজ্জাক, হাকেম- আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.)]
জামাতের সাথে নামায পড়ার ফজিলত
যদি বাড়ীর মাঝে কেউ নামায পড়ে তাহলে সে নামায আদায় হয়ে যাবে। তবে মসজিদে জামাতের সাথে নামায পড়লে ২৭ গুণ বেশি নেকী পাওয়া যাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমার ইচ্ছা হয় যে, নামাযের সময় কাউকে আমার স্থলে এসে ইমামতী করতে বলি এবং যে ব্যক্তি জামাতের সাথে নামায পড়ার জন্য মসজিদে আসে না, তার বাড়ীঘর নিজে গিয়ে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেই।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] কোন গ্রামে বা জঙ্গলে যদি তিনজন লোক থাকে, তারা জামাত করে নামায না পড়ে, তাহলে শয়তান তাদের উপর প্রাধান্য লাভ করে।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)] যদি দুইজন লোক থাকে তাহলে একজন ইমাম এবং অপরজন মুক্তাদী হবে। আর যদি তিনজন থাকে তাহলে একজন ইমাম হবে এবং অন্য দু’জন মুক্তাদী। অত:পর সংখ্যা যত বেশি হবে আল্লাহ তাদের তত বেশি পছন্দ করবেন।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ আবু দারদা (রা.)] ফজর এবং এশা নামায জামাতের সাথে পড়া মুনাফিকদের জন্য বড় কষ্টকর। যদি তারা এর মর্যাদা ও ফজিলত জানতো তাহলে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ নামায আদায় করার জন্য মসজিদে আসতো।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] যে ব্যক্তি জামাতের সাথে এশার নামায আদায় করলো সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত নামায পড়তে থাকলো। আর যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতের সাথে পড়লো, সে যেন সারারাত নামায পড়তে থাকলো।[টিকা-মিশকাত- আনাস (রা.)]
যে ব্যক্তি ৪০ (চল্লিশ) দিন জামাতের সাথে এভাবে নামায পড়তে থাকলো যে, প্রত্যেক ওয়াক্তে প্রথম তাকবীর পেলো, তাহলে তার জন্য দুইটি বৈশিষ্ট লেখা হবে। একটি বৈশিষ্ট হচ্ছে আল্লাহ তাকে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হচ্ছে আল্লাহ তাকে মুনাফিকদের কাজকর্ম এবং তাদের অভ্যাস-চরিত্র হতে রক্ষা করবেন।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে আব্বাস (রা.)] যে ব্যক্তি ভাল করে অযু করে জামাতের সাথে নামায পড়ার উদ্দেশ্যে মসজিদে যাবে এবং মসজিদে ইতপূর্বে জামাত হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তাকে যারা জামাতের সাথে নামায পড়েছে তাদের সমপরিমাণ নেকী দিবেন।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] মসজিদে জামাত হয়ে যাবার পর যদি কেউ নামায পড়ার জন্য যায় এবং তার সাথে নামায পড়ার জন্য কাউকে না পায়, তবে যারা ইতিপূর্বে নামায পড়ে ফেলেছে তাদের মধ্যে কেউ যেন তার সাথে নামাযে শামিল হয়, এমতাবস্থায় সে জামাতের সওয়াব পাবে এবং যে ব্যক্তি তার সাথে শামিল হয়েছিল সে সাদকা করার সওয়াব পাবে।[টিকা- তিরমিযী, আবু দাউদ, মিশকাত- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] যদি নামাযের জন্য তাকবীর দেয়া হয়ে যায় তবে জামাতে শামিল হবার জন্য দৌড়ে যাওয়া উচিৎ নয়। কেননা কোন লোক যখন বাড়ী হতে নামাযের উদ্দেশ্যে মসজিদের পানে যায় তাহলে সে সওয়াব এবং হুকুমের দিক থেকে নামাযের মাঝেই শামিল হয়ে যায়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
ওযর-অসুবিধার কারণে জামাত তরক করা
যে ব্যক্তি আযান শোনার পর কোন ওযর বা অসুবিধে ব্যতিরেকে মসজিদে জামায়াতের জন্য যাবে না, তার নামায দুরস্ত হয় না।[টিকা-ইবনে মাজাহ, দারকুতনী, ইবনে হিব্বান, হাকেম ইবনে আব্বাস (রা.)]
জ্ঞাতব্য: ওযরের মধ্যে হচ্ছে- পথে দুশমনের ভয় থাকা অথবা অসুখ হওয়া, [টিকা-আবু দাউদ, দারকুতনী] শীত বা ঠান্ডা, ঝড়-বাতাস এবং বৃষ্টির কারণে বাড়ীতে নামায পড়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)।]
যদি এশার নামাযের সময় কারো সামনে খাবার এসে যায় এবং পাশেই জামায়াত শুরু হয়ে যায় তবুও খাবার খেয়ে নামায পড়বে এবং তাড়াহুড়া করবে না।[টিকা-প্রাগুক্ত] যদি কারো পায়খানা বা পেশাবের প্রয়োজন হয়ে পড়ে তবে প্রথমে তা সেরে নিবে এরপর নামাজ পড়বে। যদি জামাত ছুটে যায় তবুও কোন অসুবিধা নেই।[টিকা-প্রাগুক্ত] যার খাবার প্রস্তুত হয়ে যাবে বা যার পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হবে, সে যদি খাবার খাওয়ার পূর্বে বা পেশাব পায়খানার কাজ শেষ করার পূর্বে নামায পড়ে নেয় তাহলে তার নামায অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তি আযান শুনতে পাবে তার জন্য মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে নামায পড়া অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়- যদিও সে ব্যক্তি অন্ধ হয়।[টিকা-মুসলিম আবু হুরায়রা (রা.)]
জামাতের সাথে মহিলাদের নামায পড়া
ঘরের মধ্যে নামায পড়া মহিলাদের জন্য উত্তম। কিন্তু কোন মহিলা যদি মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামায পড়তে চায় তবে কেউ যেন বাধা না দেয়।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে উমর (রা.)] যে মহিলা সুগন্ধী লাগিয়ে নামায পড়ার জন্য মসজিদে যাবে তার নামায কবুল হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে অপবিত্র অবস্থা হতে পাক হবার জন্য গোসল করার মত গোসল না করবে।[টিকা-প্রাগুক্ত] মহিলাদের বাড়ীর আঙ্গিনায় নামায পড়ার চেয়ে দেয়াল বা দালানের নীচে নামায পড়া উত্তম। দেয়াল বা দালানের নীচের চেয়ে কামরার মধ্যে নামায পড়া আরো অধিক উত্তম।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে উমর (রা.)]
জ্ঞাতব্য: মহিলারা অন্দর মহলে যতই পর্দার সাথে নামায পড়বে ততই বেশি সওয়াব পাবে, কারণ তাদেরকে পর্দা রক্ষা করার জন্য বিশেষভাবে আদিষ্ট হয়েছে।
ইমামতীর বিবরণ
যে ব্যক্তি উত্তমভাবে কুরআন পড়তে পারে তাকেই ইমাম বানানো উচিৎ, তবে তাকে নামাযের আরকান এবং হকুম-আহকাম ভালভাবে জানতে হবে। যদি দুইজন লোক কুরআন পড়ার ক্ষেত্রে সমান হয় তবে এদের মাঝে প্রথমে যে হিজরত করেছে (মক্কা হতে মদীনায়) তাকে ইমাম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ইলম, কিরাত ও হিজরতের দিক থেকে দু’জনই সমান হলে এদের মাঝে যে বয়সে বড় তাকে ইমাম বানাতে হবে।[টিকা-মুসলিম-আবু মাসউদ (রা.)] কারো নিয়োগকৃত ইমামতীর স্থলে ইমামতী করবে না এবং কারো বিছানায় (বা আসনের) উপর তার অনুমতি ব্যতীত বসবে না। কিন্তু কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে গিয়ে (বা এমনিতেই) কাউকে ইমামতী করার অনুমতি দেয় তাহলে ইমামতী করা জায়েয [টিকা-মুসলিম] এবং অন্ধ লোককে ইমাম নিযুক্ত করা জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ- আনাস (রা.)] তিন প্রকার লোকের নামায কবুল হয় না। ১. যার উপর তার জাতি অসন্তুষ্ট থাকে, ২. সেই মহিলা যার উপর তার স্বামী ক্রোধান্বিত এবং সে সারারাতে তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করেনি, ৩. তারা পরস্পর দুই ভাই অসন্তুষ্ট রয়েছে অর্থাৎ তারা ইসলামী অধিকার (যেমন সালাম দেয়া ইত্যাদি) এর সম্পর্ক ছেদ করেছে তিন দিনের অধিক সময় ধরে। তিন দিনের অধিক পর্যন্ত সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়।[টিকা-ইবনে মাজাহহ- ইবনে আববাস (রা.)] যেখানে কুরআন পড়া ছেলে নাবালেগ হবে এবং কোন বড় মানুষ (ভাল করে কুরআন পড়তে পারে) না পাওয়া যাবে, সেখানে ঐ ছেলেই নামায পড়াবে। এতে শরয়ী কোন নিষেধ নাই।[টিকা-বুখারী- আমর ইবনে সালমান (রা.)] ইমাম যেখানে নামায পড়িয়েছেন সেখানে সুন্নত নফল না পড়ে জায়গা বদল করে পড়বে।[টিকা-আবু দাউদ- আতা খোরাসানী (রা.)]
মহিলা কর্তৃক মহিলাদের ইমামতী করা
মহিলা কর্তৃক মহিলাদের নামাযের ইমামতী করা জায়েয এবং ইমামতকারিনী মহিলাদের কাতারের মাঝে দাঁড়াবে। অর্থাৎ পুরুষ ইমাম সামনে দাঁড়িয়ে যেভাবে নামায পড়ায় সেভাবে দাঁড়াবে না।[টিকা- দারাকুতনী, বায়হাকী আয়েশা (রা.)] বৃদ্ধ পুরুষ এবং ছোট বাচ্চা যদি মহিলার পিছনে নামায পড়ে তাহলে সেটা জায়েয।[টিকা-মিসকুল খিতাম]
নামাযে ইমামকে বলে দেয়ার বিবরণ
ইমাম নামাযে কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে যদি ভুলে যায় তাহলে মুক্তাদী তাকে লোকমা দিয়ে বলে দিবে।[টিকা-তালখীস]
ইমাম কর্তৃক মুক্তাদীর অবস্থা খেয়াল রাখা
ইমামের পিছনে নামাযরত কোন মহিলার বাচ্চা যদি কাঁদতে শুরু করে তাহলে ইমামকে তার নামায সংক্ষেপ করে (তাড়াতাড়ি শেষ করে) দেয়া উচিৎ। কেননা বাচ্চা কাঁদার কারণে তার মা ভীষণ কষ্ট পাবে।[টিকা-বুখারী- আবু কাতাদা (রা.)] যে ব্যক্তি লোকদের ইমামতী করে তার নামায হালকা করা উচিৎ। কেননা তার পিছনে অসুস্থ, দুর্বল বৃদ্ধলোক থাকে। এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, তার পিছনে ছোট ছেলে এবং (জরুরী) প্রয়োজন ওয়ালা লোকও থাকতে পারে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] ইমাম যদি ভালভাবে নামায পড়ান তাহলে তিনিও সওয়াব পাবেন এবং মুক্তাদীরাও সওয়াব পাবে। আর তিনি যদি ভালভাবে নামায না পড়ান, তাহলে মুক্তাদীরা সে নামাযের সওয়াব পেয়ে যাবে এবং ইমামের জিম্মায় গুনাহ এবং আযাব রয়েছে।[টিকা- বুখারী- আবু হুরায়রা (রা.)]
মুক্তাদীদের ইমামের অনুসরণ করার বিবরণ
মুক্তাদীদের ইমামের পূর্বে রুকু করা, সিজদা করা এবং সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি সব কাজকর্ম নিষেধ। রাসূলে করীম (স:) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ইমামের পূর্বে মাথা উঠাবে বা সিজদায় যাবে তার জানা উচিৎ যে, তার কপালে শয়তানের হাত রয়েছে।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)] তিনি আরো ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ইমামের পূর্বে নিজ মাথা উঠায় সে কি এ কথা হতে ভয় করে না যে এ ধরনের যেন না হয় যে, আল্লাহ তার মাথাকে গাধার মাথায় রূপান্তরিত করে দিবেন।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক-আবু হুরায়রা (রা.)] ইমাম যদি নামাযে কোন কিছু ভুলে যান তাহলে সুবহানাল্লাহ বলে কোন মুক্তাদী তাকে সচেতন করে দিবে। মহিলাদের ইমামতী যদি কোন মহিলা করেন এবং তিনি কোন কিছু ভুল করেন তবে কোন মহিলা মুক্তাদী তাকে হাততালি দিয়ে সতর্ক করে দিবে।[টিকা-বুখারী- সাহল বিন সা’দ (রা.)] কোন ব্যক্তি একই নামাযে ইমাম এবং মুক্তাদী হতে পারে।[টিকা-মুসলিম- মুগীরা ইবনে শোবা (রা.)]
জ্ঞাতব্য: এতে এটাই সাব্যস্ত হয় যে, মাসবুক এর পিছনেও ইক্তিদা (অনুসরণ) করা জায়েয। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সাধারণ ব্যক্তির পিছনে নামায আদায় করা জায়েয।
যার কোন রাকাত ইমামের সাথে পড়তে বাকী রয়ে যায়, সে যতক্ষণ পর্যন্ত ইমাম সাহেব সালাম না ফিরেন ততক্ষণ উঠে দাঁড়াবে না।[টিকা-মুসলিম] ইমাম যদি কোন ওযরের কারণে বসে নামায পড়েন তাহলে মুক্তাদীদের দাঁড়িয়ে নামায পড়া উচিৎ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
ইমামের পিছনে মুক্তাদীর দাঁড়াবার স্থান
যদি একজন ইমাম এবং একজন মুক্তাদী হন তাহলে মুক্তাদী ইমামের সাথে ডান পাশে দাঁড়াবে। যদি দ্বিতীয় মুক্তাদী এসে যায় তাহলে প্রথম মুক্তাদী পিছনে হটে যাবে অথবা দ্বিতীয়জন তাকে ছিপনে টেনে নিবে। যদি দু’জন ইমামের সাথে ডানে বামে দাঁড়িয়ে যায় তাহলে ইমাম তাদের হাত দিয়ে পিছনে হটিয়ে দিবেন।[টিকা-মিশকাত- জাবের (রা.)] যদি ইমাম, দু’জন পুরুষ এবং একজন মহিলা মুক্তাদী হয়, তাহলে পুরুষ মুক্তাদী দুজন ইমামের পিছনে এবং মহিলা মুক্তাদী এদের পিছনে দাঁড়াবে। আর যদি ইমাম ও একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা মুক্তাদী হয়, তাহলে ইমামের সাথে পুরুষ মুক্তাদী দাঁড়াবে এবং মহিলা মুক্তাদী পিছনে দাঁড়াবে।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)]
কাতারসমূহ সোজা করার বিবরণ
মুক্তাদী তার পার্শ্ববর্তীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলায়ে এবং পায়ের সাথে নিজ পা মিলায়ে দাঁড়াবে।[টিকা-বুখারী- আব্বাস (রা.)] তাকবীর হয়ে যাবার পর ইমাম ডান পাশের মুক্তাদীদের বলবেন, সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং কাতার সমান করুন, অতপর বাম পাশের মুক্তাদীদের বলবেন, সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং কাতার সোজা করুন।[টিকা-মিশকাত- আনাস (রা.)] যে ব্যক্তি নামাযে আপন স্কন্ধ নরম রাখে (পাশে কাউকে ঘেঁসে দাঁড়াতে দেয়) সে খুব ভাল লোক।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে আব্বাস (রা.)] মুক্তাদীদের উচিৎ ইমামকে মধ্যখানে রাখা। অর্থাৎ যেন এ ধরনের না-হয় যে, একপাশে বেশি লোক এবং অন্য পাশে কম এবং মধ্যকার ফাক বন্ধ করবে। অর্থাৎ একে অপরের সাথে মিলে (ঘেঁষে ঘেঁষে) দাঁড়াবে।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] মসজিদের থামের মাঝে কাতার করা নিষেধ।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ আব্দে হুমাইদ বিন মাহমুদ (রা.)] পুরুষদের জন্য প্রথম কাতারে দাঁড়ানো বেশি সওয়াব [টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] এবং মহিলাদের উপর আল্লাহ তায়ালা এবং ফেরেস্তারা রহমত বর্ষণ করেন।[টিকা-আবু দাউদ- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তি কাতারের পিছনে একাই নামায পড়ে তার নামায সঠিক হয় না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী- অবেসা ইবনে সাঈন (রা.)]
যে সব ওয়াক্তে নামায পড়া নিষেধ
সূর্য উঠার সময়, ঠিক দুপুরের সময়, সূর্য ডুবার সময় নামায পড়বে না এবং ফজরের নামাযের পর সূর্য ভালভাবে না উঠা পর্যন্ত নামায পড়া উচিৎ নয়। আসরের নামাযের পর হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নামায পড়া নিষেধ।[টিকা-মুসলিম- আমের (রা.)] কিন্তু যে যে ওয়াক্তে নামায পড়া প্রয়োজন সে নামায যদি কোন কারণে ছুটে যায় বা পড়তে না পারা যায় তাহলে এসব (নিষেধ) ওয়াক্তে পড়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] মক্কা শরীফে নামায পড়া কোন ওয়াক্তেই নিষেধ নাই।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ- জুবাইর ইবনে মুতআম (রা.)]
সুন্নাত নামাযের বিবরণ
জোহর নামাযের পূর্বে চার রাকাত সুন্নত পড়বে। দুই রাকাত পড়াও সহীহ হাদীস দ্বারা সাবেত রয়েছে। জোহর নামাযের পর দুই রাকাত সুন্নাত পড়বে। মাগরিবের পর নিজঘরে দুই রাকাত পড়বে। এশার নামাযের পর দুই রাকাত পড়বে এবং ফজরের নামাযের পূর্বেই দুই রাকাত হালকা ভাবে পড়বে। এই বার রাকাত (ফরজ ব্যতীত) যা উল্লেখ হয়েছে তা সুন্নত নামায। যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্য তা পড়ে আল্লাহ তার জন্য বেহেশতে ঘর তৈরী করেন।[টিকা-মুসলিম- উম্মে হাবীবা (রা.)] এটাও বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সর্বদা জোহরের পূর্বে চার রাকাত এবং পরে চার রাকাত পড়ে আল্লাহ তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেন।[টিকা- আহমাদ, সুনানে আরবা উম্মে হাবীবা (রা.)] যদি কারো জোহরের পূর্বে চার রাকাত পড়তে বাকী থেকে যায় তাহলে জোহরের পরে তা পড়ে নিবে।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহহ- আবু আইউব আনসারী (রা.)] জোহরের পূর্বের চার রাকাত এক সালামে পড়ার কথাও প্রমাণিত এবং দুই সালামে পড়াও প্রমাণিত।[টিকা-তিরমিযী- আসেম ইবনে হামযা (রা.)]
যে ব্যক্তি আসরের নামাযের পূর্বে চার রাকাত নামায পড়বে, সে রাসূলুল্লাহ (স:) এর এ দোয়া পাবে- আল্লাহ তায়ালা তার উপর রহম করুন।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী] এটিও বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি আসরের আগে চার রাকাত নামায পড়ে আল্লাহ তায়ালা তার শরীরের উপর জাহান্নামের আগুনকে হারাম করে দেন।[টিকা-তবারানী] আসরের পূর্বে চার রাকাত নামায এবং ফরজ নামাযের মাঝে সালাম দ্বারা পার্থক্য করবে।[টিকা-তিরমিযী- আলী (রা:)] আসরের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়ার কথাও বর্ণিত হয়েছে।[টিকা-আবু দাউদ- উম্মে সালমা (রা.)] সূর্যাস্তের পর এবং মাগরিব নামাযের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়বে।[টিকা-বুখারী- আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা.)] মাগরিবের পরের দুই রাকাত সুন্নাতে (বেশির ভাগ সময়ে) সূরা কাফিরুন এবং সুরা ইখলাস পড়বে।[টিকা- তিরমিজী- ইবনে মাসউদ (রা.)] ফজরের সুন্নাত এবং ফরজ নামাযের মাঝে প্রয়োজনের সময় কথা বলা জায়েয।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] ফজরের সুন্নাত এবং ফরজ নামাজের মাঝে ডান পাশে কাত হয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকা সুন্নত।[টিকা-তিরমিযী] ফজরের পূর্বে ফরজ নামায শুরু হয়ে যাবার কারণে সুন্নত না পড়তে পারলে তা ফরজ নামাযের পরে পড়ে নেয়া জায়েয।[টিকা-নায়লুল আওতার] ফরজ নামায সমূহের তাকবীর হয়ে যাবার পর সুন্নাত ইত্যাদি নামায পড়া জায়েয নয়।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] ফজরের সুন্নাত নামায যদি ফজরের পূর্বে না পড়া হয়ে থাকে তাহলে তা সূর্য্যোদয়ের পর পড়াও জায়েয।[টিকা- তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)]
তাহাজ্জুদ নামাযের বিবরণ
তাহাজ্জুদ নামায ১৩ রাকাত এভাবে পড়বে যে দুই রাকাতে সালাম ফিরে আট রাকাত পড়বে। অতপর পাঁচ রাকাত বিতের পড়বে এবং এদের মাঝে তাশাহুদের জন্য বসবে না। একেবারে পঞ্চম রাকাতে তাশাহুদের জন্য বসবে। কিংবা তের রাকাত এভাবে পড়বে যে ছয় সালামে বার রাকাত পড়বে এবং শেষে এক রাকাত বিতের পড়বে।[টিকা-বুখারী] যদি ১১ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে তাহলে দুই দুই রাকাতে সালাম ফিরে ১০ রাকাত পড়বে এবং এক রাকাত বিতের পড়বে। অথবা ১১ রাকাত এভাবে পড়বে যে আট রাকাত চার চার রাকাতে সালাম ফিরবে এবং তিন রাকাত বিতের পড়বে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] তাহাজ্জুদ নামায কখনো ৯ রাকাত কথানো ৭ রাকাত পড়বে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ- আয়েশা (রা.)] তাহাজ্জুদ নামায আওয়াজ করে পড়তে পারে এবং নি:শব্দেও পড়তে পারে, দুভাবেই পড়া জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] বৃদ্ধ বয়সে কেউ যদি তাহাজ্জুদ নামাযের মধ্যে কেরাত লম্বা করতে চায় তবে বসে বসে কুরআন পড়বে। অতপর কেরাতের অল্প কিছু। বাকী থাকতে উঠে দাঁড়াবে এবং কিছু কেরাত করে রুকু এবং সিজদা করবে। এভাবেই দ্বিতীয় রাকাত পড়বে।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
ফরজ নামায সমূহের পর সবচেয়ে উত্তম নামায হচ্ছে তাহাজ্জুদের নামায। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা রহম করল ঐ ব্যক্তির উপর যে রাতে তাহাজ্জুদ নামায পড়ে অতপর আপন স্ত্রীকে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য উঠায়। স্ত্রী যদি উঠতে না পারে তাহলে তার মুখে পানির ছিটা দিয়ে উঠায়। আল্লাহ তায়ালা ঐ মহিলার উপর রহম করুন যে রাতে উঠে তাহাজ্জুদের নামায পড়ে অতপর নিজ স্বামীকে তাহাজ্জুদ নামাযের জন্য উঠায়। সে যদি না উঠে তাহলে তার মুখে পানির ছিটা দিয়ে উঠায়।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
যখন তাজাজ্জুদের নামাযের জন্য উঠবে তখন দশবার اللَّهُ أَكْبَرُ দশবার سبحان سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ الْحَمْدُ لِللَّهِ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ أَسْتَغْفِرُ اللهَ الْمَلِكِ الْقُدُّوسُ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ ضِيقِ الدُّنْيَا وَضِيقِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ দশবার পড়বে।
অর্থ- হে আল্লাহ। আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি দুনিয়ার সংকীর্ণতা হতে, কিয়ামতের দিনের সংকীর্ণতা এবং কাঠিন্যতা হতে।[টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত শরীক হুজানী (রা.)]
বিতের নামাযের বিবরণ
বিতের নামায ৯ রাকাত ৭ রাকাত ৫ রাকাত ৩ রাকাত এবং ১ রাকাত পড়ার কথাও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যে ব্যক্তি ৯ রাকাত দিতের পড়তে চায় সে ৮ রাকাত পড়ে বসবে এবং আত্তাহিয়্যাতু পড়বে এবং সালাম না ফিরে উঠে দাঁড়াবে। অতপর নবম রাকাত পড়ে বসবে এবং আত্তাহিয়্যাতু দরুদ এবং অন্যান্য দোয়া পড়বে এবং সালাম ফিরবে।[টিকা-বুখারী মুসলিম- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তি ৭ রাকাত বিতের পড়তে চায় সে ৬ রাকাত পড়ে বসবে এবং আত্তাহিয়্যাতু পড়বে এবং সালাম না ফিরে উঠে দাঁড়াবে। অতপর সপ্তম রাকাত পড়ে বসবে এবং আত্তাহিয়্যাতু দরুদ এবং অন্যান্য দোয়া পড়ে সালাম ফিরবে।[টিকা-মুসলিম- সা’দ ইবনে হিশাম (রা.)] যে ব্যক্তি ৫ রাকাত বিতের পড়তে চায় সে তাশাহুদের জন্য কোথাও বসবে না এবং শেষ রাকাতে বসে আত্তাহিয়্যাতু দরুদ এবং অন্যান্য দোয়া পড়ে সালাম ফিরবে।[টিকা-বুখারী মুসলিম- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তি ৩ রাকাত বিতের পড়তে চায় সে তাশাহুদের জন্য কোথাও না বসে তৃতীয় রাকাতে বসবে এবং আত্তাহিয়্যাতু দরুদ এবং অন্যান্য দোয়া পড়ে সালাম ফিরবে।[টিকা-জুরকানী, শরহে মুয়াত্তা- আয়েশা (রা.)] তিন রাকাত বিতের পড়লে প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়বে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ- উবাই ইবনে কা’ব (রা.)]
বিতের নামাজ পড়ে যখন সারাম ফিরবে তখন তিনবার سبحان الملك القدوس পড়বে এবং তৃতীয় বার আওয়াজ একটু উঁচু করবে।[টিকা-তিরমিযী, নাসাঈ- আলী (রা.)] যার এ আকাংখা হয় যে, সে শেষ রাতে উঠবে (নফল বা তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য) সে রাতের প্রথম ভাগে বিতের পড়বে না।[টিকা-মিশকাত] যার এ আশংকা হবে যে, সে শেষ রাতে উঠতে পারবে না তাহলে সে রাতের প্রথমে ভাগেই বিতের পড়ে নিবে।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] যে ব্যক্তির বিতের নামায রয়ে যাবে সে ফজর নামাযের পূর্বে তা পড়ে নিবে।[টিকা-হাকেম, বায়হাকী- আবু দারদা (রা.)] ফজর নামাযের পর বিতের পড়া ঠিক নয় [টিকা-মুসলিম- সা’দ ইবনে হিশাম (রা.)] এবং এক রাতে দুই বিতের পড়াও জায়েয নহে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ তলক ইবনে আলী (রা.)] যানবাহনের উপর নামায পড়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] যানবাহনে নামায পড়ার শর্ত হচ্ছে তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় মুখ কিবলার দিকে নিবে অতপর যে দিকেই মুখ থাক নামায পড়তে থাকবে।[টিকা-আবু দাউদ, জাবের (রা.)] সুয়ারীর উপর রুকু এবং সিজদা ইশারায় করবে এবং সিজদার সময় বেশি ঝুঁকে মাথা নত করবে আর রুকুর সময় সমান্য ঝুকবে।[টিকা-মুসলিম] বিতেরের পর দুই রাকাত নামায বসে বসে পড়া মুস্তাহাব।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা] কেহ যদি তিন রাকাত বিতের নামাযে দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরে দেয় এবং জরুরী কথা বার্তা বলে অতপর তৃতীয় রাকাত পড়ে তাহলে তা জায়েয। বিতেরে এ দোয়া কুনুত (রুকুর পর হাত উঠায়ে) পড়বে:
اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ وتولني فيمن توليت وبارك لي فيما أعطيت وقني شر ما قضيت فَإِنَّكَ تَقضي ولا يُقْضَى عَلَيْكَ إِنَّهُ لَا يَذِلُّ
من واليت ولا يعز من عاديت تباركت ربنا وتعاليت وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ –
অর্থাৎ- ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে হেদায়েত দান করুন হেদায়েত দানকারীদের মাঝে (যাদেরকে আপনি হেদায়েত দান করেছেন তাদের অন্তর্গত করুন) এবং আমাকে নিরাপদে রাখুন ঐ দলের মাঝে যাদের আপনি নিরাপদে রেখেছেন (দুনিয়া এবং আখেরাতের বিপদ- হতে) এবং আপনি আমার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করুন যাদের আপনি তত্ত্বাবধান গ্রহণ করেছেন এবং আপনি যা আমাকে দান করেছেন তাতে কল্যাণ ও বরকত দান করুন এবং আপনি আমাকে রক্ষা করুন অকল্যাণ হতে যা আপনি আমার জন্য ফয়সালা করেছেন। নিশ্চয় আপনি ফয়সালা করেন এবং আপনার উপর কোন ফয়সালা করা হয় না। আপনি যার বন্ধু তাকে কেউ লাঞ্ছিত করতে পারে না। আর আপনি যার বিপক্ষে (শত্রুতা করেন) তাকে কেউ ইজ্জত দিতে পারে না। আপনি বরকতময়, সুমহান হে আমার প্রভু! এবং নবী (সা.) এর উপর আল্লাহর করুনা ও অনুগ্রহ বর্ষিত হোক।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- হাসান ইবনে আলী (রা.)]
ফজর এবং মাগরিবের নামাযে দোয়া কুনুত পড়া জায়েয।[টিকা-আহমাদ]
চাশত নামাযের বিবরণ
চাশত নামায চার রাকাত পড়বে। যদি কেহ চার রাকাতের বেশি পড়ে তাহলে সে এর সওয়াব পাবে।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
তারাবী নামাযের বিবরণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম রাতের প্রথম ভাগে, মধ্যভাগে এবং শেষ ভাগে ২৩, ২৫ এবং ২৭শে রমজানে জামায়াত করে তারাবী নামায পড়েছেন।[টিকা-সুনানে আরবা- আবু যর (রা.)]
হযরত উমর (রা.) এর খেলাফত কালে তারাবী নামায নিয়মিতভাবে সাহাবীদের (জামায়াতবদ্ধ হয়ে) পড়ার কথা প্রমাণিত।
জ্ঞাতব্য: তারাবী নামায রমজানে রাসূল (সা.) কর্তৃক বিতের সহ এগার রাকাতের বেশি পড়ার কথা কোন সহী হাদীসে নাই। মহিলারা তাবারী নামায পড়বে।
এস্তেখারা নামাযের বিবরণ
যদি কোন ব্যক্তির সামনে কোন (গুরুত্বপূর্ণ) কাজ এসে উপস্থিত হয় (এ কাজের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে জন্য) তাহলে সুন্নাত হলো এস্তেখারা করা। এভাবে এস্তেখারা করবে, প্রথমে অযু করবে, অতপর দুই রাকাত নফল নামায পড়বে। অতপর আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করবে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি দরুদ পাঠ করবে। অতপর নিম্নোক্ত দোয়া পড়ে শুয়ে যাবে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ وَاسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ وَاسْتَلْكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ وَأَنْتَ عَلامُ الْغُيُوبِ – اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأمر … خير لي في ديني ومعاشي وعاقبة أمري فاقدره لي ويسره لي ثم بارك لي فِيهِ وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأمر … شَرَّ لِي فِي دِينِي ومعاشي وعاقبة أمري فاصْرِفْهُ عَنِّى وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدِرْنِي لِلْخَيْرِ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي به –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট কল্যাণ কামনা করছি আপনার ইলমের সহযোগতিায় এবং আমি আপানার কল্যাণ পাবার জন্য আপনার কুদরত কামনা করছি এবং আমি প্রার্থনা করছি আপনার অনুকম্পা যা অতি বিরাট। নিশ্চয় আপনি ক্ষমতা রাখেন এবং আমি কোন কিছুর উপর ক্ষমতা রাখি না এবং আপনি গায়েব সমূহ জানেন। হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে এ কাজটি বা বিষয়টি (তার নাম উল্লেখ করবে) আমার দ্বীনের ক্ষেত্রে, আমার কর্মের দ্রুত বা মন্থর পরিণামের ক্ষেত্রে কল্যাণকর, তাহলে আমার জন্য তা নির্দিষ্ট করে দিন। এবং আমার জন্য তা সহজ করে দিন অতপর আমার জন্য তাতে বরকত দান করুন। আর আপনি যদি জানেন যে এ কাজটি ক্ষতিকারক আমার দ্বীনের ক্ষেত্রে, আমার জীবন যাপনের ক্ষেত্রে আমার কর্মের দ্রুত বা মন্থর পরিণামের ক্ষেত্রে, তাহলে তা আমার হতে দূর করুন এবং তা হতে আমাকে দূর করুন এবং যেখানে আমার জন্য কল্যাণ রয়েছে তা নির্দিষ্ট করে দিন। অতপর আমাকে তাদ্বারা রাজী সন্তুষ্ট করুন।[টিকা-বুখারী]
জ্ঞাতব্য: এ দোয়া পড়ে কাজ করলে অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তার জন্য কল্যাণ করবেন এবং অকল্যাণ হতে রক্ষা করবেন। কেউ কেউ বলেন এ দোয়া তিনদিন বা সাত দিন পড়লে ফলাফল পাওয়া যাবে। স্বপ্নে কিছু জানা যাবে অথবা মনের মাঝে একাজ করা বা না করার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত বা অনুরাগ সৃষ্টি হবে। সেটাকেই আল্লাহর হুকুম বলে মনে করবে।
সফরে নামায কসর করার বিবরণ
মুসাফির যখন নিজঘর থেকে সফরের ইচ্ছায় বের হবে তখন নামায কসর করবে অর্থাৎ চার রাকাতের স্থলে দুই রাকাত পড়বে। কিন্তু মাগরিবের নামায তিন রাকাত। তা বাড়ীতে এবং সফরে তিন রাকাতই পড়বে। ফরজ নামাযেও কসর নাই এর কেরাত লম্বা হওয়ার কারণে।[টিকা-বুখারী- আয়েশা (রা.)] মুসাফিরের জন্য নামায কসরের যে হুকুম রয়েছে তা আল্লাহ তা’য়ালার দেয়া সদকা। এ সাদকা গ্রহণ করা উচিৎ।[টিকা-মুসলিম] আল্লাহ তায়ালা এটা পছন্দ করেন যে, তার রুখসাত (অনুমতি) দেয়া কাজকর্ম পালন করা হয়।[টিকা-আহমাদ] যদি কোন ব্যক্তি কোন শহরে অবস্থানের ব্যাপারে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকে (কতদিন থাকতে হবে তা নিশ্চিত নয়) তাহলে ২০ দিন পর্যন্ত কসর পড়বে। আর যখন কেউ চার দিন অবস্থানের এরাদা করে তখন পুরা নামায পড়বে।[টিকা-দুয়ারুল বাহিয়া] যদি চার দিনের বেশি কেউ তার বাসস্থান থেকে সফরের এরাদা করে বের হয়ে থাকে তাহলে তাকে মুসাফির বলে গণ্য করা হবে। সে কসর করবে যদিও সে স্থান এক বারীদ অর্থ বার মাইলেরও কম দূরত্ব হয়।[টিকা-রওযাতুন নাদিয়া] রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক সফরে সুন্নাত নামায পড়াও সাব্যস্ত হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি তা পড়বে সওয়াব পাবে এবং যে পড়বে না, তাকে এ ব্যাপারে ধরা হবে না। সফরে নামায জমা করে পড়া জায়েয। জোহরের ওয়াক্তে জোহরের সাথেই আসর পড়া কিংবা আসরের সাথে জোহর পড়া চলবে। এভাবেই মাগরিবের ওয়াক্তে মাগরিব এবং এশা, কিংবা এশার ওয়াক্তে এশা এবং মাগবির পড়ে নিবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী- মুয়ায (রা.)]
বাড়িতে নামায জমা করার বিবরণ
জরুরী প্রয়োজনের সময়ে বাড়ীতে নামায জমা করে পড়া জায়েয।[টিকা-মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)]
ভয়ভীতি কালীন নামায (সালাতে খওফ)
যুদ্ধ চলাকালীন শত্রুর মোকাবিলা করার সময় এক রাকাত নামায পড়লেই চলবে।[টিকা-মুসলিম] শত্রুর মোকাবিলা করার সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক কয়েকভাবে নামায পড়ার বর্ণনা এসেছে, এর যে কোন একটা অনুসরণ করলেই চলবে।[টিকা-এখানে দুইটি পন্থা উল্লেখ করা হলো: ১. ইমামের সাথে এক দল দুই রাকাত নামায পড়বে অন্যদল শত্রুর মোকাবিলা করবে। দুই রাকাত পড়ে তারা শত্রুর মোকাবিলায় যাবে এবং প্রহরারত দল এসে ইমামের সাথে দুই রাকাত পড়বে। ২. একদল ইমামের পিছনে দাঁড়াবে অন্যদল শত্রুর মোকাবিলা করবে। ইমামের সাথে দাঁড়ান দল ইমামের সাথে এক রাকাত পড়া হলে ইমাম দাঁড়িয়ে থাকবে আর তারা নিজেরা নিজেরা আরেক রাকাত পড়ে নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় চলে যাবে। মোকাবিলাকারী দল এসে ইমামের সাথে দাঁড়ায়ে এক রাকাত পড়বে। এরপর নিজেরা আরো এক রাকাত পড়ে নিবে। ইমাম এদের নিয়ে সালাম ফিরবে।] যখন ভয় বিদ্যমান ও প্রবল থাকে, মারামারী এবং লড়াই শুরু হয়ে যায় তখন পদাতিক বা সোয়ারী যে অস্থায় হোক নামায পড়বে, যদিও কিবলার দিকে মুখ না থাকে এবং ইশারা করে নামায আদায় করতে হয়।[টিকা-দূরারুল বহিয়া]
জুমার নামাযের বিবরণ
জুমার নামায ফরজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُدِي لِلصَّلوة مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ .
“হে ঈমানদারগণ। যখন তোমাদেরকে জুমার দিন নামাযের জন্য আহ্বান করা হয় (অর্থাৎ যখন জুমার জন্য আযান দেয়া হয়) যখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের জন্য দৌড়িয়ে এসো এবং বেচাকিনা ত্যাগ করো।” (সূরা জুমা: ৯)
জুমার নামায দাস, মহিলা, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক, অসুস্থ এবং মুসাফিরের উপর ফরজ নয়।[টিকা-আবু দাউদ, দারকুতনী] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: আমার ইচ্ছা হয় যে, আমি আমার স্থলে কাউকে জুমা পড়াতে বলি এবং যে ব্যক্তি জুমা পড়তে আসে না, নিজে গিয়ে তার ঘর জ্বালিয়ে দেই।[টিকা-মুসলিম- ইবনে মাসউদ (রা.)] যে ব্যক্তি এক জুমা পড়বে না সে এক দিনার সাদকা করবে। যার এক দিনার সাদকা করার সামর্থ নেই সে অর্ধেক দিনার সাদকা করবে এবং যে ব্যক্তি খুবই দরিদ্র সে এক দিরহাম সাদকা করবে। এক দিরহামের সামর্থ না রাখলে অর্ধেক দিরহাম সাদকা করবে। এতে সামর্থবান না হলে এক সা গম সাদকা করবে। এর সামর্থ না থাকলে অর্থ সা’ গম অথবা এক মুদ বা অর্ধ মুদ সাদকা করার কথাও এসেছে।[টিকা-আবু দাউদ]
জ্ঞাতব্য: সোনা যদি ষোল টাকা তোলা হয়, তাহলে এক দিনারে ছয় টাকা এবং অর্ধ দিনারে তিন টাকা আসে। মুদ হচ্ছে চোঙ্গা বা এ ধরনের পাত্রে মাপ। এক মুদে তিন পোয়া মত আসে। চার মুদে এক সা’ এবং তা প্রায় পৌনে তিনসের মত ওজন হয়। (এক মুদকে কেহ কেহ এক অঞ্জলীও ধরেন।)
গ্রামে জুমার নামায পড়া জায়েয।[টিকা-বুখারী- ইবনে আব্বাস (রা.)] যে ব্যক্তি ইমামের সাথে এক রাকাত জুমার নামায পাবে তার জুমা আদায় হয়ে যাবে। সে উঠে আর এক রাকাত পড়ে নিবে।[টিকা-নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, দারকুতনী- ইবনে উমর (রা.)] আর যে ব্যক্তি ইমামের সাথে জুমার পুরা এক রাকাত পাবে না সে চার রাকাত জোহর নামায পড়বে।[টিকা-জুরকানী শরহে মুয়াত্তা] যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করবে এবং মুসজিদে যাবে এবং আল্লাহ তায়ালা তার জন্য যে পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন নামায পড়বে। (অর্থাৎ যতদূর সম্ভব নফল নামায পড়বে) অতপর ইমামের খুতবা পড়া পর্যন্ত চুপ থাকবে এবং ইমামের সাথে জুমা পড়বে, আল্লাহ তা’য়ালা তার সেসব গুনাহ মাফ করে দিবেন যা সে গত জুমা থেকে এ জুমা পর্যন্ত করেছিল এ ছাড়া আরো অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দিবেন।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] এটিও বর্ণিত হয়েছে যে, জুমার দিন যথাসম্ভব পবিত্রতা অর্জন করবে (অর্থাৎ গোফ, নখ কাটবে, বগল ও অন্যান্য স্থানের লোম দূর করবে, কাপড় পরিষ্কার করবে এবং মাথা ধুবে) এবং তেল অথবা সুগন্ধি যদি নিজের কাছে থাকে লাগাবে নতুবা স্ত্রীর নিকট থেকে নিয়ে লাগাবে। অতপর মসজিদে যাবে এবং দুজনের মাঝ ফেড়ে সামনে যাবে না, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার গত জুমা হতে এ জুমা পর্যন্ত সংঘটিত গুনাহ সমূহ মাফ করে দিবেন।[টিকা-বুখারী] যে ব্যক্তি জুমার দিন খসবু পাবে না, তার জন্য পানিই খসবু অর্থাৎ পানি দিয়ে উত্তমভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হবে।[টিকা-আহমদ, তিরমিযী- বারা (রা.)]
জুমার দিন মসজিদের দরজায় ফেরেস্তা থাকে। যে ব্যক্তি প্রথমে মসজিদে প্রবেশ করে তাকে লিখে নেয়। যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম মসজিদে আসে তার উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তির মত যে মক্কায় কুরবানীর জন্য উট প্রেরণ করলো তাতে অনেক সওয়াব মিলে। এরপর যে ব্যক্তি মসজিদে আসে তার উদাহরণ হলো দুম্বা প্রেরণের। এরপর যে ব্যক্তি আসে তার উদাহরণ হলো মুরগী প্রেরণের। এরপর যে আসে তার উদাহরণ হলো ডিম প্রেরণের মতো। যখন ইমাম খুতবা দিেেত শুরু করেন তখন ফেরেশতা নিজ দফতর গুটিয়ে নেয় এবং খুতবা শুনতে শুরু করে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] ইমাম সাহেব মিম্বরে বসার সময় যে আযান দেয়া হয় তা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মুবারক যুগে এবং আবু বকর ও উমর (রা.) এর খেলাফত কালেও সেই (একই) আযান ছিল এবং ইহাই সুন্নাত। এর পূর্বে যে আযান বলা হয়ে থাকে তা হযরত উসমান (রা.) নির্দিষ্ট করেছিলেন এবং এ আযান জায়েয। যে আযান ইমাম মেম্বরে বসার সময় বলা হয়ে থাকে তা মসজিদের দরজার উপর দিতে হবে। জুমা বা জুমা ছাড়া অন্য নামাযে কাউকে তার জায়গা হতে উঠিয়ে সে জায়গায় নিজে বসে পড়া নিষেধ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- নাফে (রা.)]
নিজ কাজ কারবারের কাপড় ছাড়া জুমার জন্য আলাদা কাপড় করে রাখা জায়েয।[টিকা-মুয়াত্তা, ইবনে মাজাহ- আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)] জুমার দিন যখন ইমাম মিম্বরের উপর বসবে তখন লোকদের সালাম দিবে [টিকা-ইবনে মাজাহ- জাবের (রা.)] এবং ইমাম সাহেব লাঠি কিংবা ছড়ির উপর ঠেস দিয়ে খুতবা পাঠ করবে।[টিকা-আবু দাউদ- হাকাম ইবনে হুজন (রা.)]
জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দেবার জন্য মিম্বরের উপর উঠবে, তখন কেবলার দিকে পিঠ এবং লোকদের দিকে মুখ করে মিম্বরের উপর বসবে। যখন মুয়াযযিন আযান দেয়া শেষ করবে তখন খুতবা দেবার জন্য দাঁড়াবে। প্রথম খুতবা শেষ করে বসবে (এবং প্রয়োজন ব্যতিরেকে কথাবার্তা বলবে না)। এরপর দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় খুতবা দিবে।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে উমর (রা.)] প্রয়োজনের সময় ইমামের কথা বার্তা বলা জায়েজ। একবার হযরত রাসূলে করীম (সা.) জুমার খুতবা দিতে দিতে মিম্বর হতে নীচে নামেন এবং আবু রিফাআকে দ্বীনের শিক্ষাদেন। (আরেকবার) রাসূলে কারীম (সা.) জুমার দিন খুতবা দিতে দিতে মিম্বর হতে নেমে পড়েন এবং হাসান ও হোসানইকে উঠিয়ে নিয়ে মিম্বরে উঠেন এং বলেন আল্লাহ তায়ালা সত্যই বলেছেন “নিশ্চয় তোমাদের ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি ফিতনা স্বরূপ।” আমি এদের দু’জনকে দেখে সবুর করতে পারিনি। অতপর তিন খুতবা দিতে শুরু করেন।[টিকা-আবু দাউদ] (আরেক বার) রাসূলুল্লাহ (সা.) খুতবা দিতে ছিলেন এমন সময় এক ব্যক্তি আসে। তিনি তাকে বললেন তুমি নামায (অর্থাৎ সুন্নাত নামায) পড়েছ? সে উত্তর দিলো, না। অতপর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন দাঁড়াও এবং দুই রাকাত নামায পড়ো এবং অল্প কেরাত করো।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জাবের (রা.)] জুমার নামায লম্বা করা এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত করা ইমামের বিচক্ষণতার আলামত।[টিকা-বুখারী- আম্মার (রা:)] জুমার খুতবা শুনতে যদি কারো তন্দ্রা আসে তাহলে নিজ জায়গা পরিবর্তন করে নেবে।[টিকা-তিরমিযী- ইবনে উমর (রা.)] জুমায় গোট মেরে বসা জায়েয।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা.)]
জ্ঞাতব্য: গোট মেরে বসা ঐ অবস্থাকে বলা হয় যা উরুকে পেটের সাথে মিলিয়ে বা উরুর উপর হাত রেখে বসা।
জুমার দিন যখন ইমাম খুতবা দিতে শুরু করবেন তখন মুক্তাদীরা তার সামনে বসবে।[টিকা-বুখারী-আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] ইমাম খুতবা দেয়া অবস্থায় যে ব্যক্তি কংকর নাড়াচাড়া করলো সে বেহুদা বা বাজে কাজ করলো। অর্থাৎ কংকর এদিক সেদিক নাড়াচাড়া করলো, কোন কুটা ভাঙ্গলো কিংবা মাটি ঠোকরালো কিংবা তা নিয়ে দুরে ফেললো কিংবা এ ধরনের কিছু কাজ করলো সে নিরর্থক কাজ করলো।[টিকা-মুসলিম] ইমামের খুতবা দেবার সময় যে ব্যক্তি কথা বলে সে ঐ গাধার মত যার উপর কিতাবের বোঝা চাপানো হয়েছে। আর যে ব্যক্তি তাকে বলবে চুপ থাকো তার নামায (সম্পূর্ণ) হয় না।[টিকা-মিশকাত] যে ব্যক্তি নিজে গোসল করবে এবং নিজ স্ত্রীকে গোসল করাবে অর্থাৎ তার সাথে সহবার করবে, সকাল সকাল গিয়ে প্রথম খুতবা পাবে এবং ইমামের নিকটে বসবে এবং খুতবা শুনবে, নিরর্থক কথাবার্তা বলবে না, তাহলে সে প্রতি পদক্ষেপের জন্য এক বছর দিনে রোজা রাখা এবং রাতে সারারাত নফল নামায পড়ার সমান নেকী পাবে যা তার আমল নামায় লিখা হবে।[টিকা-আহমাদ, তারগীব ওয়াততারহীব] জুমার নামাযের পর দুই রাকাত, চার রাকাত কিংবা ছয় রাকাত নামায পড়বে। ছয় রাকাত এভাবে পড়বে প্রথমে দুই রাকাত পড়বে, অতপর চার রাকাত পড়বে [টিকা-আবু দাউদ] যেখানে ফরজ পড়বে সেখানে সুন্নাত পড়বে না। আগে পরে অথবা এদিক ওদিক সরে গিয়ে পড়বে কিংবা ফরজ এবং সুন্নাতের মাঝখানে কথা বলে নিবে।[টিকা-মুসলিম] কুরবানীর ঈদ শুক্রবারে হলে জুমার নামায পড়া ওয়াজিব নয়।[টিকা-বুখারী]
ঈদের নামাযের বিবরণ
দুই ঈদের নামায সুন্নাত [টিকা-প্রাগুক্ত] এবং ঈদের দিন গোসল করা মুস্তাহাব।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক] যে ব্যক্তির ঈদের নামায ছুটে যাবে সে দুই রাকাত নামায পড়ে নিবে এবং যে মহিলার ঈদের নামায ছুটে যাবে সেও দুই রাকাত নামায পড়ে নিবে।[টিকা-বুখারী] ঈদের নামায পড়ার জন্য প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাদের ঈদগাহে নিয়ে যাবে। (মুসলমানদের দুয়াতে শরীক হবে) এবং লোকদের সাথে তাকবীর পড়বে এবং পর্দা করে জামায়াতের পিছনে দাঁড়াবে।[টিকা-মুসলিম] ঈদগাহে নামায পড়ার জন্য যে রাস্তা দিয়ে যাবে সেই রাস্তা দিয়ে আসবে না।[টিকা-মিশকাত- আবু হুরায়রা (রা.)] ঈদের দিন যদি বৃষ্টি হয় তাহলে ঈদের নামায মসজিদে পড়বে।[টিকা-মিশকাত- আবু হুরায়রা (রা.)] ঈদুল আযাহার দিন তাড়াতাড়ি নামায পড়বে এবং ঈদুল ফিতরের দিন দেরী করে নামায পড়বে: ঈদুল ফিতরের দিন বেজোড় খেজুর খেয়ে নামায পড়তে যাবে এবং ঈদুল আযহার দিন নামাযের পর খাবে।[টিকা-আহমাদ, মিশকাত] দুই ঈদের দিন লাল চাদর পরা সুন্নাত।[টিকা-ইবনে খুজায়মা] ঈদগাহে ইমাম নিজের সামনে সুতরা খাড়া রাখবে এবং সে দিকে নামায পড়বে। দুই ঈদের নামাযই খুতবার পূর্বে পড়বে [টিকা-বুখারী] এবং ঈদের নামাযের পর ইমাম লাটির উপর ঠেস দিয়ে খুতবা দিবে।[টিকা-আবু দাউদ] ঈদের নামাযের পূর্বে বা পরে (কোন) নফল নামায পড়বে না [টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] এবং ঈদের নামায আযান এবং তাকবীর ছাড়াই পড়তে হবে।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] দুই ঈদের নামাযেই প্রথম রাকাতে কেরাতের পূর্বে সাত তাকবীর (তাকবীরে তাহরিমা ছাড়া) দিতে হবে এবং দ্বিতীয় রাকাতে কেরাতের পূর্বে পাঁচ তাকবীর (উঠার জন্য যে তাকবীর দেয়া হয় তা ছাড়া) দিতে হবে।[টিকা-আবু দাউদ- আমর ইবনে শোয়াইব (রা.)] ইমাম ঈদগাহে মহিলাদেরকে নসিহত শোনাবেন এবং তাদেরকে ফকীর-মিসকিনকে দান-সাদকা করার করার জন্য উৎসাহিত করবেন।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)]
ইস্তিসকা নামাযের বিবরণ
যখন দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যাবে এবং বৃষ্টি নামবে না, তখন কোন একদিন নির্দিষ্ট করবে এবং সেদিন ময়লা কাপড় পরে বিনয়ভাবে এবং কাকুতি মিনতি করতে করতে মাঠে যাবে।[টিকা-আবু দাউদ] যখন সূর্য কেবল দেখা দিবে তখন ইমাম মিম্বরের উপর চড়বে, তাকবীর বলবে এবং আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করবে। অতপর বলবে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ – الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ – مَالِكِ يَوْمِ الدين – لا اله الا اللهُ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ – اللَّهُمَّ أَنْتَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إلا أنتَ الْغَنِيُّ وَنَحْنُ الْفُقَرَاء أَنْزِلْ عَلَيْنَا الْغَيْثَ وَاجْعَلْ ما أَنْزَلْتَ لَنَا قُوَّةً وَبَلَاعًا إِلَى حِينٍ .
অর্থাৎ- সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ জন্য, যিনি সারা জাহানের প্রতিপালক। যিনি অতীব দয়ালু ও দাতা। বিচার দিনের মালিক। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। হে আমার প্রভু! আপনিই আল্লাহ। আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। আপনি ধনী এবং আমরা দরিদ্র। আপনি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। আপনি যা নাজিল করবেন তাতে আমাদের জন্য শক্তি দিন এবং এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (তাতে) আমাদেরকে ফায়দা দিন।
অতপর দুই হাত এতদূর পর্যন্ত উঠাবে যাতে বগল দেখা যায় অর্থাৎ হাত লম্বা করবে কিন্তু হাত মাথার চেয়ে উঁচু করবে না, মুখের সামনে রাখবে, হাত সম্প্রসারণ করবে এবং এর পিঠের দিক উপরে করবে এবং তালুর দিক মাটির দিকে করবে। অতপর লোকদের দিকে পিঠ করে কেবলার দিকে মুখ করবে এবং চাদর উল্টিয়ে নিবে। এভাবে চাদর উল্টাবে- ডান হাত দিয়ে চাদরের বাম দিকের নীচের কোনা ধরবে এবং বাম হাত দিয়ে চাদরের ডান দিকের নীচের কোনা ধরবে এবং দুই হাতকেই পিছন দিয়ে ঘুরাবে এভাবেই যে কোনা ডান হাত দিয়ে ধরেছিল তা ডান কাধে চলে আসবে এবং যে কোনা বাম হাত দিয়ে ধরেছিল তা বাম কাধে চলে আসবে। যে ব্যক্তির এভাবে চাদর উল্টানো কঠিন মনে হবে সে ঘাড়ের উপরে তা উল্টিয়ে নিবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ] অতপর এই দোয়া পড়বে:
প্রথম দোয়া:
اللَّهُمَّ اسْقِنَا ، اللَّهُمَّ اسْقِنَا ، اللَّهُمَّ اسْقِنَا .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে পানি পান করান। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরক পানি পান করান। হে আল্লাহ! আমাদেরকে পানি পান করান।[টিকা-দাউদ]
দ্বিতীয় দোয়া:
اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْئًا مُّغِيثًا مَّرِيئًا مَّرِيعًا نَافِعًا غَيْرَ ضَارٌ عاجلاً غير أجل .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমাদের পানি পান করান, এমন পানি যা উত্তম। পানির উপকারিতাও খুব ভাল হয়। এমন পানি যা উপকারী, তা যেন ক্ষতিকারক না হয় এবং পানি যেন তাড়াতাড়ী দেয়া হয় বিলম্বে না দেয়া হয়।[টিকা-মিসকুল খিতাম]
তৃতীয় দোয়া:
اللَّهُمَّ اسْقِ عِبَادَكَ وَبَهَائِمَكَ وَانْشُرْ رَحْمَتَكَ وَأَحْي بلدك الميت .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আপনি পানি পান করান আপনার বান্দাদের এবং জীবজন্তুদের। এবং আপনি আপনার রহমতকে ছড়িয়ে দিন এবং আপনার মৃত শহরকে জীবিত করুন।[টিকা-আবু দাউদ-মুহাম্মদ বিন সালমা (রা.)]
চতুর্থ দোয়া:
اللَّهُمَّ جَلَّلْنَا سَحَابًا كَثِيفًا كَسِيفًا نَضِيفًا ذُلُوقًا صُحُوكًا تُمْطِرُنَا مِنْهُ رِدَاذًا قَطَقَطًا سجلاً يَا ذَا الْجَلَالِ وَالإِكْرَامِ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমাদেরকে গাঢ় মেঘমালা দিয়ে ঢেকে দিন, এমন মেঘমালা যা বৃষ্টিতে ভরপুর এবং যা বিজলী চমকায়। আমাদের উপর বৃষ্টি মুষলধারে নাজিল করুন যা বড় ফোটা, ছোট ফোটা সম্বলিত, হে সম্মানিত মহান প্রভু।[টিকা-আবু দাউদ- আমর বিন শুয়াইব (রা.)]
ইমাম যখন এসব দোয়াপড়া শেষ করবেন তখনও দুই হাত উঠিয়ে রাখবেন এবং লোকদের দিকে মুখ করবেন এবং মিম্বর হতে নেমে লোকদের দুই রাকাত নামায পড়াবেন এবং এতে কেরাত জোরে করে পড়বেন।[টিকা-বুলুগুল মারাম]
সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের নামাযের বিবরণ
যখন সূর্য বা চন্দ্রে গ্রহণ লাগবে, তখন কোন ব্যক্তিকে লোকজনকে ডাকার জন্য পাঠাতে হবে, যেন সকলে মসজিদে আসে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম, আয়েশা (রা.)] অতপর জামাতের সাথে দুই রাকাত নামায পড়বে এবং ইমাম কেরাত উচ্চ কন্ঠে পড়বে। প্রথম রাকাতে সূরা আনকাবুত এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা রুম পড়বে। প্রত্যেক রাকাতে দুই রুকু কিংবা তিন রুকু বা চার রুকু কিংবা পাঁচ রুকু করবে এবং দুই রুকুর মাঝে কেরাত পড়বে প্রত্যেক রাকাতে এক রুকু দেয়ার কথাও বর্ণিত হয়েছে। নামায শেষ করার পর লোকজনকে খুতবা শুনাবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ না ছুটবে ততক্ষণ পর্যন্ত নামায এবং খুতবায় মশগুল থাকবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
রোগীর দেখাশুনা-সেবা শুশ্রূষা করা
এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের ছয়টি হক (অধিকার) রয়েছে। (১) যখন দেখা হবে তখন السلام عليكم বলে সালাম দিবে, (২) যখন দাওয়াতে দিবে তখন তা গ্রহণ করবে এবং (৩) যদি উপদেশ চায় তাহলে সৎ উপদেশ দিবে। (৪) হাঁচি দিয়ে الحمد لله বলবে তার জবাব দিবে يرحمك الله বলে। (৫) যখন অসুস্থ হবে তখন তার অবস্থার খোঁজ-খবর নিবে (দেখা-শুনা করবে) এবং (৬) মারা গেলে জানাযা নামায ও দাফন করার জন্য সঙ্গে যাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- মুগীরা (রা.)] অমুসলিম এর খোজ খবর নেয়া (অসুস্থ হলে) জায়েয।[টিকা-মুসলিম] যখন কোন মুসলমান কোন মুসলমানের অসুস্থতার খোঁজ খবর নেয় তখন সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য রহমত এবং মাগফেরাতের দোয়া করে।[টিকা-বায়হাকী, মিশকাত- আবু রুজাইন (রা.)]
প্রথম দোয়া:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ اشْفَ أَنْتَ الشَّافِي لاشفاء الا شِفَاؤُكَ شَفَاء لا يُغَادِرُ سَقَمًا
অর্থাৎ- অসুখ দূর করুন হে মানুষের রব! সুস্থতা দিন, আপনিই প্রকৃত শেফাদানকারী। আপনার দেয়া সুস্থতা ছাড়া কোন সুস্থতা নাই (হতে পারে না।) এমন সুস্থতা দান করুন, যাতে কোন অসুখ থাকতে না পারে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম, আয়েশা (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
لا بَأْسَ طُهُورٌ إِنْ شَاءَ اللَّهُ –
অর্থাৎ- কোন ভয় নেই (অর্থাৎ এ অসুখের জন্য কোন চিন্তা করবে না।) কেননা আল্লাহ তা’আলাই ভাল করবেন (সুস্থতা দিবেন)।[টিকা-বুখারী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
তৃতীয় দোয়া:
أَسْأَلُ اللهَ الْعَظِيمَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيكَ .
অর্থাৎ- আমি প্রার্থনা করছি মহান আল্লাহর নিকট, যিনি বিরাট আরশের রব, তিনি যেন আপনাকে সুস্থতা দান করুন।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
চতুর্থ দোয়া:
যখন কোন ব্যক্তি নিজেই অসুস্থ হয়, তাহলে মুয়াওঅজাতাইন قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ পড়ে নিজের উপর ফুঁ দিবে। এবং যদি বাড়ীর অন্য কেউ অসুস্থ হয় তার উপর উক্ত সূরাদ্বয় পড়ে ফুঁ দিবে এবং এই সূরার সাথে যদি قُلْ هُوَ اللهُ সূরা মিলিয়ে নেয় তবে তা উত্তম।[টিকা-মিশকাত- আয়েশা (রা.)]
পঞ্চম দোয়া:
যে ব্যক্তি নিজেই অসুস্থ হবে, সে প্রথমে তিনবার বিসমিল্লাহ পড়বে। অতপর এ দোয়া পড়বে:
أَعُوذُ بِعِزَّةِ اللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّمًا أَجِدُ وَأَحَاذِرُ
অর্থ: আমি আশ্রয় চাচ্ছি আল্লাহর ইজ্জত এবং কুদরতের সাথে ঐ অমঙ্গলতা হতে যা আমি অনুভব করছি এবং যাকে ভয় করছি (অর্থাৎ আরো বৃদ্ধি হবার ব্যাপারে)।[টিকা-মুসলিম, মুয়াত্তা মালেক]
যষ্ঠ দোয়া:
بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِن كُلِّ دَاءِ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ .
অর্থাৎ- আল্লাহর নামে তোমাকে ঝাড়ফুঁক করছি সমস্ত রোগ হতে, যা তোমাকে কষ্ট- যন্ত্রণা দেয়। প্রত্যেক বদ লোকের অকল্যাণ এবং হিংসুক চোখের অকল্যাণ হতে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে তোমাকে মন্ত্র পড়ছি, ঝাড় ফুঁক করছি।[টিকা-মুসলিম, তিরমিযী- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)]
কোন মুসলমান যদি অসুস্থ হয় তাহলে তার অসুখের কষ্টের দরুন তার গুনাহ এভাবে ঝরে পড়ে, যেমন বাতাসে গাছের (মরা) পাতা ঝরে পড়ে। এমনকি কোন মুসলমান কাঁটা বিদ্ধ হলে আল্লাহ তায়ালা তার এ কষ্টের দরুদ তার গুনাহ মাফ করেন।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)]
মৃত্যুর দুয়ারে উপনিত ব্যক্তিকে তালকীন দেয়া এবং তার নিকট সূরা ইয়াসীন পড়ার বিবরণ
যদি কারো প্রাণ বের হয়ে যাবার সময় হয়ে যায়, তাহলে তাকে শাহাদাতাইনের (দুই কালেমার) তালকীন দিবে।[টিকা-মুসলিম, সুনানে আরবা] অর্থাৎ-
أشهد أن لا اله الا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ .
তার নিকট পাঠ করবে, যেন সে তা শুনে নিজে পাঠ করতে পারে।
মরনাপন্ন ব্যক্তির নিকট এ দোয়া পাঠ করার কথাও বর্ণিত হয়েছে:
لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ الْحَكِيمُ الْكَرِيمُ سُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ –
অর্থাৎ- আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, যিনি বিজ্ঞানময় এবং সম্মানীত। পবিত্রতা আল্লাহর জন্য। যিনি মহান আরশের রব।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা.)] সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সারা জাহানের রব।’ যে ব্যক্তি মুমূর্ষ অবস্থায় পৌঁছে তার নিকট সূরা ইয়াসিন পড়া উচিত।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ- মা’কাল বিন ইয়াসার (রা.)]
মৃতের উপর চুমা দেয়া ও অশ্রুফেলে কাঁদা
যে ব্যক্তির কেউ মারা যাবে, সে উক্ত মৃত ব্যক্তিকে চুমা দিলে তা জায়েয।[টিকা-বুখারী- আয়েশা (রা.)] যদি মৃত ব্যক্তিকে দেখে এমনিই কান্না এসে যায় এবং অশ্রু বের হয় তাহলে নিষেধ নাই।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আব্বাস (রা.)]
মৃতের জন্য মাতম করা হারাম
কেউ মারা যাবার কারণে কোন পুরুষ বা মহিলা যদি গাল চাপড়ায় কিংবা কাপড় ফেড়ে ফেলে বা কাফিরদের মত মৃতের জন্য উচ্চ কণ্ঠে চিৎকার করে তাহলে সে (প্রকৃতপক্ষে) মুসলমান নয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, আমি ঐ ব্যক্তির উপর অসন্তুষ্ট যে কারো মারা যাবার কারণে মাথার চুল ন্যাড়া করে এবং চিৎকার করে কাঁদে, কাপড় ছিড়ে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু দারদা (রা:)]
যে মহিলা মৃত ব্যক্তির জন্য চিৎকার করে কাঁদে, সে যদি তার একাজ হতে তওবা না করে মারা যায়, তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে এমন অবস্থায় উঠানো হবে যে তার গায়ে (পরম) তামা এবং খোস পাঁচড়া জীবানুযুক্ত জমা থাকবে।[টিকা-মুসলিম] যে মহিলা মৃতের জন্য চিৎকার করে কাঁদে বা যে তা গুনে তার উপর রাসূলুল্লাহ (সা.) লা’নত করেছেন।[টিকা-আবু দাউদ] যে জানাযার সাথে বিলাপকারী মহিলা থাকবে, সে জানাযার সাথে যাওয়া নিষেধ।[টিকা-ইবনে মাজাহ] দুনিয়াতে যার জন্য চিৎকার করে বিলাপ করা হয়, কিয়ামতের দিন তার উপর বিলাপ করতে নিষেধ না করার কারণে শাস্তি দেয়া হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] যদি কোন ব্যক্তি মারা যায় অতপর কেউ তার গুণগান করে কেঁদে বলে হে পাহাড়, হে সরদার দলপতি বা এ ধরনের কথাবার্তা বলে তার গুণকীর্তন করে, তা হলে সে ব্যক্তিকে দু’জন ফেরেশতা ঘুষি মারে এবং বলে তুমি কি এ ধরনের ছিলে?[টিকা-তিরমিযী- আবু মুসা আল-আশয়ারী (রা.)]
দুনিয়ায় কারো সন্তান মারা যাবার ফলে সে প্রতিদান হিসেবে জান্নাত পাবে তার বিবরণ
যার তিনটি সন্তান মারা যাবে এবং তার মা এদের মৃত্যুতে সবর করবে (অর্থাৎ কাঁদবে তবে আর্তনাদ-চিৎকার করে নয়) এবং এদের মৃত্যুকে পরকালের পাথেয় সম্বল মনে করবে তাহলে আল্লাহ তা’য়ালা আপন অনুগ্রহে এবং রহমতে তাদের পিতামাতাকে এর প্রতিদানে জান্নাত দিবেন। যার দুই সন্তান অথবা একটি মাত্র সন্তানও মারা যাবে, তাকেও আল্লাহ তা’আলা জান্নাত দান করবেন। এমনকি যে বাচ্চা গর্ভপাত হবে (যদি তাতে প্রাণের স্পন্দন আসে) সেও তার পিতা-মাতাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে।[টিকা-আহমাদ, ইবনে মাজাহ] যে বাচ্চা গর্ভপাত হবে (যদি তাতে প্রাণের স্পন্দন এসে থাকে) তার পিতামাতাকে গুনাহের কারণে আল্লাহ তা’আলা দোজখের হুকুম করবেন তাহলে সে বাচ্চা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবে। অতপর আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে সে তাদেরকে বেহেশতে নিয়ে যাবে।[টিকা-ইবনে মাজাহ] মুসলমানদের যে সন্তানেরা ছোট বয়সে মারা যাবে তারা বেহেশতে এমনভাবে চরাফেরা করবে যেমন সমুদ্রে (সামুদ্রিক) প্রাণী চলাচলা করে। সে সব সন্তানেরা প্রত্যেকে কিয়ামতের দিন নিজের পিতামাতার সাথে এসে মিলবে এবং তার কাপড়ের এক কোনা ধরে রাখবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের সাথে তার পিতামাতাকে বেহেশতে না নিয়ে যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার নিকট হতে পৃথক হবে না।[টিকা-মুসলিম, আহমাদ- আবু হুরায়রা (রা.)]
মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেয়ার বিবরণ
মৃতকে গোসল দেয়া জীবিতদের উপর ওয়াজিব।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] যখন মৃতকে গোসল দেয়ার ইচ্ছা করবে তখন প্রথমে একটি তক্তা ধুয়ে নিবে। অতপর মৃতকে তার উপর শুইয়ে দিবে এবং তার কাপড় খুলে নিবে তবে একখানা কাপড় দিয়ে তার সতর ঢেকে দিবে। সে কাপড়খানা কমপক্ষে দেড় হাত লম্বা এবং দুই হাত প্রস্ত হবে এবং মৃতকে অজু করাবে (কানে ও নাকে পানি দেয়া ব্যতীত) এবং কুল বা বরই পাতা দিয়ে ফুটানো পানি দ্বারা গোসল করাবে। মাথা এবং দাড়ি খাতমী দ্বারা (এক প্রকার সাবান জাতীয় ঘাস) ধোয়াবে (যদি খাতমী না পাওয়া যায় তাহলে সাবান দ্বারা ধোয়াবে)।[টিকা-আবু দাউদ] প্রথমে বাম পাশে শুয়াবে এবং পানি ঢালবে যেন তক্তার দিকের পাশ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। অতপর ডানপাশে গুয়ায়ে গোসল করাবে এমনভাবে যাতে বাম পাশ পর্যন্ত পানি পৌঁছে। মৃতের উপর পানি ঢালবে তিন বা পাঁচবার কিংবা এর চেয়েও বেশি এবং শেষে শরীরের উপর কর্পূর লাগাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উম্মে আতিয়া (রা.)] যদি মহিলা মারা যায় হাতলে তার স্বামী তাকে গোসল দিবে [টিকা-আহমাদ, ইবনে মাজাহ] এবং যদি পুরুষ মারা যায় তাহলে তার স্ত্রী তাকে গোসল দিবে।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক] শহীদকে গোসল দেয়া উচিত নয়।[টিকা-বুখারী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
মৃতকে কাফন দেয়ার বিবরণ
মৃত যদি পুরুষ হয় তাহলে তাকে একখানা ইজার (লুঙ্গী) একখানা চাদর এবং একখানা লেফাফা (বড় চাদর) এই তিন কাপড়ে কাফন দেয়ার বিধান রয়েছে। এর চেয়ে কম বা বেশি দেয়া উচিৎ নয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] যদি তা সম্ভব না হয় এবং নিরুপায় হলে একখানা কাপড়ই যথেষ্ট।[টিকা-বুখারী] মহিলাকে এক লুঙ্গি, জামা, ওড়না, একটি কাপড় দিয়ে উরু এবং নিম্নদেশ বাধতে হবে যা চাদরের নীচে দিয়ে থাকবে এবং চুল বাঁধার জন্য একটি কাপড়, এই পাঁচ কাপড় দিয়ে দাফন দেয়া উচিৎ।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ] মৃতকে সাদা, পাক-পবিত্র ও পরিষ্কার কাপড়ে কাফন দিতে হবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ] কিন্তু খুব মূল্যবান কাপড়ের কাফন দিবে না।[টিকা-আবু দাউদ- আয়েশা (রা.)] যদি মুহরেম (হজ্জ বা উমরা করতে গিয়ে এহরাম অবস্থায় থাকা) মারা যায় তাহলে তাকে সে যে দুই কাপড় পরেছিল সেটাকেই কাফন হিসেবে দিবে। তাকে কোন খুশবু লাগাবে না এবং তার মাথা ঢাকবে না। কেননা কিয়ামতের দিন তাকে লাম্বাইকা বলা এবং এহরাম অবস্থায় উঠানো হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)]
জানাযা নিয়ে যাবার বিবরণ
জানাযা তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবে। কেননা সে যদি নেককার হয় তাহলে তাড়াতাড়ি তার মনজিলে মাকসুদে পৌছে যাবে। আর যদি বদকার হয় তাহলে তাড়াতাড়ি তাকে ঘাড় থেকে নামায়ে তার হতে অব্যাহতি পাওয়া যাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] ভাল লোকের যানাজা উঠানো হলে তাদের বলে, তোমরা আমাকে তাড়াতাড়ি আমার গন্তব্যের দিকে নিয়ে চলো এবং মন্দলোকের জানাযা উঠানো হলে বলে, হায় মসিবত! আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? এদের কথা মানুষ ও জ্বীন ব্যতীত সব কিছুই শুনে থাকে। যদি মানুষ তার আওয়াজ শুনতো তাহলে মারা যেতো।[টিকা-বুখারী] মৃতকে দাফন করে ফিরে আসার সময় যান-বাহনে চড়ে আসা জায়েয।[টিকা-মুসলিম] কিন্তু জানাযা নিয়ে যাবার সময় কোন কিছুতে সোয়ার হয়ে যাওয়া উচিত নয়। কেননা তার সাথে ফেরেশতাও যায় এবং তারা পায়ে হেঁটে যায়। মানুষ যদি সোয়ার হয়ে আর ফেরেশতা হেঁটে যায় তাহলে সেটা বেআদবী হয়।[টিকা-আবু দাউদ- সাওবান (রা.)] কিন্তু অসুবিধার কারণে কারো প্রয়োজন হয় তাহলে কোন কিছুতে সোয়ার হয়ে যেতে পারবে। সে জানাযার পিছনে তার বাহন নিয়ে চলবে। যে ব্যক্তি পায়ে হেঁটে যাবে সে যানাজার আগে বা পরে কিংবা ডানে অথবা বামে তার ইচ্ছামত চলতে পারবে।[টিকা-আবু দাউদ- মুগীরা ইবনে শো’বা (রা.)] যে ব্যক্তি জানাযার সাথে যাবে এবং তিনবার জানাযা কাঁধে নিবে, সে জানাযার হক আদায় করলো।[টিকা-তিরমিযী- ইবনে উমর (রা.)] মহিলাদের জানাযার পিছনে পিছনে যাওয়া ঠিক নয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] জানাযার সাথে আগুন নিয়ে যাওয়া নিষেধ।[টিকা-বুখারী]
জানাযার নামায পড়ার বিবরণ
জানাযার নামায পড়ার জন্য খাটলী এমনভাবে রাখবে যেন মৃতের মাথা উত্তর দিকে এবং পা দক্ষিণ দিকে হয়।[টিকা-প্রাগুক্ত] অতপর অযু করে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়াবে এবং তিন সফ (কাতার) বাঁধবে।[টিকা-আবু দাউদ] মৃত যদি পুরুষ হয় তাহলে ইমাম তার সামনে দাঁড়াবে। আর যদি মহিলা হয় তাহলে ইমাম তার মাঝামাঝি দাঁড়াবে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ] অতপর মনে মনে নিয়্যত করবে [টিকা-বুখারী] এবং দুই হাত মাথা পর্যন্ত কিংবা কান পর্যন্ত উঠাবে [টিকা-বায়হাকী] এবং প্রথম তাকবীর অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলবে। প্রথম তাকবীরের পর যে দোয়ায়ে ইসতেফতা অর্থাৎ সুবহানাকা আল্লাহুম্মা سَبْحَانَكَ اللَّهُم পড়া হয় তা সহীহ হাদীস হতে সাব্যস্ত নাই।[টিকা-শরহে হিদায়া] প্রথম তাকবীরের পর ইমাম সূরা ফাতিহা এবং অন্য কোন সূরা উচ্চ কণ্ঠে পড়বে। তবে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা মনে মনে পড়াও জায়েয।[টিকা-নাসাঈ] অতপর দুই হাত উঠাবে এবং দ্বিতীয় তাকবীর বলবে।[টিকা-বায়হাকী] অতপর এই দরুদ পড়বে:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى
إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ – اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وعلى آل إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
অর্থাৎ হে আল্লাহ! রহমত নাজিল করুন মুহাম্মদ (সা.) এর উপর এবং মুহাম্মদের বংশধরের উপর, যেমন আপনি রহমত নাজিল করেছেন ইব্রাহীমের (আ.) প্রতি এবং ইব্রাহীমের বংশধরের উপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত এবং সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি বরকত নাজিল করুন মুহাম্মদের উপর এবং মুহাম্মদের বংশধরের প্রতি, যেমন আপনি রহমত নাজিল করেছেন ইব্রাহীমের উপর এবং ইব্রাহীমের বংশধরের উপর। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত এবং সম্মানিত।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
অতপর দুইহাত উঠাবে এবং তৃতীয় তকবীর বলবে [টিকা-বায়হাকী], তারপর এই দোয়া পাঠ করবে:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيْرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأَنْثَانَا – اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْبِهِ عَلَى الإِسْلَامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيْمَانِ – اللَّهُمَّ لا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَلَا تَفْتِنَا بَعْدَهُ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! ক্ষমা করুন আমাদের জীবিতদের, আমাদের মৃতদের, আমাদের উপস্থিতদের, আমাদের অনুপস্থিতদের, আমাদের ছোটদের, আমাদের বড়দের, আমাদের পুরুষদের এবং আমাদের মহিলাদের। হে প্রভু! আপনি আমাদের মাঝে যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের উপর জীবিত রাখুন এবং আমাদের মাঝে যাকে মৃত্যুদান করবেন তাকে ঈমানের উপর মরণ দিবেন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে মাহরুম করবেন না এর সওয়াব হতে (অর্থাৎ এর কারণে যে মসিবত আমরা পেয়েছি এর ফলে যে সওয়াব পাওয়া যাবে তা থেকে আমাদের বঞ্চিত করবেন না।) এবং তার পরে আমাদেকে ফিতনায় ফেলবেন না।[টিকা-মুসলিম, সুনানে আরবা]
জ্ঞাতব্য: মৃত পুরুষ হোক বা মহিলা, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে সবার, জানাযার জন্যই এ দোয়া যথেষ্ট।
অতপর দুইহাত উত্তোলন করবে এবং চতুর্থ তাকবীর বলবে।[টিকা-বায়হাকী] তাকবীর দিয়ে ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলবে:
السَّلامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ الله
অত:পর বাম দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলবে [টিকা-নাসাঈ]:
السَّلامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ الله
জ্ঞাতব্য: জানাযার নামায পাঁচ তাকবীরে পড়াও সুন্নত।[টিকা-মুসলিম] যে ব্যক্তি পাঁচ তাকবীরে পড়তে চায় সে চতুর্থ তাকবীর বলার পর মৃত যদি পুরুষ হয় তাহলে এ দোয়া পড়বে:
اللهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ ووسع مُدْخَلَهُ وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالبَرَدِ وَنَقَهْهُ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدُّنْسِ وَابْدِلْهُ دارا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ وَأَهْلاً خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ رُوجِهِ وَادْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَقَهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ النَّارِ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! একে ক্ষমা করে দিন এবং এর প্রতি রহম করুন এবং তাকে কষ্ট হতে মুক্তিদান করুন এবং তাকে (তার দুর্বলতার জন্য) মাফ করে দিন। তার উত্তম মেহমানদারী করুন (অর্থাৎ বেহেশতে) এবং তার করবকে প্রশস্ত করুন এবং তাকে পাক করুন (ধৌত করুন) পানি, বরফ, শিশিরের পানি দিয়ে এবং তাকে পরিচ্ছন্ন করুন গুনাহ হতে, যেমন সাদা কাপড় পরিচ্ছন্ন করা হয় ময়লা হতে। তার (এ দুনিয়ার) ঘর হতে উত্তম ঘর দান করুন। তার পরিবার হতে উত্তম পরিবার বদলিয়ে দিন (দান করুন) এবং তার স্ত্রী হতে উত্তম স্ত্রী দান করুন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং তাকে কবরের আযাব এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে বাঁচান।[টিকা-মুসলিম- আউফ বিন মালেক (রা.)]
জ্ঞাতব্য: এ হাদীসের বর্ণনাকারী আউফ (রা.) বলেন যে, যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে এ দোয়া শুনলাম, তখন আমার মনে খুব ঈর্ষা হচ্ছিল এবং আমি মনে মনে একথাই বললাম যে, যদি আমি এ মৃত ব্যক্তি হতাম (যার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) দোয়া করছিলেন) তাহলে রাসূল (সা.) আমার জানাযায় এ দোয়া পড়তেন তাহলে কতইনা ভাল হতো। এতে এটাই বুঝা যায় যে, জানাযার নামাযে জোরে দোয়া পড়া জায়েয।
মৃত যদি কোন ছোট ছেলে হয় তাহলে চতুর্থ তাকবীরের পর এ দোয়া পড়বে:
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرْطًا وَسَلَفًا وَأَجْرًا –
অর্থ- হে আল্লাহ! তাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী এবং অগ্রবর্তী (যাকে আমরা অনুসরণ করতে পারবো) এবং সওয়াবের কারণ করে দিন।
যদি মৃত মহিলা কিংবা মেয়ে হয় তাহলে তৃতীয় তাকবীরের পর যে اللَّهُمَّ اغفر لحينا দোয়া পড়েছিল সে দোয়াই চতুর্থ তাকবীরের পর পড়বে।
অত:পর পঞ্চম তাকবীর বলে ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে: اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ বলে সালাম ফিরবে।
জ্ঞাতব্য: আসসালামু আলাইকুম বাক্যটি ইমাম উচ্ছস্বরে বলবেন এবং মুক্তাদীরা নিম্নস্বরে বলবে।
মৃত ব্যক্তির (যদি সে মুশরিক না হয়ে থাকে) জানাযায় যদি এমন চল্লিশ জন লোক অংশগ্রহণ করেন যারা কোন ধরনের শিরক করেননি, তাহলে আল্লাহ তায়ালা এর ব্যাপারে তাদের শাফায়ত কবুল করেন।[টিকা-মুসলিম]
যে ব্যক্তিকে জিনার বিচারে সঙ্গেসার (পাথর ছুঁড়ে হত্যা) করা হবে তার নামাযে জানাযা পড়তে হবে।[টিকা-মুসলিম- বুরায়দা (রা.)] যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করবে তার নামাযে জানাযা (পেশ ইমাম) পড়বে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জাবের বিন সামুরা (রা.)][টিকা-আত্মহত্যাকারীর জানাযা পেশ ইমাম পড়াবেন না, যেন লোকজন এ ব্যাপারে সাবধান হয়। সাধারণ লোকজন তার জানাযা পড়বে। কেননা রাসূল (সা.) এ ধরনের লোকের জানাযা নিজে না পড়ে সাহাবীদের পড়তে বলেছেন। (নায়লুল আওতার)] যে মহিলা নেফাস (সন্তান প্রসরের পর রক্ষক্ষরণ এর সর্বোচ্চ সময় ৪০ দিন) এর অবস্থায় মারা যাবে তার নামাযে জানাযা পড়তে হবে।[টিকা-মুসলিম- আবু সালামা (রা.)]
মসজিদে যানাজার নামায পড়া জায়েয, সেথায় যদি মহিলারা পুরুষদের কাতারের পিছনে জানাযায় দাঁড়ায় এবং নামায পড়ে তাহলে তা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] যে ব্যক্তি সওয়াবের নিয়্যতে জানাযার সাথে যাবে এবং জানাযার নামায পড়ে চলে আসবে, সে ওহুদ পাহাড়ের সামন সওয়াব পাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] কারো জানাযার নামায তার কবরের উপর পড়াও জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত] জানাযার নামাযে যদি কোন ব্যক্তি ভুল করে চার তাকবীরের স্থলে তিন তাকবীর বলে সালাম ফিরে দেয় এবং তাকে এ ব্যাপারে বললে (বা তার খেয়াল হলে) সে ফিরে এক তাকবীর বলে নিবে অতপর সালাম ফিরবে।[টিকা-বুখারী] শহীদের নামাযে জানাযা পড়বে না।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি কারো জানাযার নামায পড়বে, সে যেন তার জন্য নিষ্ঠার সাথে দোয়া করে। কোন মুসলমান ব্যক্তিকে জানাযা নামায না পড়ে দাফন করা নিষেধ।[টিকা-ইবনে মাজাহ- যাবের (রা.)]
মৃতকে দাফন করার বিবরণ
কবরকে গভীর করে খুঁড়তে হবে এবং সমান করে ভালভাবে পরিষ্কার করে সাফ করতে হবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী] কবরের মাঝে লাহাদ বানাবে [টিকা-মুসলিম] এবং মাইয়্যেতকে দু’পায়ের দিক হতে কবরে নামাবে।[টিকা-আবু দাউদ]
মৃতকে কবরে নামালে এ দোয়া পাঠ করবে:
بِسْمِ اللَّهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ –
অর্থাৎ- আল্লাহ তায়ালার নামে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শরিয়তের উপর (লাশ দাফন করছি)।[টিকা-আহমাদ, আবু ও উদ, নাসাঈ ইবনে উমর (রা.)]
মাইয়্যেতকে কবরে রেখে তার উপর কাঁচা ইট দিয়ে (বা বাঁশ বা অন্য কিছ দিয়ে) ঢেকে দিবে। অতপর আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে মাটি দিয়ে কবর পূর্ণ করবে [টিকা-মুসলিম] এবং লোকরো তিন খাবল (মুক্তি) করে মাটি দিবে [টিকা-দারকুতনী] এবং কবরকে মাটি হতে আধহাত মত উঁচু করবে [টিকা-বায়হাকী] এবং কবরকে উটের পিঠের কুঁজের মত বানাবে [টিকা-বুখারী] এবং কবরের উপর (সম্পূর্ণ হবার পর) পানির ছিটা দিবে।[টিকা-ইবনে মাজাহ অতপর সবাই মাইয়্যেতের মাগফেরাত ও সাবেত কদম থাকার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করবে।[টিকা-আবু দাউদ]
যখন মুমিন লোকের জান কবজ করা হয় তখন খুব সুন্দর উজ্জল চেহারার ফেরেশতা যার মুখ সূর্যর মত উজ্জল- বেহেশতের খশবু নিয়ে আসমান হতে নেমে আসে এবং তার সামনে এস সম্মানের সাথে বসে পড়ে এবং তার রূহ বের হবার অপেক্ষায় থাকে। অতপর মালাকুল মওত (জান কবজকারী ফেরেশতা) আসেন এবং তার মাথার দিকে বসেন। অতপর বলেন, হে পবিত্র আত্মা! তোমার প্রভূর পুরস্কার এবং সন্তুষ্টির জন্য বের হও। অতপর পানির মশক হতে যেমন পানি ফোটা (পানি) সহজেই গড়িয়ে পড়ে সেভাবেই তার জীবন বের হয়ে আসবে। অতপর সে রূহকে মালাকুল মাওত নিয়ে নেন। অতপর অপেক্ষমান ফেরেশতা খুব মহব্বতের সাথে মুহুর্তের মাঝে মালাকুল মাওতের নিকট হতে নিয়ে নেয় এবং তাকে বেহেশতের কাফন এবং সুগন্ধীর মাঝে রেখে দেয়। সে আত্মা হতে খুব উত্তম সুগন্ধী বের হতে থাকে এবং গোটা দুনিয়ায় তা ছড়িয়ে পড়ে। অতপর সে রূহকে ফেরেশতা আসমানের দিকে নিয়ে যায় এবং আসমান ও যমিনের মাঝে যেসব ফেরেশতার দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যায় তারা বলে এই পবিত্র আত্মা কার? নিয়ে যাওয়া ফেরেশতারা তার খুব প্রশংসা এবং গুণাবলী বর্ণনা করে এবং যে সব উত্তম নামে সে দুনিয়াতে প্রসিদ্ধ ছিল সে সব নাম নিয়ে বলবে, এ হচ্ছে উমুকের সন্তান (অর্থাৎ উমুকের আত্মা) এভাবে প্রশ্নোত্তর করতে করতে প্রথম আসমান পর্যন্ত তাকে নিয়ে পৌঁছবে এবং আসমানের দরজা খোলা হবে। প্রথম আসমানের আল্লাহর নিকটতম ফেরশতারা তার সাথে দ্বিতীয় আসমান পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে পৌঁছাবে। এভাবে সাত আসমান পর্যন্ত তাকে নিয়ে পৌঁছবে। অতপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার এ বান্দার-আমলনামা ইল্লিনে (সর্বোচ্চ স্থানে) লিখে দাও এবং যমিনে যেখানে তাকে দাফন করা হয়েছে সেখানে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। আর তার শরীরে ফিরিয়ে দাও। অত:পর যখন মানুষ তাকে কবরে মাটি দিয়ে দাফন শেষ করে, তখন ফেরেশতা তার শরীরে আত্মা ফিরিয়ে দেয়। অতপর দুই ফেরেশতা (মুনকীর ও নাকীর) তাকে কবরের মাঝে উঠিয়ে বসায় এবং বলে, তোমার রব কে? সে বলবে আমার রব আল্লাহ্। অতপর প্রশ্ন করবে তোমার দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) কি? সে উত্তরে বলবে, আমার দ্বীন ইসলাম। অত:পর তাকে প্রশ্ন করবে, এই যে ব্যক্তিটি প্রেরিত হয়েছিল তোমাদের মাঝে (অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা.) তিনি কে’? সে উত্তর করবে, তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল। তখন তাকে আবার প্রশ্ন করবে, তুমি কিভাবে জানলে যে, সে আল্লাহর রাসূল? সে বলবে আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, তার উপর ঈমান এনেছি এবং তাকে সত্য বলে মেনেছি, এর মাধ্যমে তার রাসূল হওয়া সম্পর্কে জেনেছি। অতপর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমানের দিক হতে আওয়াজ আসবে আমার এ বান্দা সত্যবাদী। তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং তাকে জান্নাতের পোষক পরিয়ে দাও এবং তার কবরের মাঝে বেহেশতের দিকের একটি জানালা খুলে দাও। অতপর তার নিকট বেহেশতের বাতাস এবং সুগন্ধী আসতে থাকবে এবং যতদূর পর্যন্ত তার দৃষ্টি যায় ততদূর পর্যন্ত তার কবর প্রশস্ত হয়ে যাবে।
যখন কাফেরের জীবন বের হতে লাগে তখন কালো রং এর ফেরেশতা নোংরা কাপড় সাথে নিয়ে আসমান হতে নেমে আসে এবং তার সামনে এসে বসে পড়ে। অতপর মালাকুল মওত আসেন এবং তার সামনে বসেন এবং বলেন হে খবিশ আত্মা। আল্লাহ তায়ালার আযাবের দিকে বের হয়ে এসো। এরপর তার আত্মা শরীরের মাঝে লুকিয়ে বেড়ায় এবং আযাবের আলামত দেখে অসন্তুষ্ট হয়। অতপর মালাকুল মওত তার রূহকে অত্যন্ত কঠিন ভাবে পাকড়াও করে বের করে নিয়ে আসেন। অতপর অপেক্ষারত ফেরেশতারা চোখের পলকে তা মালাকুল মাওতের হাত হতে নিয়ে নেয় এবং সেই নোংরা কাপড়ের জড়িয়ে রেখে দেয়। এরপর তা থেকে মরা লাশের মত দুর্গন্ধ আসতে থাকে এবং গোটা পৃথিবীতে তার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অতপর ফেরেস্তারা তার আত্মাকে আসমানের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। জমিন ও আসমানের মাঝে যে সব ফেরেশতার দলের নিকট দিয়ে যায় তারা বলে, এ অপবিত্র আত্মা কার? ফেরেশতারা জবাবে দুনিয়াতে সে যে সব খারাপ নামে কুখ্যাত ছিল তা উল্লেখ করে বলে, ঐ উমুকের সন্তান উমুক (অর্থাৎ উমুকের আত্মা) এভাবে প্রথম আসমান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছবে এবং আসমানের দরজা খোলার জন্য বলবে। কিন্তু কেউ দরজা খুলবে না। অতপর আল্লাহ তায়ালা বলবেন, এর আমলনামা সিজ্জীনে লিখো (সিজ্জীন সাত জমিনের নীচে একটি স্থানের নাম) অতপর ফেরেশতারা তার রূহকে আসমান হতে জমিনের দিকে ছুড়ে মারবে। অতপর যখন মানুষ তার কবরে মাটি দিয়ে শেষ করে তখন তার শরীরে রূহ দেয়া হয় এবং তার নিকট দুইজন ফেরেশতা (মুনকির ও নাকীর) আসে এবং তাকে কবরের মাঝে উঠিয়ে বসায়। অতপর তাকে বলে, তোমার রব কে? সে বলবে, হায় হায়? আমি জানি না। অত:পর তাকে প্রশ্ন করবে তোমাদের মাঝে যে ব্যক্তিকে প্রেরণ করা হয়েছিল সে কে? সে বলবে হায় হায় আমি জানি না। অতপর আসমানের দিক হতে আওয়াজ আসবে যে, ঐ ব্যক্তি মিথ্যাবাদী, এর জন্য আগুনের বিছানা বিছিয়ে দাও এবং দোখজের দিক হতে এর কবরের মাঝে একটি জানালা খুলে দাও। অত:পর দোজখের তাপ সে পেতে থাকবে এবং তার নিকট গরম বাতাস আসতে থাকবে এবং তার কবর এত সংকীর্ণ হয়ে যাবে যে, তার এক দিকের বুকের হাড় অন্য দিকের হাড়ের মাধ্যে ঢুকে (চূর্ণ হয়ে) যাবে।[টিকা-আহমাদ, মিশকাত]
যে ব্যক্তি মারা যাবে তার পরিবার পরিজনের জন্য তার আত্মীয় বা প্রতিবেশীরা খাবার তৈরী করে (সে দিন) তার বাড়ীতে পাঠাবে।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা.)] কবরের মাথার দিক চিহ্নিত করার জন্য পাথর রাখা জায়েয [টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত] এবং কবরের উপর কঙ্কর দেয়া জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ- কাসেম ইবনে মুহাম্মদ (রা.)] কবরে চুনকাম করা এবং তার উপর ইমারত (পাকা বিল্ডিং বা বালাখানা) তৈরী করা এবং কবরের উপর বসা নিষেধ।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] কবরের উপর বসার শান্তি কিয়ামতের দিন এমন হবে যে, কাউকে যদি আগুনের উপর বসিয়ে দেয়া হয় এবং আগুন তার কাপড় জ্বালিয়ে চামড়া পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে তবুও তা কবরের উপর বসার চেয়ে উত্তম কিন্তু কবরের উপর বসা তার জন্য কঠিন।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] কবরের উপর কিছু লিখা এবং কবর পা দিয়ে মাড়ান নিষেধ।[টিকা-তিরমিযী- জাবের (রা)] কবরের সাথে ঠেস দিয়ে বসবে না এজন্য যে, তাতে কবরে শায়িত ব্যক্তি কষ্ট পায়।[টিকা-আহমাদ, মিশকাত] কবরের দিকে নামায পড়া জায়েয নয়।[টিকা-মুসলিম] যে শহরে বা গ্রামে কোন ব্যক্তি মারা যাবে তাকে সেখানেই দাফন করা উচিৎ।[টিকা-তিরমিযী] জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গলে যে পরিমাণ গুনাহ, মৃত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গলেও সেরূপ গুনাহ।[টিকা-মুয়াত্তা, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ] যে ব্যক্তি মারা গেছে তাকে মন্দ বলা নিষেধ।[টিকা-মিশকাত]
কবর যিয়ারতের বিবরণ
পুরুষদের জন্য কবর জিয়ারত করা সুন্নাত। কেননা এতে আখেরাতের কথা স্মরণ আসে এবং দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়।[টিকা-মুসলিম, তিরমিযী] যে ব্যক্তি কবর যিয়ারতে যাবে সে নিম্নোক্ত দোয়া গুলির মধ্যে যে কোন দোয়া পড়বে।
প্রথম দোয়া:
السَّلامُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَيَرْحَمُ اللَّهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ وَالْمُسْتَأْخِرِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاحِقُونَ –
অর্থাৎ- শান্তি বর্ষিত হোক ঘরওয়ালাদের উপর যারা এর মাঝে মুমিন এবং মুসলমান রয়েছে এবং আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করুন যারা আমাদের মধ্যে হতে পূর্ব এসেছে এবং পিছনে রয়েছে (পরে আসবে) এবং নিশ্চয় আমরা আল্লাহ চান তো আপনাদের সাথে মিলিত হবো।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
السلامُ على أَهْلِ الدِّيارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ إِنَّا انْ شَاءَ اللهُ لَاحِقُونَ – نَسَأَلُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ .
অর্থাৎ- শান্তি বর্ষিত হোক ঘরওয়লাদের উপর, যারা এর মাঝে মুমিন এবং মুসলবান রয়েছে। নিশ্চয় আমরা আল্লাহ চাহেতো আপনাদের সাথে এসে মিলিত হবো। আমরা আল্লাহর নিকট আমাদের এবং আপনাদের জন্য নিরাপত্তা ও কল্যাণ প্রার্থনা করছি।[টিকা-মুসলিম- সুলায়মান ইবনে বুরায়দা (রা.)]
তৃতীয় দোয়া:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ ، أَنْتُمْ سَلَفنَا وَنَحْنُ بِالأَثَرِ .
অর্থাৎ- আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক হে কবরবাসী! আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের এবং আপনাদের ক্ষমা করুন। আপনারা আমাদের পূর্ববর্তী (আগে গিয়েছেন) এবং আমরা আপনাদের পিছনে আসছি।[টিকা-তিরমিযী-ইবনে আব্বাস (রা.)]
ফিকহ মুহাম্মদী (২য় খণ্ড)
কোরবানীর বিবরণ
কোরবানী করা সুন্নাত। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পূর্বে কোরবানী করে সে কোরবানীর সওয়াব পায় না, সে শুধু নিজের মনোবাসনার জন্য এ জন্তুটি জবেহ করে থাকে এবং যে ব্যক্তি ঈদের নামাজ পরে কোরবানী করে সে তার সওয়াব পায়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- বারা (রা.)] যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পূর্বে কোরবানী করেছে সে এর পরিবর্তে আরেকটি কোরবানী করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জুনদুব ইবনে সুফিয়ান (রা.)] কেননা ঈদের দিন মানুষের যত আমল আছে আল্লাহর নিকট কোরবানীর সওয়াবের মত আর কোন আমল নাই এবং কোরবানীর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই তা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)] কুরবানীর জন্য ছাগ ছাগী এবং গরু জবেহ করা জায়েয।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] তৃতীয় বছর বয়সে পদার্পনকারী গরু, ষষ্ঠ বছরে পদার্পনকারী উটের কোরবানী চলবে। ছাগ-ছাগী, ভেড়া ও দুম্বা এক বছরের কম বয়সী হলে কুরবানী জায়েয হবে না।
কোরবানী নিজ হাতে করবে এবং জবেহ করার সময় বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার বলবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] কানা, রোগা, লেংড়া, খুবই দুর্বল, কান কাটা, কান ফাটা, বা কোন ত্রুটি যুক্ত প্রাণীর কোরবানী জায়েয নয়।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা] কিন্তু এসব জন্তুর মধ্যে যার অর্ধেক বা বেশি কান কাটা এবং অন্য কোন পশুও পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে এসব পশুর কোনবানী করা জায়েয।[টিকা-তিরমিযী- আবু কাতাদা (রা.)] খাসী কোরবানী করা দোষণীয় নয় বরং খাসী কোরবানী সুন্নাত।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী- জাবের (রা.)] কেরবানী করার উদ্দেশ্যে যে জন্তু এহণ করবে তার চোখ কান ইত্যাদি ভালভাবে দেখে নিবে।[টিকা-আহমাদ, দারেমী, সুনানে আরবা- আলী (রা.)] কসাইকে তার কাজের মজুরী হিসেবে কোরবানীর গোশত বা চামড়া ইত্যাদির কোন কিছু দেয়া জায়েয নয়। যথা সম্ভব গোশত ও চামড়া গরীব-দু:খীদেরকে দিবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আলী (রা.)]
যে ব্যক্তি কোন প্রাণী জবেহ করবে, সে ছুরিকে ভালভাবে ধার দিয়ে নিবে, যাতে প্রাণীর বেশি কষ্ট না হয়।[টিকা-মুসলিম- শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.)] ঈদগাহে কোরবানী করা সুন্নাত।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা)] একটি পশুর সামনে অন্য পশু কোরবানী করবে না এবং জবেহ করার সময় তাড়াতাড়ি করবে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- ইবনে উমর (রা.)] প্রতি বছর কোরবানী করা সুন্নাত [টিকা-তিরমিযী- ইবনে উমর (রা.)] এবং তিনদিন পর্যন্ত কোরবানী করা জায়েয।[টিকা-মুয়াত্তা- না’ফে (রা.)] নিজের ও পরিবারবর্গের পক্ষ হতে একটি ছাগল কোরবানীই যথেষ্ট। এর গোশত নিজেও খাবে এবং গরীব মিসকীনকেও দিবে।[টিকা-মুয়াত্তা- আমার ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)] যদি সাত জন মিলে একটি (গরু বা উট) কোরবানী করে তাহলে সেটাই যথেষ্ট।[টিকা-মুসলিম, মুয়াত্তা- জাবের (রা)] যে ব্যক্তি কোরবানী করবে, সে কোরবানীর ঈদের চাঁদ দেখলেই চুল, নখ ইত্যাদি কাটা বন্ধ রাখবে। ঈদের নামাজের পর চুল, নখ কাটবে তাহলে এসব কাজে কোরবানীর মত নেকী পাবে।[টিকা-মুসলিম]
যাকাত না দেয়ার শাস্তি
যে ব্যক্তির নিকট স্বর্ণ বা রৌপ্য রয়েছে এবং সে তার যাকাত না দেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন তা গরম করে তার মাথায়, পিঠে এবং পার্শ্বদেশে দাগ (ছ্যাকা) দেয়া হবে। সে দিন (কিয়ামতের দিন) ৫০ হাজার বছরের সমান একদিন হবে। এরপর আল্লাহর নিকট বেহেশতের উপযুক্ত হলে বেহেশতে যাবে। আর যদি জাহান্নামের উপযোগী হয় তাহলে জাহান্নামে স্থান দেয়া হবে।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
যে ব্যক্তি নিজ মালের যাকাত আদায় করবে না, কিয়ামতের দিন তার মালকে বিষধর সাপে রূপান্তরিত করা হবে যার চোখে কাল দুটি দাগ থাকবে। উক্ত সাপকে তার গলায় জড়িয়ে দেয়া হবে। সে সাপ তখন তার ঠোটের কোন দুটি কামড়ে ধরে বলতে থাকবে আমি তোমার মাল, তোমার গচ্ছিত সম্পদ।[টিকা-বুখারী, আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তির উট, গরু বা ছাগল যাকাতের নেসাব পরিমাণ হবে এবং সে তার জাকাত দিবে না, কিয়ামতের দিন এগুলিকে মোটাতাজা করে তার নিকটে নিয়ে আসা হবে। সে পশুগুলি তাকে পদদলিত করবে এবং শিং দিয়ে গুতা দিবে। একবার মারার পর আবার দ্বিতীয় বার নিয়ে আসা হবে। এভাবে তার উপর ক্রমাগতভাবে শান্তি চলতে থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তার (অন্য) বান্দাদের মাঝে বিচার ফায়সালা শেষ করা পর্যন্ত।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
উটের যাকাতের বিবরণ
পাঁচটি উটের কম থাকলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হয় না। যাকাত দিতে হবে এভাবে:
পাঁচটি উট থাকলে একটি ছাগল যাকাত দিতে হবে।
৫ হতে ২৪টি পর্যন্ত প্রতি ৫টি উটে একটি করে ছাগল দিতে হবে।
২৫টি হতে ৩৫টি পর্যন্ত পূর্ণ এক বছর বয়স্কা একটি উটনী যাকাত দিতে হবে।
৩৬টি হতে ৪৫ টি পর্যন্ত পূর্ণ দু’বছর বয়স্কা ১টি উটনী যাকাত দিতে হবে।
৪৬টি হতে ৬০টি পর্যন্ত পূর্ণ তিন বছর বয়স্কা ১টি উটনী দিতে হবে।
৬১টি হতে ৭৫টি পর্যন্ত পূর্ণ চার বছর বয়স্কা ১টি উটনী দিতে হবে।
৭৬টি হতে ৯০টি পর্যন্ত পূর্ণ দু’বছর বয়স্কা দুটি উটনী দিতে হবে।
৯১টি হতে ১২০টি পর্যন্ত পূর্ণ তিন বছর বয়স্কা দুটি উটনী দিতে হবে।
তদূর্ধে হলে প্রতি ৪০টিতে পূর্ণ তিন বছর বয়স্কা একটি করে উটনী যাকাত দিতে হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] অর্থাৎ- উটের যাকাত ২৪ সংখ্যা পর্যন্ত তিন বছর হবে ছাগল দিয়ে এবং ২৪ এর বেশি হলে তখন বের করতে হবে উট দিয়ে।
ছাগলের যাকাতের বিবরণ
ছাগল ৪০টির কম হলে তাতে যাকাত ফরজ হয় না। ছাগল ৪০ টি হতে ১২০টি পর্যন্ত সংখ্যার জন্য একটি ছাগল যাকাত দিতে হবে। ১২০ হতে ২০০ পর্যন্ত ছাগলে ২টি ছাগল যাকাত দিতে হবে। ২০১টি হতে ৩০০ পর্যন্ত ৩টি ছাগল যাকাত দিতে হবে। তদূর্ধে প্রতি ১০০ টিতে একটি করে ছাগল বৃদ্ধি করবে এবং এভাবে যাকাত দিতে হবে।[টিকা-বুখারী]
গরুর যাকাতের বিবরণ
গরু-বলদ ৩০টির কম হলে যাকাত ফরজ হবে না। ৩০ হতে ৩৯ টি পর্যন্ত গরুর জন্য এক বছরের একটি বকনা বা এঁড়ে বাচ্চুর যাকাত হিসেবে বের করবে। ৪০টি গরু হলে দু’বছরের একটি বাচ্চুর যাকাত হিসেবে বের করবে।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)] যে ব্যক্তির নিকট গরু, ছাগল, উট উক্ত নেসাবের চেয়ে কম হবে তার উপর যাকাত ফরজ হবে না। যদি কেউ এর যাকাত দেয়, তা হলে সওয়াবের অধিকারী হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু সাঈদ (রা.)]
সোনা চান্দির যাকাতের বিবরণ
চান্দি দুইশত দিরহাম পরিমাণ না হলে যাকাত ফরজ হয় না।[টিকা-আবু দাউদ- আলী (রা.)] দুইশত দিরহাম পরিমাণ চান্দি এক বছর পর্যন্ত কারো নিকট থাকে তাহলে পাঁচ দিরহাম পরিমাণ যাকাত দেয়া ফরজ।[টিকা-বুখারী- আবু বকর (রা.)] বর্তমান ২০০ দিরহামে ৫২ তোলা (ভরি) ওজন হয়। তাই কারো নিকট ৫২ তোলা রূপা এক বছর মওজুত থাকলে তাকে শতকরা ২.৫ হিসাবে যাকাত দিতে হবে। যদি কারও নিকট ২০ দিনার স্বর্ণ ১ বছর পর্যন্ত মওজুত থাকে তা হলে তার উপর অর্ধদিনার যাকাত দেয়া ফরজ।[টিকা-বুখারী] ২০ দিনারের ওজন ৭.৫ তোলা বা ভরি। ৭.৫ ভরি স্বর্ণের জাকাত বের হবে সোয়া দুই মাসা স্বর্ণ। বর্তমানে গ্রামের ওজনে ২০ দিনার স্বর্ণের ওজন হচ্ছে ৮৫ গ্রাম। মোট কথা সোনা বা চান্দি এক বছর পর্যন্ত নিসাব পরিমাণ (২০০ দিরহাম বা ২০ দিনার) কারো নিকট জমা থাকলে ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত দেয়ার বিধান। যদি নিসাবের চেয়ে কম থাকে তাহলে যাকাত ফারজ হবে না।
গহনা বা অলংকারের যাকাতের বিবরণ
অলংকারের যাকাত দেয়া সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে। এ অধ্যায়ে যতগুলি হাদীস এসেছে তা কারো নিকট সহীহ এবং করো নিকট সহীহ নয়। তবে উত্তম হচ্ছে যাকাত আদায় করা।
ওশর এর বিবরণ
যে ফসল বৃষ্টির বা ঝর্ণার পানিতে উৎপন্ন হয় তার দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। তদ্রুপ যে জমি লবনাক্ত ও তাতে পানি সিঞ্চন না করলেও তার ফসল পেকে যায়। আর যে ফসলে পানি সিঞ্চন দেয়া লাগে তাতে ২০ ভাগের এক ভাগ যাকাত আদায় করতে হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] খেজুর, যব, গম, মনাক্কা (প্রভৃতি ফসলের) পাঁচ অসাকের কম হলে যাকাত দিতে হয় না।[টিকা-মুসলিম] পাঁচ অসাক হলে দশ ভাগের এক ভাগ ওশর দিতে হবে। (ঘাট সা’তে এক অসাক হয়। এক সা, পৌনে তিন সের ওজন তাহলে পাঁচ অসাকে প্রায় ২০ মন ওজন হয়। ২০ মন কোন ফসল হলে তাতে যাকাত বের করতে হবে।)
মধুর যাকাতের বিবরণ
মধুর চাষাবাদ করলে মধুর যাকাত দিতে হবে। মধুর দশভাগের একভাগ যাকাত দিতে হবে।[টিকা-আহমাদ, ইবনে মাজাহ]
যে সব বস্তুতে যাকাত ফরজ নয় তার বিবরণ
ঘোড়া, খচ্চর এবং ক্রীতদাসে যাকাত ফরজ হয় না।[টিকা-দারকৃতনী-হযরত আলী (রা.)] তদ্রুপ যে গরুর দ্বারা কাজ করান হয় তাতে যাকাত ফরজ হয় না। তেমনি শাক-সব্জী, গহনা এবং ভাড়া ঘরে যাকাত ফরজ হওয়া সাব্যস্ত নাই।
জ্ঞাতব্য: ব্যবসার মালের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার কথা প্রমাণিত রয়েছে আবু দাউদ শরীফে। হযরত উমর ফারুক উরুজুত তিজারা বা ব্যবসার মালের উপর যাকাত নির্ধারণ করেছেন। (দেখুন ফিকহু্য যাকাত ১ম খণ্ড)
গুপ্তধনের উপর যাকাত
যে ব্যক্তি মাটির নীচে (কোন কষ্ট ক্লেশ ছাড়াই) কোন গুপ্তধন পেয়ে যাবে, সে এর পাঁচ ভাগের এক ভাগ যাকাত আদায় করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
ভিন্ন মালিকানার পশুর বিবরণ
দুই (বা তার অধিক) অংশীদারের একত্রিত পশুকে আলাদা করবে না, তেমনি আলাদা আলাদা পশুকে একত্রিত করবে না যাকাতের ভয়ে।[টিকা-বুখারী- আনাস (রা.)] দুজন শরীক আছে এমন পশুর যাকাত দুজনে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে যাকাত বের করবে।
যে সব পশু যাকাত হিসেবে দেয়া ঠিক নয়
বৃদ্ধ পশু, দোষযুক্ত এবং যে পশুকে প্রজননের জন্য রাখা হয়েছে তা যাকাত হিসেবে নেয়া হবে না। এমনিভাবে, গর্ভবতী পশু, বন্ধ্যা ছাগী এবং যে ছাগী (বা গাভী) দুধের জন্য প্রতিপালন করা হয় তাকেও যাকাত হিসেবে দেয়া যাবে না।[টিকা-মুয়াত্তা, মুসনাদে শাফেয়ী-হযরত উমর (রা.)]
যাকাতের খাত এর বিবরণ
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন যে, যাকাত আট প্রকার লোকের মাঝে বন্টন করবে-
১. ফকির অর্থাৎ যার নিকট এক বেলারও খাবার নাই।
২. মিসকিন অর্থাৎ যার নিকট এক বা দু বেলার খাবার রয়েছে।
৩. যাকাত কর্মচারী অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রধান যাকে যাকাত আদায় করার জন্য প্রেরণ করেন। (যাকাত অফিসার)
৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব অর্থাৎ ঐ বিধর্মী যাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হবে।
৫. ক্রীতদাসকে গোলামী হতে মুক্ত করতে।
৬. ঋণগ্রস্থ ব্যক্তিকে।
৭. যারা আল্লাহর পথে লড়াই (সংগ্রাম) করছে।
৮. মুসাফির।[টিকা-সূরা তওবা: ৬০ নং আয়াত]
যাকাত সংক্রান্ত বিভিন্ন মাসআ’লার বিবরণ
যাকাত অগ্রিম আদায় করা জায়েয।[টিকা-তিরমিযী, হাকেম] যে সম্পদের যাকাত দেয়া হয় তা কানয বা গচ্ছিত সম্পদ নয় যার ব্যাপারে পরকালীন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে।[টিকা-আবু দাউদ, দারকুতনী- উম্মে সালামা (রা.)]
যদি কেউ কোন ধনী লোককে গরীব মনে করে তাকে যাকাত দেয় তাহলে তার যাকাত আদায় হয়ে যাবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] রাষ্ট্র প্রধানের উপর অবশ্য করণীয় হচ্ছে যে, তিনি ধনীদের নিকট হতে যাকাত নিয়ে গরীব এবং অভাবী লোকদের মাঝে ব্যয় ও বিতরণ করবেন।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আবু হুজায়ফা (রা.)]
যে সব লোককে যাকাত দেয়া ঠিক নয়
অভাব অভিযোগহীন, স্বাস্থ্যবান কর্মক্ষম ব্যক্তি এবং হাশেমী অর্থাৎ হযরত আলী (রা.), হযরত আকীল, হযরত জাফর, আব্বাস এবং হযরত হারেস এর বংশাবলী এবং এদের গোলামদের যাকাত দেয়া হারাম।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ আবু রা’ফে (রা.)]
ভিক্ষাবৃত্তির বিবরণ
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, তিন ব্যক্তি ব্যতীত কারো ভিক্ষা করা জায়েয নয়-
(ক) যে ব্যক্তি কোন সৎকাজ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে।
(খ) যে ব্যক্তির ধনসম্পদ হঠাৎ কোন বিপদে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
(গ) যে ব্যক্তির দারিদ্রতার কথা তিনজন নিষ্ঠাবান ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়।[টিকা-মুসলিম কাবিসা ইবনে মাখারেক (রা.)]
যে ব্যক্তি তার ধনসম্পদ বাড়াবার জন্য ভিক্ষা করে সে আগুন ভিক্ষা করছে। অতপর সে বেশি ভিক্ষা করুক বা কম ভিক্ষা করুক।[টিকা-মুসলিম আবু হুরায়রা (রা.)] কিয়ামতের দিন ভিক্ষাকারীর মুখ মণ্ডলে গোশত থাকবে না। যদি কোন ব্যক্তির না চেয়েও কিছু মিলে বা কেহ দেয় তাহলে তা নেয়া আয়েয, যদিও তার সে জিনিসের প্রয়োজন না থাকে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
সাদকাহ কারীর মর্যাদা ও তার প্রকারভেদ
প্রতিদিন সকালে আকাশ হতে দু’জন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। তাদের একজন বলতে থাকেন “হে রব্বুল আলামীন! তুমি দানকারীকে অআরও দাও।” দ্বিতীয় জন বলতে, থাকেন “হে আল্লাহ্। কৃপণের মালকে ধ্বংস কর।”[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] আল্লাহ তায়ালা বলেন- “হে আদম সন্তান! তুমি খরচ কর (দান কর) আমি তোমার উপর খরচ করবো। আল্লাহ তায়ালার নিকট জাহেল দানশীল ব্যক্তি কৃপণ আবেদ এর চেয়ে উত্তম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় এক দিরহাম দান করে তা আল্লাহর নিকট সেই শত দিরহাম হতে উত্তম যা মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার সময় দান করা হয়।[টিকা-তিরমিজী, আবু দাউদ] যে ব্যক্তি মৃত্যুর সময় সদকা করে বা গোলাম আযাদ করে সে ঐ ব্যক্তির মত যে সন্তুষ্ট চিত্তে কারও নিকট উপঢৌকন পাঠায়।[টিকা-আবু দাউদ- আবু সাঈদ (রা.)] মুমিন কামেল বা পূর্ণ মুমিন কৃপণ এবং দুশ্চরিত্র হতে পারে না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে মাল খরচ করে, তার মাল কমে না। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় বিনয় ও নম্রতা পোষণ করে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করেন। আর যে ব্যক্তি (প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থেকেও) ক্ষমা করে, আল্লাহ্ তার ইজ্জত বাড়িয়ে দেন।[টিকা-তিরমিযী]
হযরত রাসূলে করীম (সা.) বলেছেন “মানুষের অংগ প্রত্যঙ্গের উপর প্রতিদিনই সাদকা আছে। দুই জন লোকের মাঝে সুবিচার করা সদকা। তদ্রুপ কাউকে তার ঘোড়ায় চড়িয়ে দেয়া সাদকা। ভালভাবে কথাবার্তা বলা, মসজিদ পানে চলা, রাস্তা হতে কাঁটা ইত্যাদি দূর করা, এসবই সাদকার মধ্যে গণ্য।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি ফসল ফলায় এবং সেটা হতে কোন মানুষ বা পশু-পাখী ভক্ষণ করে তাহলে তা সাদকা বলে গণ্য হবে। কারও সাথে হাসিখুশী মুখে সাক্ষাত করা, সৎ কাজের নির্দেশ দেয়া এবং অসৎ কাজে বাধা দেয়া, পথহারা লোককে পথের ঠিকানা দেয়া, অন্ধকে সাহায্য করা, পথঘাট হতে কাঁটা, হাড়, পাথর ইত্যাদি সরানো, কোনো ভাইকে পানি উঠিয়ে দেয়া, এ সমস্ত কাজগুলি সবই সাদকার মধ্যে গণ্য।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] যে মুসলমান কোন মুসলমানকে কাপড় পরার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে বেহেশতের সবুজ কাপড় পরাবেন।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] কোন মুসলমান যদি অন্য কোন ক্ষুধার্ত মুসলামানকে খাবার দেয় তাহলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে খাওয়াবেন এবং যদি কোন পিপাসিত ব্যক্তিকে পানি পান করায় তাহলে তাকে রাহিকে মাখতুম (নিকটতম বান্দাদের জন্য এক উত্তম শরাব) পান করাবেন।[টিকা-তিরমিযী- আবু যার (রা.)] সওয়াবের নিয়াতে নিজ পরিবার বর্গের উপর খরচ করাও সাদকার মধ্যে পরিগণিত।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- আবু সাঈদ (রা.)]
উত্তম সাদকার বিবরণ
সবচেয়ে উত্তম দান হচ্ছে যে, দানকারী সাদকা করার পর খালি হাত না হয়ে পড়ে এবং ঐসব লোকদের দান করা উচিৎ যাদের উপর খরচ করার (দানকারীর) জিম্মাদারী রয়েছে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু মাসউদ (রা.)]
কেহ যদি এক দিরহাম খোদার পথে, এক দিরহাম গোলাম আযাদ করতে, এক দিরহাম মিসকীনের জন্য এবং এক দিরহাম পরিবারের জন্য খরচ করে তাহলে সওয়াবের দিক হতে ঐ দিরহাম উত্তম যা তার পরিবার বর্গের জন্য খরচ করেছে।[টিকা-মুসলিম- মুসলিম (রা.)] একজন সাধারণ মিসকীনকে দান করলে যে নেকী হয়, সে দান একজন আত্মীয় মিসকীনকে করলে নেকী ডবল হয়। এক হচ্ছে দান করার জন্য এবং দ্বিতীয় হচ্ছে আত্মীয়তা রক্ষার জন্য।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, দারেমী-সোলায়মান ইবনে আমের (রা.)] প্রথমে নিজের জন্য খরচ করতে হবে, এরপর সন্তান-সন্ততির জন্য, এরপর নিজ পরিবারের উপর, এরপর নিজ চাকর-বাকরদের উপর, এরপর যাদের হকদার মনে করবে তাদের জন্য দান খয়রাত করবে।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ- আবু হুরায়রা (রা.)]
স্বামীর মাল হতে স্ত্রীর খরচ করার বিবরণ
যে মহিলা তার স্বামীর মাল অপব্যয় না করে এবং তার অনুমতি নিয়ে খরচ (দান) করে, সে ও তার স্বামী উভয়েই সমান নেকীর অধিকারী হয়। স্ত্রী দান করার কারণে এবং স্বামী উপার্জন করার কারণে নেকী পাবে এবং একজনের নেকী অন্যজনের নেকী হতে কম হবে না।[টিকা-বুখারী- আয়েশা (রা.)] তদ্রুপ যদি চাকর তার মনিবের অনুমতি মোতাবেক সন্তুষ্টি সহকারে কোন রকমের ব্যতিক্রম ছাড়াই খরচ (সাদকা) করে তাহলে উভয়েই সমান নেকীর অধিকারী হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- মুসা (রা.)] স্ত্রী স্বামীর অনুমতি (সরাসরি অনুমতি বা প্রথাগত অনুমতি) ব্যতীত দান খয়রাত করা ঠিক নয়।[টিকা-তিরমিযী- আবু উমামা (রা:)]
সাদকা করে তা পুন: ক্রয় করার বিবরণ
কাউকে কোন দান করে তা পুনরায় ক্রয় করা হচ্ছে বমি করে তা আবার চেটে খাওয়ার মত।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)] যদি কেউ তার কোন আত্মীয়কে কিছু দান করে এবং তা তার কোন অংশীদার হতে পুনরায় পেয়ে যায় তাহলে সেটা নেয়া তার জন্য জায়েয।[টিকা-মুসলিম]
সাদকাতুল ফিতর বা ফিতরার বিবরণ
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, ছোট বড়, নরনারী স্বাধীন ও গোলাম প্রত্যেকের উপর ঈদুল ফিতরের ফিতরা দেয়া ওয়াজিব।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] খেজুর, যব, পনির, মনাক্কা, প্রভৃতির এক সা’ পরিমাণ (প্রায় আড়াই কেজি) প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষ হতে ঈদের নামাযের পূর্বেই আদায় করতে হবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরবিজী, নাসাঈ- আমর ইবনে শুয়াইব (রা.)] গম অর্ধ সাই যথেষ্ট, কিন্তু পূর্ণ সা’ দেয়াই উত্তম।[টিকা-ইবনে খুজায়মা, সুবুলুস সালাম- ইবনে উমর (রা.)] রোযা অবস্থায় যে অনর্থক ও বেহুদা কথা-বার্তা বলে তার কাফ্ফারা হচ্ছে ঈদুল ফিতরের ফিতরা।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে আব্বাস (রা.)] ফিতরা দেয়ায় ধনীর অন্তর পবিত্র হয় এবং ফকিরকে আল্লাহ হায়ালা তার অনুগ্রহে অধিক দিয়ে থাকেন।[টিকা-আবু দাউদ- আব্দুল্লাহ ইবনে সা’লাবা (রা.)]
রমজানের রোযা ফরজ হবার বিবরণ
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন-
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ – ( البقرة : (۱۸۳)
অর্থাৎ- হে ঈমনদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। (সূরা বাকারা: ১৮৩)
রোযা হচ্ছে ইসলামের তৃতীয় রুকন বা স্তম্ভ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
পবিত্র রমজান মাসের মর্যাদার বিবরণ
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-
شهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وبَيِّنَاتِ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ – (البقرة : ١٨٥)
অর্থাৎ- রমজান মাসেই কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। আর তা (কুরআন) হচ্ছে মানুষের জন্য হেদায়াত এবং হেদায়াতের সুস্পষ্ট দলিল, হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। (সূরা বাকারা: ১৮৫)
যখন রমজান মাস আসে তখন আসমান এবং বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানকে বন্দী করা হয় যেন সে রোজাদারদের অন্তকরণে কুমন্ত্রণা দিতে না পারে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
পবিত্র রমজানের রোযার সওয়াব
জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, তার মাঝে একটির নাম হচ্ছে রাইয়ান। এ দরজা দিয়ে রোযাদার ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- সাহল ইবনে সা’দ (রা.)] প্রত্যেক ভাল কাজের প্রতিদান দশ হতে সাত শ’ পর্যন্ত দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা বলেন, রোযা একমাত্র আমারই উদ্দেশ্যে এবং আমি এর প্রতিদান দিব। (কেননা আমার বান্দা আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং সওয়াবের আশায় আপন বাসনাকে দমন করে এবং খানাপিনা পরিহার করে।)[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি রমজানের রোযা রাখে ঈমানের কা (শরিয়তকে সঠিক জেনে এবং রোযার ফরজিয়াতকে বিশ্বাস করে) এবং সওয়াবের আশায়, তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] রোজাদারের জন্য দু’টি খুশী। একটি ইফতার করার সময় (এটা এ কারণে যে, সে আল্লাহর হুকুম পালন করে নিয়েছে) এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে তার প্রভুর সাথে মোলাকাতের সময় (যেহেতু সওয়াবের প্রত্যাশী)।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরীর (মৃগনাভীর) সুগন্ধির চেয়েও সুগন্ধিযুক্ত।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
রোযা দুনিয়াতে গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য এবং পরকালে জাহান্নামের শান্তি হতে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] রমজান মাসে আল্লাহর পক্ষ হতে এক ঘোষণাকারী বলতে থাকেন “হে কল্যাণ ও পূণ্যের অনুসন্ধানকারী। তুমি (আল্লাহর দিকে) আকৃষ্ট হও। হে অপকর্মের ইচ্ছা পোষণকারী! তুমি অপকর্ম হতে বিরত হও। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা রমজানের বরকতের কারণে তার অনেক বান্দাকে দোজখ হতে নিষ্কৃতি দিয়ে থাকেন, তুমিও এদের দলের একজন হও।”[টিকা-আহমাদ তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)] রমজান মাস বরকতের মাস। এমাসে একটি রাত (লাইলাতুল কাদর) আছে যার ইবাদত এক হাজার রাতের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান- সালমান ফারেসী (রা.)] রমজান মাসে একটি নফল ইবাদতের সওয়াব অন্য মাসের ফরজ আদায় করার সমান এবং রমজান মাসে একটি ফরজ আদায় করার সওয়াব অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করার সমান।[টিকা-প্রাগুক্ত]
বিনা ওজরে রোযা ত্যাগ করার বিবরণ
বিনা ওজরে রোযা ছাড়া তেমনি কুফরী যেমন বিনা ওজরে নামাজ ত্যাগ করা কুফরী।[টিকা-মিশকাত] সুবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া, পান করা, স্ত্রী সঙ্গম ও (বেহুদা কথাবার্তা) হতে বিরত থাকার নামই রোযা।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা)]
রোযাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব
যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করাবে এটা তার জন্য গুনাহ মাফ এবং দোজখ হতে নাজাত পাবার কারণ হবে।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান, মিশকাত- সালমান ফারেসী (রা.)] ইফতার প্রদানকারী রোযাদারের সমান সওয়াবের অধিকারী হবে। এক ঢোক দুধ বা একটি খেজুর দিয়ে ইফতার করালেও এ সওয়াব মিলবে।[টিকা-প্রাগুক্ত] রাসূলুল্লাহ (স:) ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি রোযাদারকে পেট ভরে খাওয়াবে আল্লাহ তা’য়ালা (কিয়াতমের দিন) তাকে আমার হাউজে কাওসার হতে পান করাবেন। সে বেহেশতে পবেশ করা পর্যন্ত আর তৃষ্ণার্ত হবে না।[টিকা-প্রাগুক্ত]
রোযা রোযাদারের জন্য সুপারিশ করবে
রোযা রোযাদারের জন্য সুপারিশ করবে। বলবে, হে প্রভু! আমি একে খাওয়া, পান করা, আকাংখিত জিনিস (স্ত্রী সংগম ইত্যাদি) হতে বিরত রেখেছিলাম, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল কর। আল্লাহ তা’য়ালা উক্ত সুপারিশ কবুল করবেন।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান, মিশকাত- আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)]
রমজানে চাকর চাকরাণীদের কাজ হালকা করার বিবরণ
রমজান মাসে চাকর চাকরাণীদের কাজ হালকা (সহজ) করে দিলে গুনাহ মাফ হয় এবং আল্লাহ তা’য়ালা তাকে জাহান্নামের আগুন হতে নাজাত দান করেন।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান, মিশকাত- আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)]
রমজানে কয়েদীদের মুক্তি দেয়া ও ভিক্ষুককে সাহায্য দেয়ার বর্ণনা
রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে প্রত্যেক কয়েদীকে মুক্তি প্রদান করতেন এবং প্রত্যেক প্রার্থনাকারীকে (যে কোন যাঞ্চাকারীকে) তা দান করতেন।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান, মিশকাত- ইবনে উমর (রা.)]
প্রতি রমজানে বেহেশত সুসজ্জিত করার বর্ণনা
রমজানের আগমন উপলক্ষে বেহেশতকে শাওয়াল মাসের প্রথম হতে শাবান মাসের শেষ পর্যন্ত (অর্থাৎ সারা বছর) সুসজ্জিত করা হয়ে থাকে। রমজানের প্রথম তারিখে আরশের তলদেশে বেহেশতের পত্ররাজীর মধ্যে হুরদের মাথার উপর দিয়ে বায়ু প্রবাহিত হতে থাকে। তখন হুরেরা বলেন, হে আমাদের প্রভু! তোমার বান্দাদের মধ্য হতে আমাদের স্বামী বানিয়ে দাও। যেন তাদের দেখে আমাদের চক্ষু জুড়ায় এবং আমাদের দেখে তাদের চক্ষু শীতল হয়।[টিকা-প্রাগুক্ত]
রমজানের রাতে কিয়াম করার সওয়াব
যে ব্যক্তি রমজানের কিয়াম করে (অর্থাৎ রাতে তারাবীর নামায পড়বে) ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায়, আল্লাহ তা’য়ালা তার পূর্বের গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে দেন।[টিকা-বুখারী, মুসলিম আবু হুরায়রা (রা.)]
চাঁদ দেখে রোযা রাখা ও চাঁদ দেখে ঈদ করা
চাঁদ দেখে রোযা রাখবে এবং চাঁদ দেখে ঈদ করবে। যদি উনত্রিশে রমজানের দিবাগত সন্ধ্যায় (রাতে) মেঘ বা ধুলাবালির কারণে চাঁদ দেখতে না পাওয়া যায় তাহলে রোজা পুরা ত্রিশ দিন করে ঈদ করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
সন্দেহযুক্ত দিনে রোযা রাখা নিষেধ
সন্দেহযুক্ত দিনে রোযা রাখা নিষেধ। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক দিনে রোযা রাখল, সে হযরত মুহাম্মদ (স:) এর নাফরমানী করল।[টিকা-সুনানে আরবা, দারেমী- আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা.)]
রমজানের সম্মানার্থে রোযা রাখা নিষেধ
রমজানের (সম্মানার্থে) ২/১ দিন পূর্বে রোযা রাখবে না। কিন্তু যদি উক্ত দিনে রোযা রাখা কারো অভ্যাস হয়ে থাকে (অর্থাৎ প্রতি মাসে রোযা রাখে) তাহলে অসুবিধা নাই।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
রোযা রাখা ও ঈদ করার জন্য সাক্ষ্য
রমজানের রোযা রাখার জন্য একজন আ’দেল মুসলমানের সাক্ষ্যই যথেষ্ট।[টিকা-আবু দাউদ, দারেমী- ইবনে উমর (রা.)] এবং দু’জন আ’দেল মুসলমান ঈদের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দিলে ঈদ করতে হবে।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে উমর (রা.)]
ফরজ রোযার নিয়্যেতর সময়
যে ব্যক্তি সুবহে সাদেকের পূর্বে ফরজ রোযার নিয়্যত করেনি তার রোষা সঠিক হবে না।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, দারেমী- হাফসা (রা.)]
সেহরীর সময় এর বিবরণ
সেহরীর সময় সুবহে সাদেক প্রকাশ হবার পূর্ব পর্যন্ত।[টিকা-সূরা বাকারা: ১৮৭]
সেহরী খাবার বিবরণ
সেহরী খাওয়া সুন্নাত। সেহরী খেলে সারা দিন শরীরে শক্তি থাকে।[টিকা-মিশকাত- আনাস (রা:)]
সওমে বেসাল বা মিলান রোযা রাখা নিষেধের বিবরণ
একদিনের সাথে অন্য দিন মিলিয়ে (মধ্যে কোন ইফতার না করে) রোযা রাখা সুন্নাত নয়। (বরং তা নিষিদ্ধ।)[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
তাড়াতাড়ি ইফতার করার ফজিলত
তাড়াতাড়ি ইফতার করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, মানুষ সর্বদা কল্যাণের সাথে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাড়াতাড়ি ইফতার করবে।[টিকা-তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)]
রোযা ভঙ্গের কারণ ও তার বর্ণনা
যে ব্যক্তি অনর্থক (বেহুদা) কথা ও মিথ্যা বলে তার রোযার প্রতি আল্লাহ তায়ালা কোন ভ্রুক্ষেপ করেন না।[টিকা-বুখারী- আবু হুরায়রা (রা.)] রোযা রেখে অনর্থক কথা বা মিথ্যা বলবে না। যদি কেউ গালি দেয় বা ঝগড়া বাধায় তাহলে ওজর পেশ করে বলবে আমি রোযা রেখেছি।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] রোযাদার ব্যক্তির জন্য স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া জায়েয এবং স্ত্রীর শরীরের সাথে নিজ শরীর লাগানো নিষেধ নয়। কিন্তু যে যুবক কামরিপুর উত্তেজনা সংযত করতে সক্ষম নয় তার জন্য নাজায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] রোযাদার ব্যক্তি যদি রাতে অপবিত্র হয়ে যায়, তাহলে তার জন্য সুবেহ সাদেকের পর গোসল করা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] সিঙ্গা (কুলিয়া) লাগালে রোযা ভঙ্গ হয় না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] যে ব্যক্তি রোযা অবস্থায় ভুল করে খেয়ে নেয় বা পানি পান করে তাহলে তার রোযা নষ্ট হবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] কুলি করার পর মুখের ভিতর থুথু করলে রোযা নষ্ট হয় না।[টিকা-বুখারী] রোযা অবস্থার চোখে সুরমা লাগানো জায়েয। রোযা অবস্থায় মেসওয়াক করা জায়েয। হযরত রাসূলে করীম (সা.) রোযা অবস্থায় একাধিকবার মেসওয়াক করতেন।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- আমের ইবনে রাবিয়া (রা.)] বমি হলে রোযা নষ্ট হয় না। কিন্তু কেউ ইচ্ছাকৃত বমি করলে তার রোযা ভঙ্গ হবে এবং তাকে কাজা আদায় করতে হবে।[টিকা-প্রাগুক্ত] মাথায় পানি ঢাললে রোযা নষ্ট হয় না।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী- আবু হুরায়রা (রা.)] রমজানের একটি রোযার যে নেকী পাওয়া যায়, সারা জীবন রোযা রেখেও সে পরিমাণ নেকী পাওয়া যাবে না।[টিকা-মুয়াত্তা, আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] রোযা অবস্থায় স্ত্রী সঙ্গম করলে বা গুপ্তাঙ্গের অগ্রভাগ প্রবেশ করালে রোযা নষ্ট হয়ে যায়।[টিকা-বুখারী- আবু হুরায়রা (রা.)]
রোযা অবস্থায় সঙ্গম করার কাফ্ফারা
যে ব্যক্তি রোযা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করবে সে একজন গোলাম আযাদ করবে। যদি গোলাম আযাদ করতে অক্ষম হয় তাহলে একাধারে দুইমাস রোযা রাখবে। যদি একাধারে দুই মাস রোযা রাখতে অক্ষম হয় তাহলে ষাট জন মিসকীনকে খানা খাওয়াবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
ইফতারের সময় রোযাদারের দোয়া কবুল হয় তার বর্ণনা
ইফতারের সময় রোযাদার দোয়া করলে তা প্রত্যাখ্যাত হয় না (অর্থাৎ কবুল করা হয়।)[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে উমর (রা.)]
ইফতারের দোয়া
রোযা ইফতার করার সময় এ দোয়াগুলির মধ্যে যেটা ইচ্ছা পাঠ করবে:
প্রথম দোয়া:
اللهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্যই রোযা রেখেছিলাম এবং তোমার দেয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করছি।[টিকা-আবু দাউদ- মুয়াস ইবনে জুহরা (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
ذهَبَ الظَّمَاء وَابْتَلَتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ .
অর্থাৎ- তৃষ্ণা দূর হয়েছে, শিরা-উপশিরাগুলি সঞ্জিবীত হয়েছে এবং আল্লাহ চাহেত প্রতিফল নির্ধারিত হয়েছে।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে উমর (রা.)]
তৃতীয় দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِرَحْمَتِكَ الَّتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيءٍ أَنْ تَغْفِرَ لِي ذُنُوبِي –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। যার প্রশস্ততা সমস্ত জিনিসের উপর পরিব্যপ্ত। তুমি আমার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দাও।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
সফরে রোযা রাখার বিবরণ
মুসাফির হলে তাকে এ অধিকার দেয়া হয়েছে যে, সে ইচ্ছা করলে রোযা রাখতে পারে, ইচ্ছা করলে নাও রাখতে পারে। কিন্তু রোযা রাখতে কষ্ট হলে রোযা না রাখাই উত্তম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)]
মা ও গর্ভবর্তী মহিলার রোযার বিবরণ
দুধ পানকারিনী মায়ের বাচ্চা যতদিন দুধ ছাড়া অন্য কোন খাবার না খায় ততদিন পর্যন্ত উক্ত মাতার উপর রোযা রাখা ওয়াজিব নয়। তদ্রুপ গর্ভবতী মহিলার সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত তার উপর রোষা ওয়াজিব নয়।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ]
হায়েজ ও নেফাস অবস্থায় মহিলার রোযা রাখার বিবরণ
হায়েজ অবস্থায় এবং নেফাস অবস্থায় (সন্তান প্রসবের পর যে রক্তপাত হয়) রোযা রাখবে না। পরবর্তীতে এ রোযার কাজা আদায় করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- মুয়াজা আদাবিয়া (রা.)]
বৃদ্ধ লোকের রোযার বিবরণ
যে বৃদ্ধলোক রোযা রাখতে অসমর্থ সে প্রতিদিন একজন মিসকিনকে খানা খাওয়াবে এবং তার উপর রোযার কাজা ওয়াজিব নয়।[টিকা-দারাকুতনী, হাকে- ইবনে আব্বাস (রা.)]
মৃতের পক্ষ হতে ওয়ারিসদের রোযা
যদি কেউ মারা যায় এবং তার উপর রোযা আদায় বাকী থাকে তাহলে তার পক্ষ হতে তার উত্তরাধিকারী রোযা রাখবে। অথবা প্রতি রোযার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খানা খাওয়াবে।[টিকা-তিরমিযী, মিশকাত- ইবনে উমর (রা.)]
রোযার কাজার বিবরণ
যে ব্যক্তি শরয়ী ওজরের (সফর বা অসুখ) কারণে রোযা রাখতে পারবে না, তার জন্য এ রোযার কাজা আদায় করা ওয়াজিব।[টিকা-সূরা বাকারা: ১৮৫]
নফল রোযার বিবরণ
যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্যে রোযা রাখে, আল্লাহ তায়ালা তার মাঝে এবং দোজখের মাঝে এমন দূরত্ব করে দেন যেমন আসমান এবং জমিনের মাঝে দূরত্ব রয়েছে।[টিকা-তিরমিযী, মিশকাত- আবু উমামা (রা.)] প্রত্যেক বস্তুর জাকাত রয়েছে, শরীরের জাকাত হল রোযা।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)] নফল রোযার মধ্যে আশুরার রোযাই উত্তম। যে ব্যক্তি আশুরার রোযা রাখবে সে মুহররমের ৯ (নয়) তারিখও রোযা রাখবে।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] আশুরার রোযা দ্বারা গত বছরের গুনাহর কাফ্ফারা হয়ে যায়।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] ঈদের দিন রোযা রাখা জায়েয নয়। তদ্রুপ আইয়্যামে তাশরীক বা জিলহজ্ব মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখেও রোযা রাখা জায়েয নয়।[টিকা-মুসলিম- আবু কাতাদা (রা.)] কিন্তু যে হাজী সাহেব কোরবানী করতে পারবে না, সে এ দিনগুলোতে রোযা রাখবে।[টিকা-মুসলিম, আহমাদ- কাব ইবনে মালেক (রা.)] আরাফার দিনের রোযা গত বছর এবং সামনে বছরের গুনাহের কাফ্ফারা স্বরূপ।[টিকা-মুসলিম- আবু কাতাদা (রা.)] কিন্তু হাজী সাহেবদের জন্য আরাফার দিন রোযা রাখা জায়েয নয়।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] প্রতিদিন (লাগাতার ভাবে) রোযা রাখা নিষেধ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবুদল্লাহ বিন উমর (রা.)] উত্তম হচ্ছে প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা রাখা। যে ব্যক্তি এর চেয়েও বেশি সমর্থ রাখে সে একদিন পর পর রোযা রাখবে। হযরত দাউদ (আ.) এভাবে রোযা রাখতেন।[টিকা-প্রাগুক্ত] স্ত্রীলোকের স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা রাখা জায়েয নয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] শুধু জুমার দিন রোযা রাখা জায়েয নয়। জুমার সাথে এর আগে বা পরে একদিন মিলিয়ে রোজা বাখবে।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরাইরা (রা.)] তদ্রুপ সপ্তাহে কোন দিন (একটি) রোযা রাখা জায়েয নয় যতক্ষণ না এর আগে বা পরে একদিন মিলিয়ে রোযা রাখবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী] রোযাদারের অস্থিসমূহ আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে এবং ফেরেশতারা রোযাদারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।[টিকা-শোয়াবুল ইমান] বিনা কারণে নফল রোযা ভঙ্গ করা নিষেধ নয় এবং কেউ ভঙ্গ করলে তা কাজা ওয়াজিব নয়।[টিকা-তিরমিযী]
লাইলাতুল কদরের বিবরণ
লাইলাতুল কদর (বেশিরভাগ) রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯) হয়ে থাকে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] যে রাতে লাইলাতুল কদর হয়, সে রাতে জিবরাইল (আ:) একদল ফেরেশতাসহ দুনিয়াতে অবতরণ করেন এবং সে রাতে ইবাদতকারী বান্দাদের জন্য দোয়া করতে থাকেন।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] রমজানের শেষ দশ দিনে বেশি বেশি ইবাদত করার প্রচেষ্টা করবে, এমনকি ইবাদতে নিজ পরিবারের লোকজনকে শামিল করবে।[টিকা-বায়হাকী- আনাস (রা.)] যে ব্যক্তি রমজানের রোযা রাখবে এবং ঈদের নামায পড়বে, আল্লাহ তা’য়ালা তার গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং তার গুনাহ গুলিকে নেকীতে রূপান্তরিত করবেন।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
এতেকাফের বিবরণ
রমজানের শেষ দশ দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বদাই এতেকাফে বসতেন।[টিকা-বায়হাকী- আনাস (রা.)] এতেকাফের জন্য মসজিদের মাঝে পৃথক স্থান নির্দিষ্ট করে নিবে এবং ফজরের নামায পড়ে এ’তেকাফের স্থানে প্রবেশ করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] এতেকাফকারী মসজিদের বাহিরে যাবে না কিন্তু কোন প্রয়োজনীয় কাজের (যেমন পায়খানা ইত্যাদি) জন্য বাইরে যেতে পারে।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] এ’তেকাফকারী রোগীর দেখাশুনা করার জন্য যাওয়া জায়েয নয় কিন্তু পথে চলতে চলতে এ ব্যাপারে দেখাশুনা ও খোজ-খবর নেয়া জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)] তদ্রুপ জানাযার নামাজের জন্য মসজিদের বাহিরে যাওয়া জায়েয নয়।[টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত- আয়েশা (রা.)] এতে’কাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করবে না।[টিকা-সূরা বাকারা : ১৮৭] চুমু দেয়া এবং কোলাকুলি করাও জায়েয নয়।[টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত- আয়েশা (রা.)]
এ’তেকাফকারী মসজিদ হতে মাথা বের করে তা (অন্য কারও দ্বারা) ধুয়ে নেয়া এবং চিরুনীর দ্বারা মাথা আঁচড়িয়ে নেয়া জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ- আয়েশা (রা.)] এ’তেকাফকারী পাপ হতে বিরত থাকে এবং এ’তেকাফের কারণে যে সব নেকীর কাজ করতে সমর্থ হয় না সে সবের নেকীও সে পাবে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- ইবনে আব্বাস (রা.)] এ’তেকাফ করার জন্য রোযা শর্ত নয়। (কিন্তু উত্তম হচ্ছে রোযা রাখা)[টিকা-দারকুতনী, হাকেম- ইবনে আব্বাস (রা.)] কেউ যদি এ’তেকাফ করার মানত মানে তাহলে তা পূরা করা তার জন্য ওয়াজিব।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] মুস্তাহাযা (রক্তপ্রদরবর্তী) স্ত্রীলোকের মসজিদে এ’তেকাফে বসা জায়েয নয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
হজ্বের বিবরণ
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন:
وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا .
অর্থাৎ- মানুষের উপর আল্লাহর এ অধিকার রয়েছে যে, যার এই ঘর পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে সে যেন হজ্ব সম্পন্ন করে।[টিকা-সূরা আলে ইমরান: ৯৭]
হজ্ব জীবনে একবার ফরজ।[টিকা-আহমাদ, নাসাঈ, দারেমী- ইবনে আব্বাস (রা.)] এর অস্বীকারকারী কাফির।[টিকা-আলে ইমরান: ৯৭] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তির সামর্থ থাকার পরও হজ্ব করে না তার এবং ইহুদী ও খৃষ্টানদের মাঝে কোন পার্থক্য নেই।[টিকা-দারেমী, মিশকাত- আবু উমামা (রা.)]
হজ্বের শর্ত
প্রথম শর্ত: মুসলমান হওয়া। কাফিরের উপর হজ্ব ফরজ নয়।[টিকা-মিশকাত]
দ্বিতীয় শর্ত: স্বাধীন হওয়া। দাসের উপর হজ্ব ফরজ নয়।[টিকা-ইবনে আবী শাইবা, বায়হাকী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
তৃতীয় শর্ত: আ’কেল (বুদ্ধিমান) এর উপর হজ্ব ফরজ। পাগল এবং জ্ঞানহীন ব্যক্তির উপর হজ্ব ফরজ নয়।[টিকা-বায়হাকী]
চতুর্থ শর্ত: বয়প্রাপ্তের উপর ফরজ, অপ্রাপ্ত বয়স্কের উপর নয়।[টিকা-তিরমিযী- হযরত আলী (রা.)]
পঞ্চম শর্ত: সুস্থ ব্যক্তির উপর ফরজ, পীড়িত ব্যক্তির উপর ফরজ নয়।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- ইকরামা (রা.)]
ষষ্ঠ শর্ত: যে ব্যক্তি (মক্কা পর্যন্ত) যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের সামর্থ রাখে এবং হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত তার পরিবারবর্গের যাবতীয় খরচ মিটানোর সামর্থ রাখে।[টিকা-আলে ইমরান: ১০ রুকু]
সপ্তম শর্ত: রাস্তায় বিপদাপদের ভয় থাকলে হজ্ব ফরজ নয়।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- ইকরামা (রা.)]
অষ্টম শর্ত: স্ত্রীলোকের সাথ তার স্বামী বা মুহরেম লোক না থাকলে হজ্ব করতে যাবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম ইবনে আব্বাস (রা.)]
হজ্ব ও উমরার ফজিলত
হজ্ব হচ্ছে ইসলামের চতুর্থ রুকন বা স্তম্ভ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)] ঈমানের পরে হজ্ব হচ্ছে উত্তম আমল। যে ব্যক্তি হজ্ব করে এবং বেহুদা কথাবার্তা না বলে তাহলে সে হজ্ব হতে এমন (বেগুনাহ) অবস্থায় ফিরে আসে যেমন অবস্থায় তাকে তার মা ভূমিষ্ট করেছে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] এক উমরা হতে অপর উমরা তার মধ্যবর্তী গুনাহ সুমহের কাফ্ফ্ফারা স্বরূপ এবং মকবুল হজ্বের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] হজ্ব ও উমরা পর্যায়ক্রমে করলে দারিদ্রতা ও গুনাহ এমনভাবে দূর হয় যেমন আগুনে লোহা, সোনা ও চান্দির ময়লা দূর করে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] আল্লাহ আয়ালা হজ্ব এবং উমরাকারীর গুনাহ মাফ করেন এবং তাদের দোয়া কবুল করেন।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি হজ্ব বা উমরার নিয়্যতে বাড়ী হতে বের হয়ে রাস্তায় মৃত্যু রবণ করবে তার জন্য হজ্বকারী এবং উমরাকারীর সমান সওয়াব লিখা হবে।[টিকা-ইবনে মাজাহহ, শোয়াবুল ঈমান- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি কোন হাজী সাহেবের সাতে সাক্ষাৎ করে সে হাজী সাহেব বাড়ীতে প্রবেশ করার পূর্বেই তার জন্য দোয়া করিয়ে নিবে।[টিকা-আহমাদ, মিশকাত-ইবনে উমার (রা.)] রমজান মাসে উমরা করলে হজ্বের সমান নেকী পাওয়া যায়।[টিকা-[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] হজ্বই হচ্ছে মহিলাদের জিহাদ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
উত্তম হজ্ব হচ্ছে সেটাই যাতে উচ্চস্বরে লাব্বাইকা বলা হবে এবং কোরবানীর রক্ত বহিয়ে দেয়া হবে।[টিকা-শরহে সুন্না, মিশকাত- ইবনে উমর (রা.)]
হজ্ব কিভাবে করতে হবে তার বিবরণ
হজ্ব তিন প্রকার, হজ্বে মুফরাদ (ইফরাদ) হজ্বে তামাত্তু এবং হজ্বে কেরান।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) হজ্বে কেরান করেছিলেন, কিন্তু নবী করীম (সা.) এর আকাঙ্ক্ষা ছিল তামাকু করার। (এ কারণেই শাফেয়ী (রহ:, হজ্বে তামাত্তুকে আফজাল বলেছেন। এতে সহজতাও রয়েছে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইহরাম পরে থাকা খুব কষ্টকর।)[টিকা-মুসলিম- জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা.)] হজ্বে তামাত্তু করার ইচ্ছা করলে ইয়ালামলাম নামক পর্বতের নিকটবর্তী হলেই গোসল এবং নিয়্যত করে ইহরাম বাঁধবে এবং পাজামা, জামা, কুর্তা, পাগড়ী এবং টুপি খুলে ফেলবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)] যদি কোন সুগন্ধি পাওয়া যায় তাহলে তা ইহরাম বাঁধার পূর্বেই লাগাবে। রঙ্গিন বা জাফরান দ্বারা রং করা কাপড় পরবে না এবং মোজা পরবে না। যদি জুতা না পাওয়া যায় তাহলে (চামড়ার) মোজার উপরিভাগ টাকনু পর্যন্ত কেটে ফেলে পরিধান করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
ইহরাম অবস্থায় গোসল করা এবং মাথায় পানি ঢালা জায়েয। ইহরাম অবস্থায় কেউ মারা গেলে তাকে সুগন্ধি লাগানো নিষেধ।[টিকা-বুখারী- ইবনে আব্বাস (রা.)] ইমরাম অবস্থায় প্রয়োজন বশত সিঙ্গা (কুলিয়া) লাগানো জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] ইহরাম অবস্থায় মাথা এবং শরীর চুলকানো জায়েয।[টিকা-বুখারী] ইহরাম অবস্থায় যদি নখ ভেঙ্গে যায় তাহলে সেটা কাটা জায়েয।[টিকা-রেহলাতুস সিদ্দীক] ইহরাম অবস্থায় শিকারকৃত পশু ছাড়া অন্য পশু জবেহ করা জায়েয।[টিকা-বুখারী] মুহরেম যদি ভুলবশত জামা পরে ফেলে বা সুগন্ধি লাগায় তাহলে এজন্য কাফ্ফারা দিতে হবে না।[টিকা-বুখারী] মুহরেম ব্যক্তির মাথা এবং মুখ ঢাকা জায়েয নয়। বরং ঐ ব্যক্তি যদি মারা যায় তাহলেও তার মাথা এবং মুখ ঢাকা নিষেধ।[টিকা-মুসলিম, আহমাদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ-ইবনে আব্বাস (রা.)] ইহরাম অবস্থায় সুর্যের তাপের কারণে মাথার উপর ছায়া করা জায়েয।[টিকা-মুসিলম, আহমাদ- উম্মুল হুসাইন (রা.)]
যে ব্যক্তি শাওয়াল মাসে হজ্ব করতে যাবে, সে হজ্বের ইহরাম না বেঁধে উমরার জন্য ইহরাম বাঁধবে।[টিকা-নায়লুল আওতার] ইহরাম অবস্থার মাথার চুল গোন্দ দ্বারা (একপ্রকার আঠা) সেঁটে দেয়া জায়েয যেন তা এলোমেলো হতে না পারে।[টিকা-বুখারী- হাফসা (রা.)] ইহরাম অবস্থায় কাপড়ে যদি খুলক (এক প্রকার সুগন্ধি যা জাফরানের সাথে মিশানো থাকে) লেগে থাকে তাহলে সে কাপড়কে তিন বার ধুয়ে নিবে।[টিকা-বুখারী- সাফওয়ান বিন ইয়ালা (রা.)] ইহরাম অবস্থায় জায়তুন এবং ঘি দ্বারা ঔষধ প্রয়োগ করা জায়েয।[টিকা-বুখারী] মুহরেমের পথিমধ্যে কোরবানী কিনা জায়েয এবং ইহরাম অবস্থায় আংটি পরা জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত] যে ব্যক্তি বাড়ী হতে কোরবানীর পশু সাথে নিয়ে যাবে, সে যখন ইহরাম বাঁধার জায়গায় পৌঁছিবে তখন কুরবানী উট হলে তাতে চিহ্ন দিয়ে নিবে অর্থাৎ উটের কুজের ডান পার্শে একটু ক্ষত করে দিবে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে দিবে এরপর ইহরাম বাধবে।[টিকা-প্রাগুক্ত] ইহরাম অবস্থায় কোরবানীর পশুর উপর সওয়াব হওয়া জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত] ইহরাম অবস্থায় কাউকে পশু শিকারে কোনরূপ সহযোগিতা করা জায়েয নয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] ইহরাম বাঁধা ব্যক্তির কোন শিকারের দিকে ইঙ্গিত করে বলে দেয়া জায়েয নয়।[টিকা-বুখারী- আবু কাতাদা (রা.)] যদি ইহরাম বাঁধা ব্যক্তিকে কেউ জীবিত কোন শিকার উপহার দেয় তাহলে তা গ্রহণ করবে না।[টিকা-বুখারী- আবু কাতাদা (রা.)] ইহরাম পরিধানকারী ব্যক্তির ঔষধ গ্রহণ করা জায়েয এবং মুহরেমের প্রয়োজন বোধে শরীরে দাগ দেয়া জায়েয।[টিকা-বুখারী] মুহরেম প্রয়োজন বোধে গোসল খানায় প্রবেশ করতে পারবে।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ]
যে ব্যক্তি উমরা বা হজ্ব করার জন্য ইহরাম বাঁধার পর তার পা ভেঙ্গে গেল বা কঠিন রোগে আক্রান্ত হবে, সে ইহরাম খুলে ফেলে হালাল হয়ে যাবে এবং আগামী বছর হজ্ব করবে।[টিকা-মুসলিম, আবু দাউদ- জাবের (রা.)] যে ব্যক্তির নিয়াত হজ্ব বা উমরা করা নয় (ব্যবসা করা বা অন্য কিছু) সে বিনা ইহরামে মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে।[টিকা-বুখারী- ইবনে মাসউদ (রা.)] ইহরাম পরা ব্যক্তির সাপ মারা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
উমরাহর ইহরাম মিকাত থেকে হতে হবে এবং যে ব্যক্তি মক্কায় থাকবে সে তানয়ীমে গিয়ে ইহরাম বাঁধবে যা হেরেম শরীফের বাহিরে (এক জায়গা) অতপর সেখান হতে এসে তাওয়াফ ও সায়ী করবে। যে ব্যক্তি মক্কায় না গিয়ে বাড়ী হতে কোরবানী পাঠিয়ে দিবে তার উপর ইহরাম ওয়ালাদের মত সবকিছুই হারাম হবে না।[টিকা-প্রাগুক্ত] যদি ইহরাম বাঁধা ব্যক্তি এ শর্ত করে যে, আমি যেখানেই বাধা পাব (অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে) সেখানেই ইহরাম খুলে ফেলব, তা হলে (এ শর্ত) জায়েয।[টিকা-বুখারী- আয়েশা (রা:)] ইহরাম পরিধান কারিনী মহিলার কুসুমী ও কাল রং এর কাপড় এবং অলংকার পরিধান করা জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত] ইহরাম পরিধানকারী পুরুষ তার স্ত্রীকে চুমা দেয়া, স্পর্শ করা, কামভাবের সাথে ধরা হারাম। বরং কামভাবের সাথে তার দিকে তাকানও উচিৎ নয়।[টিকা-ইযাহুল হুজ্জাত] ইহরাম পরিধানকারী যদি নিজ শরীর বা মাথা হতে উকুন তুলে মাটিতে ফেলে দেয় তাহলে সেটা জায়েয[টিকা-বুখারী]। ইহরাম পরিধানকারীর হেরেমের এলাকার কোন গাছ কাটা বা তার কাঁটা ভাঙ্গা জায়েয নয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
মীকাত বা ইহরাম বাঁধার স্থান
মদীনা শরীফের অধিবাসীদের ইহরাম বাঁধার স্থান হলো জ্বল হোলায়ফা নামক স্থান (বর্তমান নাম আবয়্যারে আলী) এবং শাম বা সিরিয়ার অধিবাসীদের মীকাত হলো জুহফা নামক স্থান। নজদবাসীদের মীকাত কারনুল মানাবেল। ইয়েমেন ও ভারতবাসীদের মিকাত ইয়ালামলাম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] ইরাকের অধিবাসীদের মীকাত জাতে-ইরক এবং পূর্ব দেশীয়দের মীকাত হলো আকীক নামক স্থান।[টিকা-আবু দাউদ] যে ব্যক্তি যে মীকাতের অধীন সে সেখান থেকেই ইহরাম বাঁধবে। এমন কি মক্কার অধিবাসীরা মক্কাতেই ইহরাম বাঁধবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] ভারতের (উপমহাদেশের) লোকেরা ইয়ালামলাম পাহাড়ের নিকটবর্তী হলে ইহরাম বাধবে (জাহাজে হাজীদের-কে এ ব্যাপারে বলে দেয়া হয়।) ফরজ নামাযের সময় কেউ ইহরাম বাঁধলে প্রথমে মায পড়ে নিয়ে পরে ইহরাম বাঁধবে। অন্য সময় হলে ইহরামের জন্য দুই রাকাত নফল নামায পড়বে [টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] এবং উমরাহর নিয়্যত করে বলবে,
اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ بِعُمْرَةٍ .
অর্থাৎ- আল্লাহ আমি উমরাহর উদ্দেশ্যে তোমার নিকট উপস্থিত।
অতপর এ ভাবে তালবিয়া পড়তে থাকবে-
لبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ – لَبَّيْكَ لأَشَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ – إِنَّ الْحَمْدَ والنعمة لك وَالْمُكَ لا شَرِيكَ لَكَ .
অর্থাৎ- আমি তোমার জন্যই হাজির। হে আল্লাহ আমি তোমার খিদমতেই হাজির। তোমার কোন শরীক নাই তোমার সমীপেই আমি উপস্থিত। নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা নিয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র তোমারই জন্য তোমার কোন অংশীদার নাই।[টিকা-প্রাগুক্ত]
এরূপভাবে তালবিয়া হেরেম শরীফে প্রবেশ না করা পর্যন্ত কিংবা হজরে আসওয়াদকে চুম্বন না দেয়া পর্যন্ত বলতে থাকবে। তালবিয়া এভাবেও বলার বিধান রয়েছে-
لبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ – لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ فِي يَدَيْكَ
والرغباء إِلَيْكَ والعمل الصالح –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে হাজির। তোমার খিদমতে হাজির। তোমার হুকুমের বাধ্য। সমস্ত কল্যাণ তোমারই হাতে। হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে হাজির। তোমার প্রতিই আমার সমস্ত আগ্রহ এবং সমস্ত কর্ম (তোমারই জন্য)[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
লাব্বাইকা (তালবিয়া) পড়া শেষ করে এ দোয়া পড়বে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ رِضَاكَ وَالْجَنَّةَ وَاسْتَلْكَ الْعَفْوَ
بِرَحْمَتِكَ مِنَ النَّارِ
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি প্রার্থনা করছি তোমার সন্তুষ্টি ও জান্নাত এবং তোমার রহমতের দ্বারা জাহান্নামের আগুন হতে পরিত্রান চাচ্ছি।[টিকা-মুসনাদে শাফেয়ী- উমারা বিন খুজ্যয়ামা (রা.)]
যখন উঁচু বা নিচু জায়গা অতিক্রম করবে কিংবা যানবাহনের উপর থাকবে তখনও লাব্বাইকা বলবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] যে ব্যক্তি ইয়ালামলাম পাহাড়ের সোজায় যাবার সুযোগ পাবে না, সে পূর্বেই ইহরাম বেঁধে নিবে। কেননা ইহরাম বাঁধার স্থান (মীকাত) এর পূর্বেও ইহরাম বাঁধা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] মহিলাদের ইহরাম হচ্ছে তারা মুখের উপর নিকাব বা পর্দা রাখবে না এবং হাত-মোজা পরবে না এবং জাফরানী রংয়ের জামা পরবে না।[টিকা-বুখারী- আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.)] কিন্তু গায়ের মূহরেম সামনে আসলে মুখের উপর নিকাব বা ঘোমটা দেয়া জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)] ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধি লাগাবে না।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ] স্ত্রীর সংস্পর্শ এবং সমস্ত গুনাহ হতে বিরত থাকবে। নিজেদের মাঝে ঝগড়া বিবাদ করবে না এবং নখ কাটবে না।[টিকা-তিরমিযী] যদি এসব নিষেধকৃত কাজের কোন একটি কেউ করে ফেলে তাহলে ইহরাম বাতিল হয়ে যাবে না, তবে কাফ্ফারা দিতে হবে। আর কাফ্ফারা হলো ছয়জন মিসকিনকে তিন সা’ পরিমাণ (প্রায় সাড়ে সাত কেজি) ফল (বা খাবার) খাওয়াবে। অথবা তিনটি রোজা রাখবে অথবা কোরবানী করবে।[টিকা-সূরা বাকারা: ২৪ রুকু, বুখারী, মুসলিম] ইহরাম অবস্থায় নিজেও বিবাহ করবে না বা অন্য কাউকে বিয়ে করাবে না কিংবা কাউকে, বিয়ের প্রস্তাবও দিবে না।[টিকা-মুসলিম- উসমান (রা.)] ইহরামের অবস্থায় শিকার করবে না। কেহ যদি শিকার করে ফেলে তাহলে দুইজন আলেমের রায়ের ভিত্তিতে শিকার করা পশুর সমপরিমাণ (কাফ্ফারা হিসেবে) দিবে।[টিকা-সূরা আল মায়েদা: ১৩ নং রুকু] অন্যের শিকার করা জন্তুও খাবে না।
কিন্তু যদি শিকারী ব্যক্তি মুহরেম না হয় এবং ইহরাম বাঁধা ব্যক্তির উদ্দেশ্যে শিকার না করে থাকে তাহলে তা খেতে পারবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু কাতাদা (রা.)] মুহরেম ব্যক্তির জন্য নদী বা সমুদ্রের শিকার জায়েয।[টিকা-সূরা আল মায়েদা: ৯৬] মুহরেম ব্যক্তির ফুলের ঘ্রাণ নেয়া, আয়না দেখা, আংটি পরা, হিমানী ব্যবহার, কোমরে বেল্ট বাধা এবং কাপড় চোপড় (ইহরামের) পরিবর্তন করা জায়েয। যখন কাবার নিকটে পৌছবে তখন সম্ভব হলে মক্কায় প্রবেশের জন্য গোসল করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- না’ফে (রা.)] যখন কাবা শরীফের উপর দৃষ্টি পড়বে তখন এ দোয়া পড়বে-
اللَّهُمَّ زِدْ بَيْنَكَ هُذَا تَشْرِيفًا وَتَعْظِيمًا وَتَكْرِيمًا وَمَهَابَةً .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি তোমার এ ঘরের সম্মান, মর্যাদা, সৌন্দর্য ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি কর।[টিকা-মুসনাদে শাফেয়ী- ইবনে জুরাইম (রা.)]
এ দোয়া পড়ার বিধানও এসেছে-
اللَّهُمَّ زِدْ هُذَا الْبَيْتَ تَشْرِيفًا وَتَعْظِيمًا وَمَهَابَةً وَزِدْ مِنْ شرفه وكرمه مِمَّنْ حَجَّه واعتمرَهُ تَكْرِيمًا وَتَشْرِيفًا وَبَرا
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি তোমার এ ঘরের সম্মান, মর্যাদা, সৌন্দর্য এবং প্রভাব আরও বৃদ্ধি কর এবং যে ব্যক্তি তোমার এ ঘরের সম্মান ও মর্যাদা ও নেকীর সাথে হজ্ব এবং উমরা করে তার সম্মান, মর্যাদা বৃদ্ধি করে দাও।[টিকা-প্রাগুক্ত]
যখন মক্কায় প্রবেশ করবে তখন মুয়াল্লার দিকে হতে প্রবেশ করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] বায়তুল্লাহ শরীফে এসেই হজরে আসওয়াদকে চুমা দিবে এবং ডান দিক হতে তওয়াফ শুরু করবে।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] যখন রুকনুল ইয়ামানীতে পৌঁছবে (যা কাবার পশ্চিম দক্ষিণ দিকের কর্ণারের নাম) তখন তাতে হাত দিয়ে চুমা দিবে।[টিকা-বুখারী, নায়লুল আওতার- ইবনে আব্বাস (রা.)] রুকনে ইয়ামানী ও হজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে এই দোয়া পড়বে-
ربُّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عذاب النار
অর্থাৎ- হে আমাদের রব। আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ ও আখেরাতে কল্যাণ দান কর এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে বাঁচাও।[টিকা-আবু দাউদ- আব্দুল্লাহ ইবনে সায়েম (রা.)]
এভাবে হজরে আসওয়াদ পর্যন্ত এক তওয়াফ পুরা হবে। (এভাবে সাত তওয়াফ পূর্ণ করবে)।
প্রথম তিন তওয়াফ বুক ফুলিয়ে দ্রুততার সাথে চলবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] কিন্তু রুকনে ইয়ামানী এবং হজরে আসওয়াদের মধ্যেবর্তী স্থানে নয়। বাকী চার তওয়াফে আস্তে আস্তে চলবে। তাওয়াফ করার সময় চাদর ডান হাতের বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের ওপর রাখবে (এটাকে ইজতিবা বলা হয়)।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ- ইবনে আব্বাস (রা.)] প্রত্যেক তওয়াফে হজরে আসওয়াদকে চুমা দিবে এবং রুকনে ইয়ামানীকে হাত দিয়ে স্পর্শ করবে।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা.)] যদি ভিড়ের কারণে চুমা দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে লাঠির দ্বারা বা কোন কিছুর দ্বারা স্পর্শ করিয়ে তাতে চুমা দিবে। (অথবা হাত দিয়ে ইশারা করবে)।[টিকা-বুখারী, আহমাদ] যখন সাত তওয়াফ দেয়া সমাপ্ত করবে তখন মাকামে ইব্রাহীমে দাঁড়িয়ে এ আয়াত পাঠ করবে-
وَاتَّخِذُوا مِنْ مُقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى – (البقرة : (١٢٥)
অর্থাৎ- তোমরা মাকামে ইব্রাহীমকে নামাযের জায়গা হিসেবে গ্রহণ কর। (সূরা বাকারা: ১২৫)
এখানে দুই রাকাত নামায পড়বে। প্রথম রাকাতে (সূরা ফাতিহার পর) সূরা কাফিরুন পড়বে এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়বে এবং কেরাত স-শব্দে পড়বে।[টিকা-মুসলিম, আহমাদ-নাসাঈ জাবের (রা.)]
অতপর সাফা পাহাড়ের পথ ধরে গিয়ে তার উপর উঠে দাড়িয়ে তিনবার এ দোয়া পাঠ করবে-
لا اله الا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ .
অর্থাৎ- আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তিনি তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং শত্রুর দলসমূহকে তিনি একাই পরাজিত করেছেন।[টিকা-আহমাদ, নাসাঈ- জাবের (রা.)]
অথবা এ দোয়াটি পড়বে কিংবা দোয়া দুটিই পড়বে-
اللَّهُمَّ إِنَّكَ قُلْتَ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ وَإِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ وَإِنِّي أَسْأَلُكَ كَمَا هَدَيْتَنِي لِلإِسْلَامِ أَنْ لَا تَنْزِعَهُ مِنَى حَتَّى تَوَفَّنِي وَأَنَا مُسْلِمٌ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি বলেছ, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব এবং নিশ্চয় তুমি ভঙ্গ কর না ওয়াদা এবং আমি প্রার্থনা করছি, যেমন তুমি আমাকে ইসলামের পথে হিদায়াত দান করেছ, তেমনি তা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিওনা, আমাকে যখন মৃত্যু দিবে তখন যেন আমি মুসলমান থাকি (অর্থাৎ মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে পারি)।[টিকা-মুনতাকাল আখবার- জাবের (রা.)]
অতপর মারওয়া পাহাড়ের দিকে চলবে এবং মিলে-আখজার বা সবুজ চিহ্নিত স্থানের মাঝে দ্রুত চলবে। অতপর যখন মারওয়া পাহাড়ের উপর উঠবে তখন সাফা পাহাড়ের উপর যে দোয়া পড়া হয়েছিল তা পড়বে।[টিকা-আহমাদ, নাসাঈ- জাবের (রা.)] (এটা এক সা’য়ী বা দৌড় হল।) এইভাবে সাত সা’য়ী পূর্ণ করবে, যা শেষ হবে মারওয়া পাহাড়ের উপর।
সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে এ দোয়া পড়বে-
ربِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ .
অর্থাৎ- হে আমার রব! তুমি ক্ষমা কর এবং রহম কর। নিশ্চয় তুমিই সবচেয়ে সম্মানিত মহিমান্বিত।[টিকা-মুনতাকাল আখবার- জাবের (রা.)]
যখন সাত সায়ী বা দৌড় সম্পন্ন হবে তখন উমরা পূর্ণ হবে। তখন এহরাম খুলে ফেলবে মাথার চুল কাটবে এবং সাধারণ কাপড় পরবে এবং মক্কায় অবস্থান করবে।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] এ সময় দিনে বা রাতে যখন ইচ্ছা তওয়াফ করবে ও মুলতাজিম (হজরে আসওয়াদ ও কাবার দরজার মাঝে একটি দেওয়ালের নাম) এবং হাতিম (কাবার সংলগ্ন উত্তর দিকে এক স্থানের নাম যা সামান্য উচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা রয়েছে) এর মাঝে গিয়ে দোয়া করবে। অতপর যে দিন (জিলহজ মাসের) আট তারিখ হবে (যাকে ইয়াওমুততারবিয়া বলা হয়ে থাকে) সেদিন হজ্বের ইহরাম বাধবে এবং বলবে – لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ بِالْحَقِّ অর্থাৎ- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার দরবারে হজ্ব করার জন্য উপস্থিত।’ লাব্বাইকা বলতে বলতে মিনার দিকে যাবে এবং সেথায় পৌঁছে যোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং ফজরের নামায পড়বে।[টিকা-মুসলিম, মুনতাকাল আখবার- আব্দুল্লাহ ইবনে রফী (রা.)] অতপর সূর্যোদয়ের পর সেখান থেকে লাব্বাইকা (তাকবীর) পড়তে পড়তে আরাফায় গিয়ে পৌঁছবে এবং তথায় অবস্থান করবে। সূর্য্য চলার পর (মসজিদে) খুতবা শুনবে এবং যোহর আসর নামায একত্রে (জমা করে) পড়বে। অতপর রাসূলের (সা.) খাস অবস্থান যা জাবালুর-রহমাত নামে পরিচিত সেখানে গিয়ে থাকবে। সেখানে যাওয়া সম্ভব না হলে আরাফার যে কোন স্থানে অবস্থান করবে [টিকা-মুসলিম, আহমাদ, আবু দাউদ] এবং তথায় এসব দোয়া পড়বে-
প্রথম দোয়া:
لا إِلهَ إِلا اللَّهُ وَحْدُهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
অর্থাৎ- আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তার কোন শরীক নেই। তারই জন্য রাজত্ব ও প্রশংসা এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)]
দ্বিতীয় দোয়া:
اللَّهُمْ لَكَ الْحَمْدُ كَالَّذِي تَقُولُ وَخَيْرًا مِمَّا نَقُولُ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা তোমারই জন্য যেমনটা তুমি ইরশাদ করেছ এবং আমরা যা বলি তার চেয়েও উত্তম।[টিকা-তিরমিযী, মুয়াত্তা- আমর ইবনে শোয়াইব (রা.)]
তৃতীয় দোয়া:
اللَّهُمَّ لَكَ صَلُوتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي وَإِلَيْكَ مَا بِي وَلَكَ رَبِّ تُرَاثِي –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ্! আমার নামায, আমার কোরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সবই তোমার জন্য এবং তোমার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন এবং হে আমার রব! তোমার জন্যই মিরাস।[টিকা-তিরমিযী, বায়হাকী]
চতুর্থ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنْ وَسَوَاسِ الصَّدْرِ وَشَتَاتِ الْأَمْرِ
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় চাচ্ছি তোমার নিকট বক্ষের কুমন্ত্রণা হতে এবং কর্মের পেরেশানী হতে।
পঞ্চম দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ مَا تَجِئُ بِهِ الرِّيحُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَجِيءُ بِهِ الرِّيحُ لَا إِلَهَ اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ . لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِ وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْئ قدير
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি প্রার্থনা করছি সে সবের কল্যাণ যা বাতাস বয়ে আনে এবং তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি সে সব হতে, যা বাতাস বয়ে আনে। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই। তিনি একক। তার কোন শরীক নাই। তারই জন্য সমস্ত রাজত্ব, প্রশংসা। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মরণ দেন এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।[টিকা-ইবনে আবী শায়বা- হযরত আলী (রা.)]
ষষ্ঠ দোয়া:
اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِي نُورًا وَفِي سَمْعِي نُورًا وَفِي بصرى نُورًا و فِي وَجْهِي نُورًا –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ। আমার অন্তরকে, আমার কানকে, আমার চক্ষুকে এবং আমার চেহারাকে আলোকিত কর।[টিকা-হিজবুল মাকবুল]
সপ্তম দোয়া:
اللَّهُمَّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسْرْ لِي أَمْرِي وَأَعُوذُبِكَ مِنْ وساوس الصدر وشتاتِ الْأَمْرِ وَفِتْنَةِ الْقَبْرِ
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমার জন্য আমার বক্ষকে খুলে দাও এবং আমার কাজকে সহজ করে দাও। আমি আশ্রয় চাচ্ছি তোমার নিকট বক্ষের সবধরনের কুমন্ত্রণা হতে, কাজের পেরেশানী হতে এবং কবরের ফিতনা হতে।[টিকা-প্রাগুক]
অষ্টম দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُبِكَ مِنْ شَرِّ مَا يَلِجُ فِي اللَّيْلِ وَمِنْ شَرِّ ما يَلِجُ فِي النَّهَارِ وَمِنْ شَرِّ مَا تَهب به الريح وشر بوائق الدَّهْرِ لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ إِنَّمَا الْخَيْرُ خَيْرُ الْآخِرَةِ اللَّهُ أكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ اللهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُكُ وَلَهُ الْحَمْدُ .
অর্থ: হে আল্লহ! আমি আশ্রয় চাচ্ছি তোমার নিকট রাত এবং দিনের সর্ব প্রকার অনিষ্ট অপকর্ম হতে এবং ঐ অনিষ্ট হতে যা বায়ুমন্ডলে বয়ে আনে এবং যুগের বিপদাপদ হতে। আমি হাজির হে আল্লহ। আমি তোমার খিদমতে উপস্থিত। নিশ্চয়ই প্রকৃত কল্যাণ হচ্ছে পরকালের কল্যাণ। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তার কোন শরীক নেই। তারই জন্য রাজত্ব ও সমস্ত প্রশংসা তারই।[টিকা-তবারানী]
নবম দোয়া:
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ حَجًا مَّبْرُورًا وَذَنْبًا مَّغْفُورًا –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! এটাকে তুমি হচ্ছে মাকবুল কর এবং গুনাহ মাফ কর।[টিকা-ইবনে আবী শায়বা]
দশম দোয়া:
اللَّهُمَّ اهْدِنَا بِالْهُدَى وَزِيِّئْنَا بِالتَّقْوَى وَاغْفِرْ لَنَا فِي الآخرة والأولى –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে হিদায়াতের পথ দেখাও এবং আমাদের তাকওয়ার দ্বারা সুশোভিত কর এবং আমাদেরকে ইহকালে ও পরকালে ক্ষমা কর।[টিকা-হিজবুল মাকবুল]
একাদশ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَلْكَ رِزْقًا حَلالاً طَيِّبًا مُبَارَكًا .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে হালাল, পুতপবিত্র, বরকতপূর্ণ রিজিক প্রার্থনা করছি।[টিকা-প্রাগুক্ত]
দ্বাদশ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ أَمَرْتَنِي بِالدُّعَاءِ وَلَكَ الْإِجَابَةُ وَإِنَّكَ لَا تُخْلِفُ المِيعَادَ وَلَا تَنْكِسُ عَهْدَكَ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি আমাকে দোয়া করার জন্য আদেশ করেছ এবং তোমার কাজ হচ্ছে দোয়া কবুল করা। নিশ্চয় তুমি খেলাফ কর না অঙ্গীকার এবং ভঙ্গ করা না তোমার ওয়াদা।[টিকা-হিজবুল মাকবুল]
ত্রয়োদশ দোয়া:
اللَّهُمَّ مَا أَحْبَبْتَ مِنْ خَيْرٍ فَحَبِّبْهُ إِلَيْنَا وَيَسْرِهُ لَنَا وَمَا گرفت مِنْ شَرِّ فَكَرَهُهُ إِلَيْنَا وَلا تَنْزِعُ مِنَّا الإِسْلَامَ بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا – رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! কল্যাণকর যা কিছু তুমি পছন্দ কর তা আমাদের নিকট পছন্দনীয় করে দাও এবং ক্ষতিকর যা কিছু তুমি অপছন্দ কর তা আমাদের নিকট অছন্দনীয় করে দাও এবং আমাদেরকে তা হতে বিরত রাখ। আর হেদায়েত দেয়ার পর ইসলামকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিও না। হে আমাদের প্রভূ! আমাদেরকে দুনিয়াতে ও আখেরাতে কল্যাণ দান কর এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন হতে পরিত্রাণ দাও।[টিকা-তবারানী- ইবনে উমর (রা.)]
চর্তুদশ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ مَا سَأَلَكَ بِهِ نَبِيَّكَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَعُوذُبِكَ مِنْ شَرِّ مَا اسْتَعَاذَ بِهِ نَبِيُّكَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْلَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصلوةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاء – رَبَّنَا اغْفِرْ لِي ولوالدي وَالْمُؤْمِنِين يوم يقوم الحساب .
رب ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا – رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا
ولإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُ غلا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ ولا حول ولا قُوَّةَ الأب
بِالإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ رَبَّنَا إِنَّكَ أَنْتَ. بَنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ : الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তোমার নবী (সা.। তোমার নিকট যে কল্যাণ চেয়েছেন আমি সেই কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর তোমার নবী (সা.) তোমার নিকট যে অকল্যাণ-অমঙ্গল হতে আশ্রয় চেয়েছেন আমি তা হতে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আমাদের প্রভু! আমরা আমাদের জীবনের উপর জুলুম করেছি, এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা এবং রহম না কর তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্গত হবো। হে রব! আমাকে ও আমার বংশধরকে নামায প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে গড়ে তুল। হে আমাদের রব! তুমি দোয়া কবুল কর। হে আমাদের প্রভু! আমাকে, আমার পিতামাতাকে ও মুমিনদেরকে হিসাবের দিন ক্ষমা করিও। হে রব! তুমি তাদের প্রতি (পিতামাতার প্রতি) করুনা কর যেমন তারা আমার প্রতি করুনা করেছিল ছোট অবস্থায় প্রতিপালন করার সময়। হে আমাদের রব। আমাদের ক্ষমা কর এবং যে সব ভাই আমাদের পূর্বে ঈমানের সাথে চলে গেছে তাদের ক্ষমা কর এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোন গ্লানি রেখ না, হে আমাদের প্রভূ! তুমি নিশ্চয় সহিষ্ণু দয়ালু। হে আমাদের রব! নিশ্চয় তুমি শ্রবনকারী ও সবকিছুর জ্ঞাতা এবং ভূমি আমাদের তওবা কবুল কর। নিশ্চয় তুমি তাওবা কবুলকারী দয়ালু। (কারও) কোন সাধ্য ও শক্তি নাই (ভাল কাজ করার বা মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার) মহান আল্লাহ পাকের মর্জি ব্যতীত।[টিকা-শরহে মানাসেক, হিজবুল মাকবুল- ইবনে জুবাইর (রা)]
পঞ্চদশ দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ وَتَرَى مَكَانِي وَتَسْمَعُ كَلَامِي وَتَعْلَمُ سرى وَعَلانِيَتِي وَلَا يَخْفَى عَلَيْكَ شَيْءٌ مِنْ أَمْرِي وَأَنَا الْبَائِسُ الْفَقِيرُ الْمُسْتَغِيثُ الْمُسْتَجِيرُ الْوَجِلُ الْمُشْفِقُ
الْمُقِرُّ الْمُعْتَرِفُ بِذَنْبِي أسألك مسألة المسكين وابتهل إليكَ ابْتِهَالَ الْمُذْنِبِ الدَّلِيلِ وَأَدْعُوكَ دُعَاءَ الْخَائِفِ الضرير من خَضَعَتْ لك رقبته وَفَاضَتْ لَكَ عَيْنَاهُ وَنَحل لكَ جَسَدُهُ وَرَغمَ لَكَ أَنْفُه .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! নিশ্চয় তুমি জান এবং দেখছ আমার অবস্থান এবং শুনছ আমার কথা এবং জান আমার গোপন ও প্রকাশ্য কাজকর্ম এবং আমার কোন কাজই তোমার নিকট গোপন নয়। আর আমি বিপদগ্রন্থ, ভিক্ষুক, আবেদনকারী, আশ্রয়কামী, ভীত, সন্ত্রস্ত আমার অপরাধ স্বীকার করছি, তোমার নিকট ভিখারীর মত প্রার্থনা করছি এবং লজ্জিত অপরাধীর মত কাকুতি মিনতি করছি এবং তোমার নিকট বিপদগ্রস্ত ভীত ব্যক্তির ন্যায়, যে তোমার দরবারে মাথা নত করেছে এবং তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, তোমার জন্য শরীরকে কৃষ্ণকায় করেছে এবং তোমার জন্য তার নাককে ধুলায় ধুসরিত করেছে, তার মত দোয়া করছি।[টিকা-তবারানী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
ষোড়শ দোয়া:
اللَّهُمَّ لَا تَجْعَلْنِي بِدُعَاءِكَ رَبِّ شَقِيًّا وَكُنْ بِي رَؤُوفًا رحِيمًا يَا خَيْرَ الْمَسْئُولِينَ يَا خَيْرَ الْمُعْطِينَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ – أَمِينَ – لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لأَشَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شيئ قدير – (مائة مرة)
قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ – (السورة مائة مرة)
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى ابراهيم وعلى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ وَعَلَيْنَا
معهم – ( مائة مرة)
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এমন করো না যে, তোমাকে ডাকার পরও অভাগা থাকি এবং আমার প্রতি সহিষ্ণু এবং করুনাশীল হও, হে প্রার্থনাকারীদের কল্যাণদাতা, হে উত্তম দাতা, হে দয়ার সাগর! এবং সমস্ত প্রশংসা একমাত্র মহান রব্বুল আলামীনের জন্য। (হে আল্লাহ) তুমি আমার এ প্রার্থনা কবুল কর। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তার কোন শরীক নেই। তারই জন্য সমস্ত রাজত্ব ও প্রশংসা এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতা বান। (একশতবার)। সূরা ইখলাস (একশত বার)। হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (স:) ও তার বংশধরদের উপর করুনা বর্ষণ কর, যেমন ইব্রাহীম ও তার বংশধরদের উপর করুনা বর্ষণ করেছ। নিশ্চয় তুমি খুবই প্রশংসনীয় এবং সম্মানিত এবং এদের সাথে আমাদের উপরও করুনা বর্ষণ কর (একশত বার)।
সুর্যাস্ত পর্যন্ত এসব দোয়া পড়তে থাকবে।[টিকা-বায়হাকী, শোয়াবুল ঈমান]
আরাফাতে দন্ডায়মান হওয়া (অবস্থান করা) হজ্বের একটি প্রধান রুকন। যে ব্যক্তির এ রুকন বাদ পড়বে তার হজ্ব হবে না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- ইমর ইবনে জুবাইর (রা.)] যে ব্যক্তি জিলহজ মাসের দশ তারিখের ফজরের পূর্বেই আরাফাতের ময়দানে দন্ডায়মান হতে পারবে তার হজ্ব পুরো হয়ে যাবে। আরাফার মাঠে যে কোন স্থানে অবস্থান হলেই ফরজ আদায় হয়ে যাবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ] রাসূলুল্লাহ (সা.) এর অবস্থানের নির্দিষ্ট জয়গায় (অর্থাৎ জাবালে রহমাতে) অবস্থান করা সুন্নাত।[টিকা-মুসলিম-জাবের (রা.)] সূর্যাস্তের পর আরাফার মাঠ হতে ‘লাব্বাইকা’ বলতে বলতে মুজদালেফায় এসে পৌছাবে এবং মাগরিব ও এশার নামায এক আযান এবং দুই ইকামতে সুন্নাত ছাড়া জমা করে পড়বে এবং সেথায় উক্ত রাত্রি যাপন করবে।[টিকা-প্রাগুক্ত] অতপর সুবহে সাদেক শুরু হতেই এক আযান ও এক একামতের সাথে ফজরের নামায পড়বে। অতপর সেখান হতে যানবাহনে আরোহন করে বা পায়ে হেঁটে মাশআ’রুল হারামে (মুজদালেফার একটি পাহাড়) এসে পৌঁছবে এবং কিবলামুখী হয়ে দোয়া, তাকবীর এবং তাহলীল পড়তে থাকবে। সেখানে পূর্বাকাশ খুব ফর্সা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং সূর্যোদয়ের পূর্বেই মিনার দিকে চলতে শুরু করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- হিশাম বিন উরওয়া (রা.)] আরোহী হলে সেটাকে দ্রুত চালাবে না বরং আন্তে আস্তে চালাবে। তবে যদি কোথাও ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায় তাহলে সামান্য জোরে চালাবে এবং যখন বাতনে মাহশারে পৌঁছিবে (যা মিনার পার্শ্বে একটি প্রান্তর, তথায় আসহাবে ফীল বা হস্তীওয়ালা আব্রাহা ও তার সাথীরা ধ্বংস হয়েছিল) তখন সোয়ারীকে দ্রুত চালাবে।[টিকা্-মুসলিম] যদি মহিলা এবং বাচ্চা কাচ্চাদেরকে সুবহে সাদেকেই মিনার পথে রওয়ানা করিয়ে দেয়া হয় তাহলে তা জায়েয। যেন মহিলারা মিনায় গিয়ে ভিড় এড়াবার ভয়ে সূর্যোদয়ের পূর্বেই কংকর (পাথর) মারার কাজ সমাধা করতে পারে। পথিমধ্যে সাতটি কংকর সংগ্রহ করে নিবে।[টিকা-প্রাগুক্ত] (কেউ কেউ সব কয়দিনের জন্যই তথা হতে কংকর সংগ্রহ করে নেয়)। এ পথ দিয়ে জামরায়ে আকাবাতে এসে (যা মক্কার দিকে অবস্থিত) সূর্যোদয়ের পর কংকর মারবে এভাবে যেন মিনা ডান দিকে এবং কা’বা শরীফ বাম দিকে থাকে এবং প্রত্যেক কংকর মারার সময় তাকবীর বলবে এবং এ দোয়া পড়বে।
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ حَجًا مُبْرُورًا وَذَنْبًا مَغْفُورًا –
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তুমি এ হজ্জ কবুল কর এবং যাবতীয় গুনাহ-রাশিকে মাফ কর।[টিকা-বুখারী, মুসলিম]
এখন হতে লাব্বাইকা বলা বন্ধ করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম -ইবনে মাসউদ (রা.)] এর স্থলে মিনার দিনগুলিতে তরুবীর (ঈদের তকবীর) বলতে থাকবে।[টিকা-আহমাদ- ইবনে মাসউদ (রা.)] এই দিন অন্যান্য জামরাতে (পাথর মারার স্থানে) পাথর মারবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উসামা বিন জায়েদ (রা.)] অতপর মসজিদে খাইফে এসে ঈদের খুতবা শুনবে এবং নামাযান্তে কুরবানী করবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ- হেরমাস বিন জিয়াদ (রা.)] কুরবানীর পশু ছাগল হলে দুই বছরের নির্দোষ ছাগাল, দুম্বা এক বছর বয়সের এবং উট পাঁচ বছর বয়সের হতে হবে।[টিকা-মুসলিম] উট ও গরুতে সাতজন পর্যন্ত লোক একত্রে শরীফ হয়ে কুরবানী দিলে পারে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- হযরত আলী (রা.)] কুরবানীর চামড়া এবং ঝুল (পশুর গায়ে বা পিঠে যে সব জিনিস থাকে) কসাইকে মজুরী হিসেবে দিবে না। বরং তা সাদকা করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] অতপর মাথার চুল নাড়া করবে বা তা খাটো করবে।[টিকা-আবু দাউদ, দারেমী] কিন্তু মহিলারা শুধুমাত্র চুল (চুলের আগা) সামান্য কাটবে।[টিকা-শরহিসসুন্নাহ। আয়েশা (রা.)] এখন এর জন্য একমাত্র স্ত্রী সহবাস ছাড়া যা কিছু মুহরেনের উপর হারাম ছিল তা হালাল হয়ে গেল এবং স্ত্রী সহবাস করা তওয়াফে জিয়ারতের পর হালাল হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] অতপর তওয়াফে জিয়ারতের জন্য কাবা শরীফ যাবে (তওয়াফে যিয়ারতকে তওয়াফে কাবা, তওয়াফে ফরজ বলা হয়ে থাকে। এটা হজ্বের একটি বড় ফরজ ও, গুরুত্বপূর্ণ রুকন।) এবং রীতিমত তওয়াফ করবে এবং সাফা মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করবে এবং জমজমের পানি পান করবে।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] যদি কেহ কংকর নিক্ষেপের পূর্বে মাথা মুন্ডান করে বা কুরবানী করে কিংবা কাবা শরীফে তওয়াফের জন্য যায় তাহলে কোন অসুবিধা নেই।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা)] কিন্তু উল্লেখিত তারতীব অনুযায়ী (ক্রমানুসারে) কাজগুলি সম্পন্ন করাই সুন্নাত।)অতপর সেদিনই মিনায় প্রত্যাবর্তন করবে এবং তথায় তিনদিন থাকবে। প্রতিদিন সূর্য চলার পর তিন জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করবে। প্রথম জামরাতে পাথর মেরে তার পার্শবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে আল্লাহর দরবারে কাকুতি মিনতির সাথে দোয়া করবে। এভাবেই দ্বিতীয় জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করবে। তৃতীয় জামরাতে কংকর মেরে আর দাঁড়াবে না।অতপর ১৩ই জিলহজে মক্কা চলে আসবে এবং সেখানে যতদিন ইচ্ছা অবস্থান করবে।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] আবার যখন বাড়ী আসার বা মদিনা যাবার ইচ্ছা করবে তখন এক তওয়াফ করবে (এটাকে তওয়াফে বেদা বলা হয়।)
হায়েযের অবস্থায় মহিলাদের জন্য এ তওয়াফ করা মাফ। এ তওয়াফে সাফা মারওয়াতে সায়ী করতে হবে না এবং খুব দ্রুততার সাথে তওয়াফ করতে হবে না (এটা হচ্ছে তামাত্তুর বিবরণ)।[টিকা-বুখারী, মুসলিম)] হজ্বে মুফরাদ করলে ইহরাম বাঁধার জায়গা হতে নিয়মমত হজ্বের ইহরাম এবং উচ্চস্বরে لبيك بالحج বাঁধবে বলবে।[টিকা-বুখারী- জাবের (রা.)] মক্কা শরীফে এসে নিয়ম মত তওয়াফ করবে এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করবে এবং (এহরাম খুলে) হালাল হবে না। অতপর ৮ই জিলহজে মিনায় যাবে এবং আরাফার কাজ সমাপ্ত করে ১০ই জিলহজে মক্কায় তওয়াফে জিয়ারত করবে এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝে সা’য়ী করবে। এর মাঝে ও হজ্বে তামাকুর মাঝে পার্থক্য হচ্ছে এতে হজ্ব হতে ফারেগ হয়ে উমরা করবে এবং হজ্বে তামাত্তুতে প্রথমে উমরা করে হালাল হয়ে যাবে অতপর ৮ই জিলহজে নতুন করে ইহরাম বেঁধে হজ্ব করবে এবং এতে কুরবানী করা ওয়াজিব।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা.)] হজ্বে কেরানে হজ্ব ও উমরার এক সাথেই নিয়্যত করবে এবং দুইটার জন্যই এহরাম বেঁধে থাকবে হজ্ব সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত। হজ্ব সমাপ্ত করার পর ইহরাম খুলবে।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
হজ্বের আরকানের বিবরণ
হজ্বের আরকান হচ্ছে তিনটি। প্রথমত: মিকাত হতে ইহরাম বাঁধা। দ্বিতীয়ত: আরাফাতে দন্ডায়মান হওয়া ১০ই জিলহজ্বের সুবহে সাদেকের পুর্বেই, যদিও তা এক ঘন্টার জন্যও হয়। তৃতীয়ত: তাওয়াফে জিয়ারত করা। জমহুরে উলামা সাফা ও মারওয়ার সা’য়ীকেও রুকন বলে পরিগণিত করেছেন। যদি এসব আরকানের মাঝে কোন রুকন বাদ পড়ে যায় তাহলে হজ্ব হবে না।[টিকা-শরহে সহীহ মুসলিম]
মদীনার হেরেমের ফজিলত
মক্কা শরীফ যেমন পবিত্র, মদীনাও তেমনি পবিত্র। মক্কা শরীফের মত মদীনাকেও সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে। মদীনাতেও একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা, রক্তপাত করা, শিকার করা এবং গাছপালা কাটা জায়েয নয়। তবে একমাত্র প্রাণীর খাদ্য স্বরূপ গাছপালার পাতা কাটা জায়েয।[টিকা-মিশকাত]
মদীনার ফলমুলের ফজিলত
মদীনার ফলমূলে মক্কার ফলমুল হতে দ্বিগুণ বরকত।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] মদীনার এক সের আনাজ-ফল যতজন লোকের জন্য যথেষ্ট হয় মক্কার একসের আনাজে ততজনের তৃপ্তি মিটে না।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] মদিনার সা’ এবং মুদে বরকত রয়েছে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)]
মক্কা শরীফের ফজিলত
মক্কা শরীফ সমস্ত দুনিয়ার মাঝে উত্তম স্থান।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ] মক্কার হেরেমের কোন গাছপালা উৎপাটন বা কাটা জায়েয নয়। কিন্তু এজখার নামক (সুগন্ধি) গাছ কাটা জায়েয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম] মক্কার হেরেমের মধ্যে পাঁচ প্রকার কষ্টদায়ক প্রাণী যথা- কাক, চিল, বিচ্ছু, কুকুর (যা কামড়ায়) এবং ইঁদুর মারা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] হেরেমের মধ্যে শিকার করা জায়েয নয় এবং হেরেম শরীফের মধ্যে কোন হারান বস্তু যে ব্যক্তি প্রকৃত মালিকের নিকট পৌঁছার জন্য সর্বদা ঘোষণা করে সে উঠাতে পারবে অন্য কেউ নয় এবং মক্কায় কিয়ামত পর্যন্ত যুদ্ধ-বিগ্রহ করা হারাম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবয়ে আব্বাস (রা.)]
বায়তুল্লাহ শরীফে ইবাদত করার ফজিলত
যে ব্যক্তি কাবা ঘরে রমজান মাস পুরা রোযা রাখবে এবং সাধ্যমত রাতে কেয়াম করবে (তারাবীহ পড়বে) আল্লাহ তায়ালা তাকে এক লাখ মাস রোযা রাখার সওয়াব দান করবেন।[টিকা-ইবনে মাজাহ, তারগীর ফারহীব- ইবনে আব্বাস (রা.)] বায়তুল্লাহ শরীফে এক রাকাত নামাযের সওয়াব ৫৫ বছর ৬ মাস ২০ রাত নামাযের সওয়াবের সমান এবং তথায় ৫ ওয়াক্ত নামাযের সওয়াব দুইশত সত্তর বছর নয় মাস দশ রাত নামাযের সওয়াবের সমান।[টিকা-আহমাদ বায়হাকী- ইবনে জুবাইর (রা.)]
মসজিদে নববীতে ইবাদত করার ফজিলত
মসজিদে নববীতে এক ওয়াক্ত নামায পড়ার সওয়াব ২৭ বছর ৯ মাস ১০ দিন নামায পড়ার সওয়াবের সমান।[টিকা-প্রাগুক্ত]
দজ এর ফজিলত
দজ (তায়েফের একটি জংগল) হেরেমের অন্তর্ভুক্ত এবং সেখানে শিকার করা এবং তার গাছ পালা কাটা নিষেধ।[টিকা-আবু দাউদ- জুবাইর (রা.)]
তওয়াফ করলে যে সওয়াব হয় তার বর্ণনা
যে ব্যক্তি সাতদিন পর্যন্ত কাবা ঘর তওয়াফ করে এবং এ সপ্তাহে কোন অনর্থক কথাবার্তা হতে বিরত থাকে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাকে একজন গোলাম আযাদ করার সওয়াব দিবেন।[টিকা-তবারানী, হাকেম- ইবনে আব্বাস (রা.)] মসজিদুল হারামে দিন রাতে ১২০টি রহান নাজিল হয়। ৬০টি তওয়াফকারীদের জন্য, ৪০টি নামায আদায়কারীদের জন্য এবং ২০টি কাবাঘর দর্শণ কারীদের জন্য।[টিকা-ইবনে খুজায়মা- ইবনে উমর (রা.)]
যে ব্যক্তি তওয়াফ করলো এবং দুই রাকাত নামায পড়লো সে যেন একটি গোলাম আযাদ করলো। এক সপ্তাহ তওয়াফ করলে প্রত্যেক পদক্ষেপ উঠানো এবং নামানোতে একটি করে গুনাহ মাফ হয়, আমল নামায় একটি করে নেকী লিখা হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।[টিকা-তিরমিযী- উবাইদ বিন উমাইর (রা.)] ৫০ বার কাবাঘর তওয়াফ কারী গুনাহ হতে এমনভাবে পবিত্র হয় যেন তার মা তাকে সদ্য প্রসব করেছে।[টিকা-তিরমিযী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ী করার সওয়াব
সাফা ও মারওয়ার মাঝে দৌড়ালে (সায়ী করলে) সত্তরটি গোলাম আযাদ করার সওয়াব পাওয়া যায়।[টিকা-ইবনে হিব্বান- ইবনে আব্বাস (রা.)] যে ব্যক্তি সাফা ও মারওয়ার মাঝে দৌড়াবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার পদদ্বয়কে পুলসেরাত পার হবার সময় পদস্খলন হতে রক্ষা করবেন।[টিকা-তবারানী- ইবনে উমর (রা.)]
হজরে আসওয়াদকে চুম্বনের সওয়াব
যে ব্যক্তি হজরে আসওয়াদকে চুম্বন দিবে, কিয়ামতের দিন হজরে আসওয়াদ সে লোকের ঈমানের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেবে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, দারেমী- ইবনে আব্বাস (রা.)] হজরে আসওয়াদে ও রুকনে ইয়ামানীতে হাত লাগালে গুনাহ মাফ হয়।[টিকা-তিরমিযী- উবাইদ বিন উমাইর (রা.)] যে ব্যক্তি হজরে আসওয়াদকে চুমু দিবে, কিয়ামতের দিন হজরে আসওয়াদ তার ব্যাপারে সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল হবে।[টিকা-রেহলাতুস সিদ্দীক- ইবনে আব্বাস (রা.)]
রুকনে ইয়ামানীতে দোয়া করার বিবরণ
রুকনে ইয়ামানীতে সত্তর জন ফেরেশতা নিযুক্ত আছেন। যে ব্যক্তি রুকনে ইয়ামানীর নিকট এ দোয়া পড়ে ফেরেশতারা তার দোয়ার সাথে ‘আমীন’ বলে থাকেন।
দোয়া:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالثَّافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ربَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট ইহকাল ও পরকালে ক্ষমা ও কল্যাণ কামনা করছি। হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ ও আখেরাতে কল্যাণ দাও এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে রক্ষা কর।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)]
মুলতাজিমের পার্শে দোয়া করলে আরোগ্যলাভ হয় তার বিবরণ
মূলতাজিমের পাশে কোন ব্যক্তি এমনকি রুগ্ন ব্যক্তি যদি দোয়া করে তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে রোগ হতে আরোগ্য দান করেন।[টিকা-তবারানী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
জমজমের পানির ফজিলতের বর্ণনা
দুনিয়ার সমস্ত পানি হতে জমজমের পানি উত্তম।[টিকা-ইবনে হিব্বান- ইবনে আব্বাস (রা.)] জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয় আল্লাহ তায়ালা সে উদ্দেশ্য পূরণ করে থাকেন। যদি রোগ মুক্তির উদ্দেশ্যে পান করে তাহলে আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন। যদি আল্লাহর আশ্রয় অনুগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে পান করে তাহলে আল্লাহ তাকে আশ্রয়-অনুগ্রহ দান করেন। কেহ যদি তৃষ্ণা নিবারণের উদ্দেশ্যে পান করে তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার তৃষ্ণা দূর করেন।[টিকা-ইবনে হিব্বান- ইবনে আব্বাস (রা.)]
জমজমের পানি পান করার সময় এ দোয়া পড়বে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَاسِعًا وَشِفَاءٌ مِّنْ كُلِّ دَاء .
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক এবং সর্বপ্রকার রোগ হতে আরোগ্য প্রার্থনা করছি।[টিকা-হাকেম, দারকুতনী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
জমজমের পানিতে আল্লাহ তা’আলা এত বরকত রেখেছেন যে, কেহ যদি ক্ষুধা নিবারণের জন্য তা পান করে তাহলে তার ক্ষুধা দূর হয়ে যায়।[টিকা-মুসলিম- আবু যর (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) জমজমের পানি উপহার দিতেন।[টিকা-রেহলাতুস সিদ্দীক- ইবনে আব্বাস (রা.)] মুনাফিক ও মুমিনের মাঝে পার্থক্য এই যে, মুনাফিক জমজমের পানি পেট ভর্তি করে পান করে না এবং মুমিন ব্যক্তি ভালভাবে পেট পূর্ণ করে তা পান করে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- ইবনে আব্বাস (রা.)] জমজমের পানি পান করার সময় দোয়া কবুল হয়।[টিকা-হাকেম- ইবনে আব্বাস (রা.)]
যে ব্যক্তির উপর হজ্ব ফরজ হয় তাকে তাড়াতাড়ি হজ্বে যেতে হবে তার বিবরণ
যখন কারও উপর হজ্ব ফরজ হয় তখন তা আদায় করার জন্য তাড়াতাড়ি করবে। এজন্য যে, মানুষ কখনো রোগাক্রান্ত হয়ে যায় আবার কখনো অভাব অনটনে পড়তে পারে। হযরত উমর (রা.) বলেন, আমার ইচ্ছা হয় আমি কিছু লোক নিয়োগ করি যারা আমার রাজ্যে হজ্ব ফরজ হওয়ার পরও হজ্ব করে না তাদের উপর জিযিয়া কর নির্ধারণ করুক, কেননা এরা মুসলমান নয়।[টিকা-রেহলাতুস সিদ্দীক]
হজ্বের মানত করলে তা আদায় করার বিবরণ
কেহ যদি হজ্ব করার জন্য নযর মানে (মানত করে) এবং মানত আদায় করার পূর্বেই মারা যায়, তাহলে তার পক্ষ হতে তার ওয়ারিসের উপর হজ্ব করা জরুরী হয়ে দাঁড়ায়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)]
আত্মীয় স্বজনের পক্ষ হতে হজ্ব করার বিবরণ
যে ব্যক্তির হজ্ব করার (শারীরিক) সামর্থ নাই, তার পক্ষ হতে যদি তার আত্মীয় স্বজনের কেউ হজ্ব করে তা’হলে তা জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত]
হজ্বে যাওয়ার সওয়াবের বিবরণ
হাজী সাহেবদের উটের প্রতি পদক্ষেপে আল্লাহ তা’আলা একটি করে নেকী দান করেন এবং একটি করে গুনাহ মাফ করেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করে থাকেন।[টিকা-বায়হাকী- ইবনে উমর (রা.)] হজ্ব ও উমরাকারী আল্লাহ তায়ালার মেহমান। যদি আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করে তাহলে তা কবুল করেন। আর যদি গুনাহ মাফের দোয়া করে তাহলে আল্লাহ গুনাহ মাফ করে দেন।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি হজ্ব করতে আপন মাল খরচ করে, আল্লাহ তায়ালা তার এক দিরহামে (বা টাকায়) সাতশ দিরহামের সওয়াব দিয়ে থাকেন।[টিকা-রেহলাতুস সিদ্দীক]
হারাম মাল দ্বারা হজ্ব কবুল না হবার বিবরণ
যে ব্যক্তি হারাম মাল দ্বারা হজ্ব করে তার হজ্ব কবুল হয় না। হারাম মাল দ্বারা হজ্বকারী যখন লাব্বাইকা বলে অর্থাৎ বলে হে আল্লাহ আমি তোমার খিদমতে হাজির তখন জবাবে আল্লাহ বলেন, লা লাব্বাইকা অর্থাৎ তুমি আমার খিদমতে হাজির নও। তোমার সম্পদ অবৈধ পন্থায় অর্জিত। তোমার সোয়ারী, তোমার কাপড় চোপড় হারাম পন্থায় অর্জিত। তুমি’ তোমার গুনাহ সমেত ফিরে যাও। তোমার গুনাহ মাফ হবে না।[টিকা-মুসনাদে দাইলামী- হযরত উমর (রা.)]
হজ্ব ও উমরার বিভিন্ন রকম মাসআলার বর্ণনা
হজ্বের নিয়্যত ভঙ্গ করে উমরার নিয়্যত করা জায়েয। অর্থাৎ কেহ মুফরাদ, হজ্বের নিয়্যত করেছিল, সে যদি সেটা ভঙ্গ করে তামাত্তুর নিয়্যত করে তাহলে জায়েয।[টিকা-মুসলিম- আতা (রা.)]
হজ্বে যাবার সময় ভাললোকদের সঙ্গী হবার চেষ্টা করবে।[টিকা-রেহলাতুস্ সিদ্দীক] উমরা বছরের যে কোন সময় করা যায়।[টিকা-মুসনাদে শাফেয়ী, নায়লুল আওতার- আলী (রা.)] যখন হজ্ব বা উমরা হতে ফিরবে তখন প্রত্যেক উঁচু জায়গায় তিনবার আল্লাহ আকবার বলবে এবং এ দোয়া পড়বে-
لا اله الا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ – أنبُونَ تَائِبُونَ عَابِدُونَ ساجِدُونَ لِرَبِّنَا حَامِدُونَ ، صَدَقَ اللَّهُ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وهزم الأحزاب وحده –
অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তার কোন শরীক নেই। তারই জন্য সমস্ত রাজত্ব ও প্রশংসা এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদতকারী, সিজদাকারী, আমাদের রবের প্রশংসাকারী। আল্লাহ তার ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই কাফেরদের দলকে পরাজিত করেছেন।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)]
বিবাহের ফজিলত
বিবাহ করা গুনাহ হতে বাঁচার একটি উত্তম মাধ্যম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে মাসউদ (রা.)] দুনিয়ার সর্বোত্তম ফায়েদা বা উপকারের সামগ্রী হচ্ছে সচ্চরিত্রবতী মহিলা।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] যে ব্যক্তি জেনা (ব্যভিচার) হতে বাঁচার উদ্দেশ্যে বিবাহ করে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন।[টিকা-তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)] বিবাহ না করার কারণে দুনিয়াতে ফিতনা ফাসাদ (অশ্লীলতা) বৃদ্ধি পায়।[টিকা-তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] স্বামী স্ত্রীর মাঝে যেমন প্রগাঢ় ভালবাসা ও আন্তরিকতা হয় অন্য কারও মাঝে তা হয় না।[টিকা-ইবনে মাজাহ- ইবনে আব্বাস (রা.)] বিবাহ করা দ্বীনের (ধর্মের) অর্ধেক অঙ্গ।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান- আনাস (রা.)]
পুরুষদের জন্য মহিলাদের চেয়ে বড় ফিতনা আর কিছুই নাই।[টিকা-মুসলিম- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] কুমারী মহিলাকে বিবাহ করাই উত্তম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জাবের (রা.)] মাল, সৌন্দর্য ও বংশের দিকে লক্ষ্য না করে দ্বীনদার মহিলাকে বিয়ে করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] অধিক সন্তান জন্মদানকারী মহিলাকে বিবাহ করা উত্তম।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ- মা’কেল ইবনে ইয়াসার (রা.)] মুসলমানের জন্য নেককার মহিলার চেয়ে উপকারী বস্তু আর কিছু নাই।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আনাস (রা.)] যে বিবাহে অল্প ব্যয় হয় তাতেই বেশি বরকত।
সতরের বিবরণ
যে মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করবে তাকে দেখে নিবে, কেননা এতে ভালবাসা সৃষ্টি হয়।[টিকা-তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ- মুগীরা (রা.)] পুরুষ লোক পুরুষলোককের সতর দেখা এবং মেয়েলোক মেয়েলোকের সতর দেখা এবং কোন পুরুষ অপর পুরুষের সাথে (উলঙ্গ হয়ে) একই কাপড়ে শোয়া এবং কোন মহিলা অপর কোন মহিলার সাথে (উলঙ্গ হয়ে) একই কাপড়ে শোয়া নিষেধ।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান- হযরত আয়েশা (রা.)] কোন মহিলার সাথে কোন গায়ের মুহরেম ব্যক্তির (যার সাথে বাহ করা জায়েয) একাকী রাত্রী যাপন করা নিষেধ।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] হঠাৎ কোন মহিলার উপর দৃষ্টি পড়ে গেলে কোন গুনাহ হবে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বিতীয়বার দেখা নিষেধ।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী, আবু দাউদ, দারেমী- বুরাইদা (রা.)] যদি কেউ কোন মহিলাকে দেখে আকৃষ্ট হয় তাহলে সে যেন তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে নেয়।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] যদি কেউ তার ক্রীতদাসীর অন্যত্র বিবাহ দিয়ে দেয় তাহলে আর সে তার সতর দেখতে পারবে না।[টিকা-আবু দাউদ- আমর ইবনে শোয়াইব (রা.)] বিনা প্রয়োজনে উলঙ্গ হওয়া জায়েয নহে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে- উমর (রা.)] মেয়েলোক অন্ধ পুরুষলোক হতে এভাবে পর্দা করবে যেমন চোখ ওয়ালা লোক হতে করে থাকে।[টিকা-আহমদ, তিরমিযী, আবু দাউদ- উম্মে সালমা (রা.)] পর মহিলার সাথে একাকী হওয়া জায়েয নহে।[টিকা-তিরমিযী- হযরত উমর (রা.)] ক্রীতদাস হতে পর্দা করতে হবে না।[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- রাহজ ইবনে হাকীম (রা.)] স্ত্রীলোকদের নপুংসক হতেও পর্দা করা উচিৎ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- উম্মে সালামা (রা.)] ইচ্ছাকৃত ভাবে অন্যকে যে নিজের সতর (গুপ্তাঙ্গ) দেখায় এবং যে দেখে তারা উভয়েই অভিশপ্ত।[টিকা-বায়হাকী, মিশকাত- হাসান (রা.)]
বিবাহের সময় পাত্রীর অনুমতির বর্ণনা
বিবাহের সময় পাত্রী কুমারী হোক বা পূর্বে বিবাহ হয়ে থাকুক তার অনুমতি নেয়া জরুরী। কুমারী মহিলার অনুমতি হচ্ছে চুপ থাকা (অর্থাৎ চুপ থাকলে তার সম্মতি আছে বলে ধরে নিতে হবে)।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] কোন মহিলার বিবাহ যদি তার আব্বা মেয়ের বিনা সম্মতিতে দিয়ে দেয় এবং সে এতে সম্মত না হয়, তাহলে সে বিবাহ তার ইচ্ছাধীন। সে ইচ্ছা করলে এ বিয়ে ঠিক রাখতে পারে কিংবা ভেঙ্গে দিতে পারে।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে আব্বাস (রা.)]
ওলীর (অভিভাবকের) বিবরণ
স্ত্রীলোকের বিবাহ ওলী ব্যতীত সহীহ নহে এবং যে বিবাহ মহিলার ওলীর বিনা অনুমতিতে হয়ে গেছে এবং স্বামী তার সাথে মিলন করে ফেলেছে তাহলে তাকে মোহরে মেসাল দিতে হবে। আর যে মহিলার কোন ওলী নেই, মুসলমানদের শাসক (রাষ্ট্রপতি) তার ওলী হবেন।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)] সাক্ষী ব্যতীত বিবাহ সহীহ হয় না।[টিকা-তিরমিযী- ইবনে আব্বাস (রা.)] যদি কুমারী বালেগা মহিলা বিবাহে অসম্মত হয় তাহলে তার উপর জোর জবরদস্তী চলবে না।[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ- আবু হুরায়রা (রা.)] যদি কোন স্ত্রীলোককে তার ওলী একজনের সাথে বিয়ে দেয় এরপর দ্বিতীয় বার কেহ অন্য কারও সাথে বিয়ে দিয়ে দেয় এ অবস্থায় উক্ত মহিলাকে প্রথম স্বামী পাবে।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- সামরা (রা.)] ক্রীতদাস তার মালিকের বিনা অনুমতিতে বিবাহ করতে পারবে না।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, দারেমী- জাবের (রা.)] কোন মহিলার পক্ষ হতে অন্য কোন মহিলার বিবাহ দেয়া জায়েয নহে।[টিকা-ইবনে মাজাহ, দারকুতনী- আবু হুরায়রা (রা.)] যদি ওলী কোন মহিলাকে বিবাহ দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেয় বা তার ওলী কাফের হয় তাহলে রাষ্ট্রপ্রধান তার ওলী হবেন।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আবু হুরায়রা (রা.)] পুরুষ ও মহিলার জন্য এটা জায়েয যে, সে তার বিবাহ করিয়ে দেয়ার জন্য কাউকে উকিল বানাতে পারে।[টিকা-রওজাতুন নাদিয়া] অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিবাহ যদি তার গুলী তার বিনা সম্মতিতে দিয়ে দেয় তাহলে তা জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত]
বিবাহের প্রস্তাব দেয়ার বিবরণ
কারও বিয়ের প্রস্তাবের উপর দ্বিতীয় জনের প্রস্তাব দেয়া নিষেধ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] সাইয়েবাকে (পূর্বে যার বিয়ে হয়েছিল) পাত্রের সরাসরি প্রস্তাব দেয়া জায়েয।[টিকা-মুসলিম, আহমাদ- উকবা বিন আমের (রা.)] নাবালিকা মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব তার ওলীর নিকট দিতে হবে।[টিকা-মুসলিম- উম্মে সালামা (রা.)] কোন মহিলার ইদ্দত পালন কালীন সময়ে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হারাম।[টিকা-বুখারী- হযরত উমর (রা.)] দ্বীনদার চরিত্রবান লোক বিয়ের প্রস্তাব দিলে তার সাথে বিবাহ দিবে।[টিকা-তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)]
যে সব স্ত্রীলোকের সাথে বিবাহ করা হারাম তার বিবরণ
আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজীদে যে সব মহিলাকে বিবাহ করা হারাম বলে ইরশাদ করেছেন তারা হলো: ১. আপন মা, ২. সৎ মা, ৩. কন্যা, ৪. বোন, ৫. ফুফু, ৬. খালা, ৭. ভাতিজী, ৮. ভাগিনী, ৯. দুধ মা, ১০. শাশুড়ী, ১১. স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর ঔরশসজাত কন্যা, ১২. আপন পুত্রের স্ত্রী (পুত্র বধু), ১৩. দুধ বোন, (এক সাথে দুধপান করা নসব এর মত), ১৪. একত্রে আপন দুই বোনকে বিবাহ করা।[টিকা-সূরা নিসা ৪র্থ রুকু]
একত্রে স্ত্রী ও তার ফুফুকে এবং স্ত্রী ও তার খালাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করা হারাম।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] কেউ যদি বিবাহ করার পর জানতে পারে যে, তার স্ত্রীর কুষ্ঠ ব্যধি বা ধবল কুষ্ঠ বা মস্তিষ্ক বিকার কিংবা তার গুপ্তাঙ্গে ব্যাধি রয়েছে, তাহলে স্বামী উক্ত বিবাহ ভেঙ্গে দিলে কোন গুনাহ নেই।[টিকা-রওজাতুন নাদিয়াহ- কাব ইবনে জায়েদ (রা.)] স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে কেউ যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তাদের বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। ইদ্দত পার হবার পর অন্য কোন পুরুষের সাথে উক্ত মহিলা বিয়ে করতে পারে।[টিকা-বুখারী-ইবনে আব্বাস (রা.)] যদি কোন মহিলা মুসলমান হয়ে যায় এবং তার বিবাহ করার পূর্বেই তার স্বামী মুসলমান হয়ে যায় তাহলে তাদের নতুন বিবাহ পড়াবার প্রয়োজন নেই। যদি কোন মহিলা মুসলমান হয়ে যায় এবং তার স্বামীর ইসলাম গ্রহণ করার কথা জেনেও অন্য কারো সাথে বিয়ে করে ফেলে তাহলে কাজী সাহেব (ইসলামী রাষ্ট্রের বিচারক) বিবাহ ভেঙ্গে দিয়ে উক্ত মহিলাকে পূর্ব স্বামীর নিকট ফিরিয়ে দিতে পারেন।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- ইবনে আব্বাস (রা.)]
বিবাহের জন্য দ্বীনদার মহিলা তালাশ করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] মুসলমান পুরুষের মুশরিকা মহিলাকে এবং মুসলমান মহিলার মুশরিক পুরুষকে বিবাহ করা জায়েয নহে (হারাম)। ঈমানদার ক্রীতদাসীকে বিবাহ করা উত্তম মুশরিকা মহিলা হতে। তদ্রুপ ঈমানদার মহিলা (মুসলমান) ক্রীতদাসকে বিবাহ করবে কিন্তু মুশরিক পুরুষকে বিবাহ করবে না।[টিকা-সূরা বাকারা: ২২১] মুসলমানদের জন্য ইহুদী ও খৃষ্টানদের পূত পবিত্র মহিলাদের বিবাহ করা জয়েয।[টিকা-সূরা মায়েদা:৫] রাসূলুল্লাহ (সা.) নিকাহে মুতআ’ সম্পর্কে বলেছেন যে, তা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম। নিকাহে মুতআ হলো “কোন মহিলাকে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের (টাকা পয়সার) বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিবাহ করা।” নিকাহুত তাহলিল বা হিলাবিয়া করা হারাম।[টিকা-মুসলিম আহমাদ- রাবি বিন সাবুরা (রা.)] তাহলো (তিন) তালাক প্রাপ্তা মহিলাকে অপর কোন ব্যক্তির সাথে এ উদ্দেশ্যে বিয়ে করানো, যেন সে তাকে তালাক দিয়ে আবার পূর্ব স্বামীর নিকট ফিরিয়ে দেয়।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ- ইবনে মাসউদ (রা.)] নিকাহুশ্ শিগার হারাম। তাহলো “কারও মেয়ে বা বোনকে এ শর্তে বিয়ে করা যে, সে এর পরিবর্তে তার সাথে নিজ মেয়ে বা বোনের বিয়ে দিবে। (এবং এদের জন্য কোন মোহর নির্ধারণ করা হবে না।)[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] নেককার পুরুষের ব্যভিচারিনী মহিলাকে বিবাহ করা হারাম এবং নেককার মহিলার ব্যভিচারী পুরুষের সাথে বিবাহ করা হারাম।[টিকা-সূরা নূর: ৩ নং আয়াত]
মসজিদে বিবাহ পড়ানো সুন্নাত, খুতবা পড়া ও ইজাব কবুলের বিবরণ মসজিদে
বিবাহ পড়ানো সুন্নাত।[টিকা-তিরমিয়ী- আয়েশা (রা.)]
প্রথমে এ খোদ পাঠ করবে:
الْحَمْدُ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَن يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مضِلَّ لَهُ وَمَن يُضْلِلْهُ فَلَا هَادِى لَهُ وَأَشْهَدُ أَن لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أَرْسَلَهُ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا بَيْنَ يَدَى السَّاعَةِ مَن يطع الله وَرَسُولَهُ فَقَد رشد ومن يعصهما فَإِنَّهُ لَا يَضُرُّ الأَ نَفْسَهُ ولَا يَضُرُّ اللَّهَ شَيْئًا – يُأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رجَالاً كَثِيرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا – يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ – يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلاً سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا .
অর্থৎ- সমস্ত প্রশংসাই একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তার প্রশংসা করছি এবং তারই কাছে সাহায্য চাচ্ছি এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আমরা আল্লাহর নিকট আমাদের আত্মার কুমন্ত্রনা এবং আমাদের খারাপ আমল হতে আশ্রয় চাচ্ছি। আল্লাহ তায়ালা যাকে হেদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক এবং তার কোন শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ হচ্ছে তার বান্দা ও রাসূল। তিনি তাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন (সত্যানুসারীদের জন্য) সুসংবাদ দাতা এবং (ভ্রান্তদের জন্য) সতর্ককারী হিসেবে কিয়ামতের পূর্বে প্রেরণ করেছেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুসরণ করবে, সে সঠিক পথ পাবে এবং যে তাদের অবাধ্য হবে সে নিজের ক্ষতি করল, সে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না। “হে মানুষ! ভয় কর তোমাদের সেই প্রভুকে, যিনি তোমাদেরকে একই আত্মা হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তা হতে তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুইজন হতে অনেক পুরুষ এবং মহিলার সৃষ্টি ও বিস্তার ঘটিয়েছেন। তোমরা ভয় কর সেই আল্লাহকে যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট লেনদেন করে থাক এবং তোমরা আত্মীয়তার ব্যাপারে সাবধান হও (তা ছিন্ন করোনা)। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সবকিছু পর্যবেক্ষণকারী। হে ঈমানদারেরা! তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় কর, যেমন তাকে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে মরিও না। হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো এবং তোমরা সঠিক কথা বলো, তাহলে তিনি তোমাদের আমলকে সঠিক করে দিবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করবে নিশ্চয় সে বিরাট সফলতা লাভ করবে।”[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, হাকেম- ইবনে মাসউদ (রা.)]
অতপর খুতবা পাঠকারী যদি ওলী হন তাহলে তিনি বরকে সামনে বসিয়ে বলবেন তোমার সাথে অমুকের মেয়ে যার নাম এই, এত টাকার মোহরের পরিবর্তে বিবাহ দিতেছি, তুমি তাকে স্ত্রীরূপে কবুল কর। বর বলবে আমি কবুল করিলাম (قبلت)।[টিকা-আবু দাউদ]
অতপর বিয়ের মজলিসে যারা উপস্থিত থাকবে তারা বরের দিকে লক্ষ্য করে বলবে:
باركَ اللهُ لَكَ وَفِيكَ وَعَلَيْكَ وجمع بينكما في خير
অর্থাৎ- আল্লাহ তোমার জন্য একাজে বরকত দান করুন এবং তোমার উপর বরকত দান করুন এবং তোমাদের মাঝে কল্যাণের ভিত্তিতে ঐক্য রাখুন।[টিকা-আহমাদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ- আকীল বিন আবু তালেব (রা.)]
বিবাহের পর বিয়ের মজলিসে শুকনা খেজুর (খুর্মা) বিতরণের যে বহুল প্রচারিত (সাধারণের মাঝে) হাদীসটি রয়েছে তা সঠিক নয়।
বিবাহের পর যখন স্ত্রীকে আপন গৃহে নিয়ে আসবে তখন তার কপালে হাত রেখে এ দোয়া পড়বে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَ لَكَ مِنْ خَيْرِهَا وَخَيْرِ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ وأعوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّمًا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ .
অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট এর কল্যাণ ও এর মাঝে যা কিছু কল্যাণময় (গুণাবলী) সৃষ্টি করেছ তা প্রার্থনা করছি এবং এর অকল্যাণ ও এর মাঝে যা কিছু ক্ষতি কারক (গুণাবলী) সৃষ্টি করেছ তা হতে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আমর বিন শোয়াইব]
যখন স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করবে তখন পর্দা করবে এবং এ দোয়া পড়বে:
بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنَّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنَّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا –
অর্থাৎ- আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ! আমাদের হতে শয়তানকে দূরে রাখ এবং আমাদের যে রিজিক দিচ্ছ (অর্থাৎ যে সন্তানাদি দিবে) তাহতে শয়তানকে দূরে রাখ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)]
মোহরের বিবরণ
বিবাহে মোহর বির্ধারণ করা এবং তা পরিশোধ করা ওয়াজিব।[টিকা-সূরা নিসা: ২৪] বিবাহ পড়াবার সময় মোহর পরিশোধ করা সুন্নাত [টিকা-আবু দাউদ- ইবনে আব্বাস (রা.)] এবং বিবাহের পরে পরিশোধ করা জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ- আয়েশা (রা.)] মোহর যত বেশি পরিমাণই নির্ধারণ করা হোক তা জায়েয।[টিকা-সুরা নিসা: ২০] কিন্তু সামর্থের বাহিরে নির্ধারণ করা জায়েয নহে।[টিকা-মিশকাত] মোহর হিসেবে (সর্ব নিম্ন) লোহার বালা বা আংটি নির্ধারণ করা জায়েয। যদি কারও নিকট সেটারও সামর্থ না থাকে তাহলে সে কোরআন মজীদের কয়েকটি সূরা (শিক্ষা দেয়াকে) মোহর হিসেবে নির্ধারণ করতে পারে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- সাহাল বিন সা’দ আসসায়েদী (রা.)] দুই অঞ্জলী ছাতু বা খেজুরের দ্বারা মোহর নির্ধারণ করাও জায়েয।[টিকা-মিশকাত- জাবের (রা.)] বিবাহের সময় যে মহিলার মোহর নির্ধারণ করা হয়নি এবং তার সাথে সহবাসের পূর্বেই যদি তার স্বামী মারা যায় এ অবস্থায় উক্ত মহিলা মোহরে মেসাল (অর্থাৎ তার বংশের মহিলাদের যেমন বোন, মা, ইত্যাদির মোহরের মত) পাবে।[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসাঈ, দায়েমী- আলকামা (রা.)] যদি কোন অমুসলমান ব্যক্তি কোন মুসলিম মহিলাকে বিবাহ করতে চায় এবং উক্ত মহিলা তার ইসলাম গ্রহণ করাটাকেই মোহর হিসাবে নির্ধারণ করে তবে তা জায়েয।[টিকা-নাসাঈ- আনাস (রা.)] কেউ যদি নিজ ক্রীতদাসীকে আযাদ করে বিবাহ করতে ইচ্ছুক হয় এবং তাকে আযাদ করাটা মোহর হিসেবে গণ্য করে তাহলে তা জায়েয।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ- আনাস (রা.)] অল্প মোহরে বিবাহ করায় বেশি বরকত রয়েছে।[টিকা-আহমাদ- আনাস (রা.)] যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে অল্প বা বেশি মোহরে বিবাহ করে এবং তার মোহর না দেয়ার নিয়্যত থাকে তাহলে সে ব্যভিচারী।[টিকা-তবারানী] বিবাহের সময় যে মহিলার মোহর ধার্য করা না হবে এবং সহবাসের পূর্বেই তার স্বামী তাকে তালাক দেয় তাহলে স্বামীকে মোহর দিতে হবে না। কিন্তু যদি বিবাহের সময় মোহর ধার্য করা হয়ে থাকে এবং সহবাসের পূর্বে তালাক দেয় তাহলে অর্ধেক মোহর দিতে হবে।[টিকা-সূরা বাকারা: ২০৬-২০৭]
যুবক-যুবতীদের তাড়াতাড়ি বিবাহ দেয়ার বিবরণ
যে ব্যক্তির মেয়ের বয়স ১২ বছর হবে এবং তার বিবাহ দিয়ে দিবে না, এমতাবস্থায় যদি মেয়ের দ্বারা জিনা (ব্যভিচার) হয়ে যায় তাহলে তার পিতাও এ পাপের ভাগী হবে।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান- আনাস (রা.)] যখন কারও ছেলে বালেগ (প্রাপ্ত বয়স্ক) হয়ে যাবে এবং তার পিতা তার বিবাহ দিয়ে দিবে না, সে যদি জিনা করে ফেলে তাহলে তার পিতাকেও এ ব্যাপারে গুনাহের ভাগী হতে হবে।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] কোন স্ত্রীলোকের বিবাহ তার মতের বিরুদ্ধে জোর পূর্বক করাবে না, যদিও বিবাহ দাতা সে তার পিতা বা ভাই হোক না কেন।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- ইবনে আব্বাস (রা.)]
বিবাহের ঘোষণার বিবরণ
বিবাহ শাদীতে দফ (একমুখা ঢোল) বাজানো এবং যে সব গানে বা কবিতায় অশ্লীলতা নেই তা মেয়েদের গাওয়া জায়েয।[টিকা-তিরমিযী- আয়েশা (রা.)]
স্বামী-স্ত্রীর মিলামিশার বিবরণ
স্ত্রীর সাথে যেভাবে ইচ্ছা সঙ্গম করা জায়েয।[টিকা-সূরা বাকারা: ২২৩] কিন্তু স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সঙ্গম করা হারাম।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] স্ত্রী আযাদ হলে তার অনুমতি সাপেক্ষে আজল করা (অর্থাৎ বীর্যপাতের সময় নিজ অঙ্গ স্ত্রী অঙ্গ হতে বের করে বাহিরে বীর্যপাত করা) জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জাবের (রা.)] কিন্তু স্ত্রী ক্রীতদাসী হলে তার বিনা অনুমতিতেও আজল করা জায়েয।[টিকা-ইবনে মাজাহ-উমর (রা.)]
গর্ভাবস্থায়, বাচ্চাকে দুধপান কালীন সময়েও (অর্থাৎ বাচ্চার বয়স আড়াই বা তিন বছর হওয়া পর্যন্ত) সহবাস করা জায়েয।[টিকা-মুসলিম- জুযামা বিনতে অহব (রা.)] স্ত্রী সঙ্গমের ঘটনা অন্যের নিকট বলা নিষেধ। তদ্রুপ স্ত্রীর জন্যও সঙ্গমের ঘটনা অন্য কোন মহিলার নিকট প্রকাশ করা নিষেধ।[টিকা-মুসলিম- আবু সাঈদ (রা.)] স্বামী-স্ত্রী (বাড়ীর আঙ্গিনায় বা নির্জন স্থানে) পরস্পর দৌড়াদৌড়ি করা জায়েয।[টিকা-আবু দাউদ- আয়েশা (রা.)]
স্ত্রীদের পালা নির্ধারণ করার বিবরণ
যে ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকবে, রাত্রি যাপনের জন্য এদের পালা নির্ধারণ করা তার উপর ওয়াজিব।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তি তার পূর্বের স্ত্রীর উপর কুমারী বিবাহ করবে সে সাতদিন কুমারী স্ত্রীর সাথে থাকবে। তারপর পালা নির্ধারণ করবে। আর যদি বিবাহিতাকে বিয়ে করে তাহলে তার নিকট তিন রাত থেকে পালা নির্ধারণ করবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] কোন মহিলা তার নিজ পালা তার সতীনকে দিয়ে দেয়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম-আয়েশা (রা.)] স্ত্রীদের মাঝে রাত্রি যাপন এবং তাদের ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে আদল ইনসাফ ও সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব, কিন্তু আন্তরিক মহব্বত (কারো প্রতি বেশি হলে) এ ব্যাপারে ধরা হবে না।[টিকা-সুনানে আরবা- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তির এ ধারণা হবে যে, যদি আমি আমার স্ত্রীর উপর দ্বিতীয় বিয়ে করি তাহলে এদের মাঝে ইনসাফ করতে পারব না, তাহলে তার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করা নিষেধ।[টিকা-সূরা নিসা: ৩] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ করবে না, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে এমন অবস্থায় আসবে যে, তার অর্ধেক অঙ্গ নষ্ট (ভঙ্গ) হয়ে থাকবে।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তির কয়েকজন স্ত্রী থাকবে সে তার সফর সঙ্গী হিসেবে কাউকে নিতে চাইলে তাদের মাঝে লটারী (কোরা) করবে। এতে যার নাম উঠবে তাকে সাথে নিবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] যে ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী রয়েছে এবং সে যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তার স্ত্রীরা একমত হয়ে কোন স্ত্রীর ঘরে থাকার অনুমতি দেয় তাহলে তা জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত] এক স্ত্রীর পালার দিন অন্য স্ত্রীর ঘরে প্রয়োজন বশত যাওয়া জায়েয।[টিকা-প্রাগুক্ত] যে ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী রয়েছে, সে বিদেশ (প্রবাস) হতে বাড়ী এসে যতক্ষণ না সবার পালা নির্ধারণ করবে ততক্ষণ কোন স্ত্রীর ঘরে রাত কাটাবে না।[টিকা-মুসলিম]
ওলিমার বিবরণ
ওলিমা (বিহাত্তোর খানা দেয়া) করা ওয়াজিব।[টিকা-বুখারী- আনাস (রা.)] যে ওলিমাতে শুধু মাত্র ধনীদের ডাকা হবে এবং গরীবদের বাদ দেয়া হবে সেটা খুবই খারাপ খানা।[টিকা-বুখারী, মুসলিম-আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি ওলিমার দাওয়াত কবুল করবে না, সে আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা.) অবাধ্য।[টিকা-প্রাগুক্ত] কিন্তু যে ব্যক্তি ফখর করার জন্য ওলিমা করে বা ওলিমাদাতা যদি ফাসিক হয় তাহলে তার দাওয়াত কবুল করা জায়েয নয়।[টিকা-বায়হাকী, মিশকাত- আবু হুরায়রা (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) একবার ওলিমাতে গোশত রুটি, একবার পানির এবং একবার ছাতু খেতে দিয়েছিলেন।[টিকা-বুখারী- আনাস (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বিনা দাওয়াতে যাবে, সে চোর হয়ে ঢুকবে এবং লুণ্ঠনকারী হয়ে ফিরে আসবে।[টিকা-আবু দাউদ] যদি কাউকে একই সময়ের জন্য দুইজনে দাওয়াত দেয়, তাহলে প্রথম ব্যক্তির দাওয়াত খাবে। আর দুইজন যদি একসাথেই দাওয়াত দেয় তাহলে যার বাড়ি নিকটে তার বাড়িতে দাওয়াত খাবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ] ওলিমার দাওয়াত দাতা যদি কাউকে বলে যে, উমুককে দাওয়াত দাও এবং তোমার সাথে যারই সাক্ষাৎ ঘটে তাকে দাওয়াত দিও, তাহলে যে সব লোককে সে দাওয়াত দিবে সবারই খানা খওয়া যায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] বিবাহ অনুষ্ঠানে মহিলা এবং বাচ্চাদের অংশগ্রহণ করা জায়েয।[টিকা-বুখারী, আহমাদ-আয়েশা (রা.)] ওলিমার দাওয়াতে যে বাড়িতে কোন বিদআত বা খারাপ কাজ (শরিয়ত বিরোধী কাজ) হবার কথা জানা যাবে সেখানে খানা খাবে না।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী- উমর (রা.)] যে মহিলার বিয়ে হচ্ছে সে যদি নিজেই ওলিমার খানা রান্না করে তো জায়েয। রোযাদার ব্যক্তিরও দাওয়াত কবুল করা উচিৎ। সেখানে গিয়ে দাওয়াতকারীর জন্য দোয়া করবে এবং তাকে বলে দিবে যে, আমি রোযা রেখেছি।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার
স্বামীর অনুগত থাকা স্ত্রীর উপর ফরজ এবং স্বামীকে কষ্ট দিলে স্ত্রীর গুনাহ-হবে।[টিকা-সূরা নিসা: ৬ষ্ঠ রুকু, আহমাদ, ইবনে মাজাহ] যে স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দেয় তার উপর বেহেস্তের হুরীরা বদ দোয়া করে বলে, আল্লাহ তোমার উপর অভিশাপ করুন। তুমি কেন কষ্ট দিচ্ছ? সে তো তোমার নিকট অল্প কিছু দিনের মেহমান। সে তোমার নিকট হতে পৃথক হয়ে তাড়াতাড়ি আমাদের নিকট চলে আসবে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- মুরাজ (রা.)] যে স্ত্রীলোক মারা যাবে এবং তার স্বামী তার উপর সন্তুষ্ট থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- উম্মে সালমা (রা.)] যে মহিলা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে এবং তার গুপ্তাঙ্গকে (পর পুরুষ হতে) হেফাযত করবে এবং স্বামীর বাধ্যগত থাকবে, সে বেহেশতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে।[টিকা-মিশকাত- আনাস (রা.)] যদি আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাউকে সিজদা করা জায়েয হতো তাহলে মহিলাদেরকে তাদের স্বামীকে সিজদা করার জন্য হুকুম দেয়া হতো।[টিকা- তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিজ প্রয়োজনে ডাকবে এবং স্ত্রী যদি অস্বীকৃতি জানায় তাহলে তার স্বামী তার উপর সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতা তার উপর অভিশাপ করতে থাকে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] নেককার মহিলা হচ্ছে সেই মহিলা, যার দিকে চেয়ে তার স্বামী খুশী হবে এবং সে তার স্বামীর হুকুম মেনে চলবে এবং নিজের জীবন ও মাল দিয়ে তার স্বামীর বিরুদ্ধাচারণ করবে না।[টিকা-নাসাঈ, শোয়াবুল ঈমান- আবু হুরায়রা (রা.)]
যে মহিলা তার স্বামীকে অসন্তুষ্ট করে, তার নামায কবুল হয় না, যতক্ষণ না সে তার স্বামীকে সন্তুষ্ট করে।[টিকা-শোয়াবুল ঈমান, মিশকাত- জাবের (রা.)] মহিলারা সর্বদা নিজেকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও সুসজ্জিত রাখবে। হাত রঙ্গীন রাখবে (মেহেন্দী দিয়ে), চোখে সুরমা দিবে, সুগন্ধী ব্যবহার করে পবিত্র হবে। অপরিষ্কার অপরিছন্ন থাকবে না [টিকা-আবু দাউদ, মিশকাত] এবং খুব পাতলা কাপড় পরবে না।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আবু সাঈদ খুদরী (রা.)] স্বামীর (উপস্থিতিতে তার) অনুমতি ব্যতীত স্ত্রীর নফল ইবাদত করা; তা নামায বা রোজা যাই হোক না কেন, জায়েয হবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] মুহরেম ছাড়া কোন মহিলা (একাকী) একদিন রাতের পথ সফর করবে না।[টিকা-মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] স্ত্রী স্বামীর গোপনীয় কথা কারো নিকট বলবে না।[টিকা-সূরা তাহরীম: ১ম রুকু] তার সন্তানদের প্রতি সদয় হবে [টিকা-বুখারী, মুসলিম-আবু হুরায়রা (রা.)] এবং তার সন্তানদের উপর বদদোয়া করবে না।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] কেননা সন্তানদের ব্যাপারে পিতা মাতার বদ-দোয়া কবুল হয়ে যায়। আর যদি কবুল হয়ে যায়, তাহলে এর প্রতিকার নেই।[টিকা-মুসনাদে বাজজার] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন যে, যদি কোন মহিলার স্বামীর ফোড়া উঠে এবং মহিলা তার জিহ্বা দ্বারা সে ফোড়া চেটে নেয় বা তার স্বামীর নাক হতে হলুদ পানি বা রক্ত বের হয় এবং তা সাফ করে তবুও তার স্বামীর হক (অধিকার) আদায় হবে না।[টিকা-আহমাদ- আনাস (রা.)] কোন মহিলা যদি তার স্বামীকে (নিজ মালের) জাকাত দেয় তা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)]
স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার
স্ত্রীর অধিকার হচ্ছে স্বামীর উপর এটাই যে, স্বামী যেমন খাবে স্ত্রীকে তেমনি খাওয়াবে, যেমন সে পরবে তেমনি তাকে (সেই মানের কাপড়) পরাবে এবং যখন (কোন কারণে) মারবে তখন মুখমন্ডলের উপর মারবে না। স্ত্রীকে খারাপ বা অকথ্য ভাষায় গালি দিবে না এবং স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে বাড়ীর বাইরে গিয়ে রাত কাটাবে না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- মুয়াবিয়া কুশায়রী (রা.)] যদি স্বামী তার স্ত্রীকে প্রহার করে, তাহলে অন্য লোকের মারার কারণ জিজ্ঞাসা করা নিষেধ। যার স্ত্রী তাকে চড়া গলায় গালি গালাজ করে সে তাকে তালাক দিবে। যদি সন্তানাদির কারণে তালাক না দেয়, তাহলে তাকে উপদেশ দিবে কিন্তু দাসীর মত করে মারবে না। অর্থাৎ এমন মারা মারবে না যাতে কোন হাড় ভেঙ্গে যায় বা পায়ে মারের চিহ্ন ফুটে উঠে।[টিকা-আবু দাউদ- লাকীত বিন সরা (রা.)] রাসূলে কারীম (স:) বলেছেন মহিলারা বাম পাজরের হাড় হতে সৃষ্টি। এরা সোজা হয়ে থাকবে না। এ অবস্থায় তার থেকে ফায়েদা নিতে হবে। তাকে (সম্পূর্ণ) সোজা করতে গেলে তালাক দিতে হবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] পূর্ণ ঈমানদার সেই ব্যক্তি যার চরিত্র উত্তম এবং যে স্ত্রীকে ভালবাসে ও তার প্রতি সদয় থাকে।[টিকা-আহমাদ, তিরমিযী-আবু হুরায়রা (রা.)] একজন মুসলমানের উচিৎ তার স্ত্রীর ভাল গুণগুলোকে দেখা এবং খারাপ গুণগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া। কেননা তার একটি গুণ খারাপ হলেও অন্যটি ভাল।[টিকা-মুসলিম, আহমাদ- আবু হুরায়রা (রা.)]
যে ব্যক্তির সামর্থ থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণ-পোষণে কৃপণতা করে, তবে তার স্ত্রী তার সম্পদ হতে স্বামীর অগোচরে প্রয়োজন মত খরচ করা জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] যে মাল নিজ স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য খরচ করা হয়ে থাকে তাতে বেশি নেকী রয়েছে। এরচেয়ে কম নেকী হলো আল্লাহর পথে নিজ বন্ধুর জন্য খরচ করা হয়, তবে নিয়্যত থাকতে হবে যে, স্ত্রী- সন্তানদের ভরণ-পোষণ আমার উপর ফরজ এবং তা আমি আদায় করছি।[টিকা-তবারানী] কিয়ামতের দিন মানুষের আমল নামায় সর্বপ্রথম (খরচ সম্পর্কিত) স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য যে খরচ করেছিল তা উঠান হবে। কেউ যদি তার স্ত্রীকে পানি পান করায়ে থাকে, সে তারও সওয়াব পাবে।[টিকা-আহমাদ, তবারানী- ইরবাজ বিন সারিয়া (রা.)] কারো জন্য এ অপরাধই যথেষ্ট যে, তার উপর যে সব লোকের ভরণ-পোষণ ফরজ তা সে আদায় করে না।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)] স্ত্রী স্বামীর নিকট প্রয়োজনের অধিক খরচ চাইবে না। সেই মহিলাই উত্তম যে অল্প খরচাই সন্তুষ্ট থাকে।[টিকা-ইবনে মাজাহ- আব্দুর রাহমান বিন সালেম (রা.)] স্ত্রীর মুখে নিজ হাতে কোন খাদ্যের গ্রাস (লোকমা) তুলে দিলে তাতেও সওয়াব রয়েছে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- সাদ বিন আবী অক্কাস (রা.)] এমনকি স্ত্রীর সাথে সহবাস করাতেও নেকী রয়েছে।[টিকা-দারেমী- আবু যর (রা.)] স্বামী নিজ স্ত্রীকে আল্লাহর ইবাদত করার ব্যাপারে সহায়তা করবে।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ- আবূ হুরায়রা (রা.)] স্বামীর উচিৎ নহে যে, স্ত্রীর সন্তুষ্টির জন্য কোন হালাল বস্তুকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়।[টিকা-সূরা তাহরীম: ১]
পর্দার বিবরণ
মহিলারা তাদের দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখবে, গায়ের মুহরেম (যাদের সাথে বিবাহ হতে পারে) ব্যক্তির দিকে চাইবে না এবং নিজ সতর ঢেকে রাখবে। নিজের সৌন্দয্য অর্থাৎ গয়না, বুক, পেট প্রভৃতি প্রকাশ করবে না এবং মাথা চাদর দিয়ে ঢেকে রাখবে। স্বামী, পিতা, শশুর, আপন ছেলে, স্বামীর ঔরষজাত সন্তান, ভাই, বোনের ছেলে, নিজ বাড়ীর মহিলারা, ক্রীতদাস ও দাসী ব্যতীত অন্য কারো সামনে নিজের সৌন্দর্য্য প্রকাশ করবে না।[টিকা-সূরা নূর- ৪র্থ রুকু, সূরা আহযাব] যে সমস্ত নাবালেগ ছেলে এখনও মহিলাদের সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই তাদের সামনে পর্দা নেই।[টিকা-সূরা নূর-৪র্থ] মহিলারা যেন এমন শব্দ করে না চলে, যাতে তাদের সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায় [টিকা-প্রাগুক্ত] এবং গয়নার শব্দ শুনা যায় এবং শব্দ বিশিষ্ট কোন গয়না পরবে না।[টিকা-আবু দাউদ] চলতে ফিরতে এদিক সেদিক চাইবে না এবং আস্তে আস্তে কথাবার্তা বলবে।[টিকা-সূরা আহযাব] মাথার খোপা উটের কুজের মতো (উঁচু) করে বাঁধবে না।[টিকা-মুসলিম] যে মহিলার অবস্থা ফাসেকানা (শরিয়ত বিরোধী) হয় না তার কাজকর্ম ফাসেকী হয় তাহলে পর পুরুষের মত তার সাথে পর্দা করবে।[টিকা-মিশকাত]
স্ত্রীকে স্বামীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা নিষেধ
রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করে সে আমার তরিকার উপর নাই।[টিকা-আবু দাউদ- আবু হুরায়রা (রা.)] স্বামী স্ত্রীর মাঝে মনো-মালিন্য সৃষ্টি করা বা ঝগড়া বাধানো শয়তানের কাজ।[টিকা-মুসলিম- জাবের (রা.)]
ব্যভিচারের নিকৃষ্টতা বর্ণনা
যে বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা মহিলা ব্যভিচারিনী হবে (অর্থাৎ বৃদ্ধ বয়সেও ব্যভিচার করবে) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’য়ালা তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।[টিকা-তবারানী] যে মহিলা আতর লাগিয়ে কোন মজলিসে যাবে সে ব্যভিচারিনী (সমতুল্য)।ইবনে খুজায়মা- আবু মুসা (রা.) যে মহিলা সুগন্ধী লাগিয়ে মসজিদে যাবে, যতক্ষণ না গোসল করে সুগন্ধী দুর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা’য়ালা তার নামায কবুল করবেন না।[টিকা-ইবনে খুজায়মা- আবু হুরায়রা (রা.)] যে মহিলা পাতলা কাপড় পরে পুরুষদেরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে এবং নিজে পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হয় সে জান্নাতের সুগন্ধী (হাওয়া) পাবে না।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] সালফে সলেহীনেরা এ ধরনের মহিলাদের ব্যভিচারিনী ও খারাপ বলে মনে করতেন।
মহিলাদের জন্য পুরুষদের পোষাক পরিধান নিষিদ্ধ
পুরুষদের মত জুতা ও পোষাক পরিচ্ছেদ পরিধান কারিনী মহিলাদের প্রতি রাসূলে কারীম (সা.) অভিসম্পাত (লানত) করেছেন।[টিকা-আবু দাউদ- ইবনে আবী মুলায়কা (রা.)]
তালাকের বিবরণ
আল্লাহ তায়ালার নিকট নিকৃষ্টতম হালালের মধ্যে তালাক একটি।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- ইবনে উমর (রা.)] পৃথিবীর বুকে এর মত ভয়ানক আর কিছু করা হয়নি।[টিকা-দারাকুতনী- মুয়াজ বিন জাবাল (রা.)] হায়েজের অবস্থায় তালাক দেয়া জায়েয নয়। কিন্তু যদি কেউ হায়েজের অবস্থায় তালাক দিয়ে দেয় তাহলে তালাক হয়ে যাবে এবং তাকে ফিরিয়ে নেয়া (রজু করা) ওয়াজিব এবং গর্ভাবস্থায় তালাক দেয়া জায়েয।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মিলামিশার পূর্বেই ভালাক দিয়ে দেয় এবং উক্ত মহিলার পূর্বের স্বামীর ঔরসজাত কন্যা থাকে তাহলে সে ইচ্ছা করলে সে মেয়েকে বিবাহ করতে পারে।[টিকা-সূরা নিসা: ২৩]বিবাহের পূর্বে তালাক দিলে তালাক হবে না।[টিকা-ইবনে মাজাহ, আবু ইয়ালা, হাকেম] হাসতে হাসতে বা রহস্যচ্ছলে তালাক দিলে তালাক হয়ে যাবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- আবু হুরায়রা (রা.)] জোর পূর্বক তালাক প্রদান করালে তালাক হয় না [টিকা-ইবনে মাজাহ, হাকেম- ইবনে আব্বাস (রা.)] এবং পাগলে তালাক দিলে তালাক হবে না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ] স্ত্রী আযাদ (স্বাধীনা) হলে তিন তালাকে হারাম হয়ে যায়। আর স্ত্রী ক্রীতদাসী হলে দুই তালাকে হারাম হয়ে যায়।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আয়েশা (রা.)] একত্রে তিন তালাক দেয়া জায়েয নয়।[টিকা-সূরা বাকারা, ২৯ রুকু] যে ব্যক্তি একত্রে তিন তালাক দিবে তা তিন তালাক না হয়ে (গনণায়) এক তালাক রাজয়ী হবে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ- ইবনে আব্বাস (রা.)] ঘুমের অবস্থায় তালাক দিলে তালাক হয় না। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা বেহুস ব্যক্তি তালাক দিলে তা সঠিক হবে না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ-আয়েশা (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, মহিলাদের বিবাহ কর এবং বিনা কারণে তাদের তালাক দিও না। কেননা আল্লাহ তায়ালা স্বাদ আস্বাদনকারী পুরুষ কিংবা মহিলাদের ভালবাসেন না। তালাক দেয়াই আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠে।[টিকা-তবারানী- আবু মুসা (রা.)]
যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিবে, যে তোহরে সে সঙ্গম করেনি। এভাবেই দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তোহরে তালাক দিবে। এভাবে তিন তালাক দিলে তার স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে। উল্লেখিত নিয়ম ব্যতীত অন্য কোন ভাবে তালাক দেয়া বিদআত। এইরূপ তালাক প্রদানকারী ব্যক্তি যদি তার পূর্বস্ত্রীকে আবার গ্রহণ করতে চায় তাহলে তার স্ত্রীর ইদ্দত পার হবার পর অন্য কোন ব্যক্তির সাথে বিয়ে হতে হবে এবং তার সাথে সঙ্গম হতে হবে। এরপর সে যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে তাকে তালাক দেয় তাহলেই কেবল ইদ্দত পার হবার পর বিয়ে করতে পারবে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম, সুনানে আরবা] যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলে দেয় যে, ‘তোমাকে এ অনুমতি দিলাম যে, তুমি ইচ্ছা করলে আমার নিকট থাকতে পার অথবা চলে যেতে পার।’ তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এটা তালাক বলে গণ্য হবে না। তবে হ্যাঁ, স্ত্রী যদি স্বামীর দেয়া এ অধিকার গ্রহণ করে এবং চলে যায় তাহলে তালাক হয়ে যাবে।[টিকা-সূরা আহযাব: ৪র্থ রুকু] যদি কেউ কোন ব্যক্তিকে আপন স্ত্রীকে তালাক দেয়ার অধিকার দেয় এবং উক্ত ব্যক্তি যদি তালাক দেয়, তাহলে তালাক হয়ে যাবে।[টিকা-রওজাতুন নাহদিয়া-আবু হুরায়রা, ইবনে আব্বাস (রা.)] যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলে যে, তুমি আমার উপর হারাম, তাহলে এ কথায় তালাক হবে না।[টিকা-সূরা তাহরীম: ১ম রুকু] কিন্তু কাফ্ফারা দিতে হবে এবং কাফ্ফারা হচ্ছে দশজন মিসকিনকে খানা খাওয়ান অথবা দশজন মিসকিনকে পরিধেয় কাপড় দেয়া কিংবা গোলাম আযাদ করা। যে ব্যক্তি এ তিনটির কোন একটি করারও সামর্থ রাখে না, সে তিনদিন রোজা রাখবে।[টিকা-সূরা মায়েদা: ৮৯]
খোলা তালাকের বিবরণ
[টিকা-স্বামীর নিকট হতে যে মোহর নিয়েছিল তা ফেরত দিয়ে এর বিনিময়ে স্ত্রী যে তালাক নিয়ে থাকে তাকে খোলা তালাক বলে]
যে মহিলা কোন কারণবশত স্বামীর নিকট হতে তালাক নিতে চায়, সে স্বামীর নিকট হতে নেয়া মোহর ফেরত দিয়ে তালাক নিতে পারে। তার স্বামী তাকে এক তালাক দিবে [টিকা-বুখারী- ইবনে আব্বাস (রা.)] এবং তার ইদ্দত হচ্ছে এক হায়েজ।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- ইবনে আব্বাস (রা.)] যে মহিলা বিনা কারণে তার স্বামীর কাছে তালাক চেয়ে নিবে, সে বেহেশতের হাওয়া (সুগন্ধী) পাবে না।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী- ইবনে আব্বাস (রা.)] অথচ বেহেশতের হাওয়া চল্লিশ বছরের রাস্তার দুরত্ব হতে পাওয়া যাবে।[টিকা-ইবনে মাজাহ-ইবনে আব্বাস (রা.)] বিনা প্রয়োজনে খোলা তালাক- কারিনী মহিলা মুনাফিক।[টিকা-নাসাঈ- আবু হুরায়রা (রা.)]
রাজায়াতের বিবরণ
যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে এক তালাক দেয়ার পর তাকে পুনরায় ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছা করে, সে তালাক দেয়ার সময় এবং ফিরিয়ে নেয়ার সময় (রাজয়াত করার সময়) সাক্ষ্য রাখবে।[টিকা-আবু দাউদ- ইমরান বিন হোসাইন (রা.)]
ইদ্দতের বিবরণ
যে মহিলার স্বামী মারা যাবে সে চার মাস দশদিন ইদ্দত পালন করবে [টিকা-সূরা বাকারা: ২৩৪] এবং যে আযাদ মহিলাকে তার স্বামী তালাক দিবে সে তিন হায়েজ পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে।[টিকা-সূরা বাকারা: ২২৮] যে মহিলার হায়েজ হয় না (বন্ধ্যা বা নাবালিকা কিংবা বেশি বয়সের কারণে) সে তিন মাস পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে।[টিকা-সূরা তালাক: ৪] ইদ্দত পালন কালীন সময়ে বিয়ে করা হারাম।[টিকা-সূরা বাকারা: ২৩৫] গর্ভবতী মহিলার স্বামী মারা যাক, কিংবা তাকে তালাক দেক, সে আযাদ হোক বা ক্রীতদাসী সে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে।[টিকা-সূরা তালাক: ৪] যে ব্যক্তি বিয়ে করে স্ত্রীর সঙ্গলাভ করার পূর্বেই তালাক দিবে তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে না। কিন্তু তাকে তালাক দেয়ার সময় তার স্বামী অবশ্যই দুই খানা কাপড় দিয়ে তালাক দিবে।[টিকা-সূরা আহযাব: ৪৯] যে ব্যক্তি তার ক্রীতদাসী স্ত্রীকে তালাক দিবে, সে দুই হায়েজ পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। যার হায়েয হয় না সে দুইমাস ইদ্দত পারন করবে। আর ক্রীতদাসী মহিলার স্বামী মারা গেলে সে দুইমাস পাঁচদিন ইদ্দত পালন করবে। যে মহিলাকে তালাক দেয়ার পর তার এক বা দুই হায়েজ হয়ে তা বন্ধ হয়ে যাবে সে নয় মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এ সময় যদি গর্ভের লক্ষণ দেখা যায় তাহলে সে সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দত পালন করবে। আর যদি গর্ভপ্রকাশ না পায় তাহলে নয় মাস অপেক্ষা করার পর তিন মাস ইদ্দত পালন করবে এরপর অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে।[টিকা-দারকুতনী]
যে মহিলার স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে (হারিয়ে যাবে) অর্থাৎ জানা যাবে ন। যে, সে কোথায় আছে, জীবিত আছে কি না? উক্ত মহিলা তার স্বামীর জন্য চার বছর অপেক্ষা করবে। চার বছর পর চার মাস দশদিন ইদ্দত পালন করবে এরপর অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে, এটাই হযরত উমর (রা.) এর ফতওয়া বা ফয়সালা।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক, মিশকাত- সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রা.)] যে মহিলাকে তার স্বামী তালাক দিয়েছে এবং তালাকের পর তার দুই হায়েজ অতীত হয়েছে। তৃতীয় হায়েজে পদার্পন করতে করতেই তার স্বামী মারা গেল, এ অবস্থায় তার ইদ্দত তিন হায়েজই হবে এবং সে তার স্বামীর মালের উত্তরাধিকারিনী হবে না এবং তার স্বামীও তার মালের অংশীদার হবে না।[টিকা-মালেক, শাফেয়ী (রহ.)] যে মহিলার স্বামী মারা যাবে সে, চার মাস দশদিন পর্যন্ত রঙ্গীন (আকর্ষণীয়) পোষাক পরবে না। কিন্তু রঙ্গীন সুতা দিয়ে তৈরী কাপড় পরা জায়েয এবং সুরমা লাগাবে না ও সুগন্ধী ব্যবহার করবে না। কিন্তু হায়েজ হতে পবিত্র হবার সময় প্রয়োজন পরিমান সুগন্ধী গুপ্তাঙ্গে লাগাতে পারে, দুর্গন্ধ দূর করার জন্য। স্বামী মারা যাবার পর মুখের লাবন্য পরিস্ফুটক কোন জিনিস ব্যবহার করবে না, কেননা এতে চেহারা আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। তবে রাতে লাগিয়ে সকালে ধুয়ে ফেললে কোন অসুবিধা নাই এবং সুগন্ধী তেল লাগিয়ে চিরুনী করবে না, কিংবা মেহেন্দীও লাগাবে না। তবে কূলপাতা দিয়ে মাথা ধোয়া জায়েয। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর জন্য গেরুয়া ও কুসুম্বী রংয়ের কাপড় পরা যাবে না এবং কোন অলংকারও ব্যবহার করা যাবে না।[টিকা-মুয়াত্তা ইমাম মালেক- সুলায়মান বিন ইয়াসার (রা.)]
স্বামীর মৃত্যুর সময় স্ত্রী যেখানে থাকবে, সেখানেই ইদ্দত পালন করবে। ইদ্দতের মাঝে অন্য কোন জায়গায় যাবে না। যদি তার স্বামীর মৃত্যুর খবর দূর দেশ হতে আসে তাহলে স্ত্রী যেখানে এ সংবাদ পাবে, সেখানে ইদ্দত কাল কাটাবে।[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত- উম্মে সালামা (রা.)] কিন্তু তালাক প্রাপ্তা মহিলা যদি একাকী থাকায় চোর ইত্যাদির ভয় থাকে তাহলে অন্যত্র গিয়ে ইদ্দত পালন করা জায়েয।[টিকা-মুয়াত্তা মালেক, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, দারেমী- জয়নব বিনতে কা’ব (রা.)] তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে তার ইদ্দত পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার স্বামী বা আত্মীয় স্বজন ঐ বাড়ী হতে বের করে দিবে না এবং সেও নিজে বাড়ী হতে চলে যাবে না। কিন্তু যদি সে ব্যভিচার করে বসে তাহলে তাকে (স্বামীর) বাড়ী হতে বের করে দিবে।[টিকা-সূরা তালাক: ১ম রুকু] কোন মহিলাকে তার ইদ্দত চলাকালীন সময়ে বিবাহের পয়গাম (প্রস্তাব) দেয়া জায়েয নয়। তবে একথা বলতে পারে যে, কোন ভাল মহিলা পেলে আমার বিয়ে করার ইচ্ছা রয়েছে, এটা বলা জায়েয।[টিকা-সূরা বাকারা: ৩০ রুকু]
ভরণ-পোষণের (নাফাকার) বিবরণ
রাজয়ী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত কালীন খোরপোষ দেয়া তার স্বামীর উপর ওয়াজিব।[টিকা-আহমাদ, নাসাঈ- ফাতেমা বিনতে কায়স (রা.)] যে মহিলাকে তিন তালাক দেয়া হয়েছে এবং যে মহিলার স্বামী মারা গেছে তাদের খোরপোষ দেয়া ওয়াজিব নহে।[টিকা-মুসলিম- ফাতেমা বিনতে কায়স (রা.)] গর্ভবতী হলে এদের খোরপোষ দেয়া ওয়াজিব।[টিকা-সূরা তালাক: ১ম রুকু] দরিদ্র সন্তানের খোরপোষ ধনী পিতার উপর ওয়াজিব।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] অনুরূপ দরিদ্র পিতার খোরপোষ ধনী সন্তানের উপর ওয়াজিব।[টিকা-আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ- আমর ইবনে শোয়াইব (রা.)] আর দাস ও দাসীর খোরপোষ দেয়া তার মালিকের উপর ওয়াজিব।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] (দরিদ্র) আত্মীয় স্বজনের খোরপোষ (ধনী) আত্মীয় স্বজনের উপর ওয়াজির নহে। কিন্তু আত্মীয়তার জন্য দেয়া জায়েয।[টিকা-তিরমিযী- আবু দাউদ] যার খোরাক দেয়া যে ব্যক্তির উপর ওয়াজিব, তার কাপড়, থাকার জায়গা দেয়াও ওয়াজিব।
দুধ পানের বিবরণ
যে শিশু কোন মহিলার দুধ পাঁচ বার পান করবে এ শর্তে যে, সে মহিলার বুকে দুধ থাকে এবং শিশুটি দুই বছর বয়সের মধ্যে দুধ পান করবে, তাহলে সে মহিলা এ বাচ্চার উপর হারাম হয়ে যাবে।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] বেশি বয়সের (দু’য়ের অধিক) সন্তান দুধ পান করলে এতে মতভেদ রয়েছে। কারো কারো নিকট বেশি বয়সের দুধ পানকারী ও দুধ পানকারিনী হারাম হয়ে যাবে এবং কারো করো মতে হারাম হবে না।[টিকা-মুসলিম- আয়েশা (রা.)] বংশানুক্রমে যেমন হারাম সাব্যস্ত হয়, দুধ পান করলে সেরূপ হুরমত সাব্যস্ত হয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে আব্বাস (রা.)] যদি কোন মহিলা একথা বলে (দাবী করে) যে, আমি উমুক ছেলেকে বা মেয়েকে দুধ পান করিয়েছি তাহলে তার কথা গ্রহণীয় হবে।[টিকা-বুখারী- উকবা (রা.)]
সন্তান লালন পালনের বিবরণ
সন্তান লালন পালনের জন্য তার মাতাই উত্তম, যতক্ষণ না সে অন্যত্র বিয়ে করে।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ- আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.)] অতপর সন্তানের প্রতিপালন করবে তার খালা অতপর তার আব্বা।[টিকা-বুখারী- বারা ইবনে আ’যেব] অতপর আত্মীয়দের মাঝে ভাল মনে করে বিচারক যাকে এ কাজের জন্য নিযুক্ত করে।[টিকা-মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক- ইকরেমা (রা.)] যখন সন্তানের জ্ঞান বৃদ্ধি হবে তখন সে ইচ্ছা করলে মায়ের সাথে থাকতে পারবে বা ইচ্ছা করলে পিতার সাথে থাকবে।[টিকা-আহমাদ, সুনানে আরবা- আবু হুরায়রা (রা.)] যে বাচ্চার মা-বাপ বা নিকটাত্মীয় কেউ থাকবে না, তাকে একজন নেককার লোক প্রতিপালন করবে।[টিকা- আহমাদ]
ইলা’র বিবরণ
যে ব্যক্তি এ কসম করবে যে, আমি চার মাস পর্যন্ত স্ত্রীর নিকট যাব না, তাহলে চার মাস পার হওয়ার পর সে ইচ্ছা করলে ঐ স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে কিংবা তালাকও দিতে পারে।[টিকা-সূরা বাকারা: ২২৬, ২২৭, বুখারী- ইবনে উমর (রা.)] আর যদি চার মাসের কম সময়ের জন্য কসম করে তাহলে স্ত্রী থেকে দূরে থাকবে উক্ত সময় অতিক্রম না হওয়া পর্যন্ত।[টিকা-বায়হাকী- ইবনে আব্বাস (রা.)]
লেয়ানের বিবরণ
যখন স্বামী স্ত্রীকে ব্যভিচারের অপবাদ দিবে এবং স্ত্রী ব্যভিচারের কথা অস্বীকার করবে এবং স্বামী তার অভিযোগের ব্যাপারে অটল থাকবে তখন লেয়ান করবে। লেয়ানের সুরত হচ্ছে- স্বামী চার বার সাক্ষ্য দিবে যে, আমি সত্যবাদী এবং পঞ্চম বার বলবে, আমার উপর আল্লাহর লা’নত (অভিসম্পাত) যদি আমি মিথ্যাবাদী হই। অতপর স্ত্রী সাক্ষ্য দিবে চার বার একথা বলে যে, আমার স্বামী মিথ্যুক এবং পঞ্চম বার বলবে, সে যদি সত্যবাদী হয়ে থাকে তাহলে আমার উপর আল্লাহর ক্রোধ নিপতিত হোক।[টিকা-সূরা নূর: প্রথম রুকু, মুসলিম] এমতাবস্থায় হাকিম এদের দুইজনের মাঝে বিচ্ছেদ করে দিবে এবং এ পুরুষের জন্য উক্ত মহিলা চিরদিনের দিনের জন্য হারাম হয়ে যাবে [টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] এবং লেয়ানের সন্তানের অধিকারী হবে তার মা। অর্থাৎ সন্তান মায়ের নামে সমাজে পরিচিতি পাবে, পিতার নামে নহে।[টিকা-মুয়াত্তা- ইবনে উমর (রা.)] যে ব্যক্তি কোন মহিলাকে জিনার (ব্যভিচারের) অপবাদ দিবে এবং এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী নিয়ে আসতে ব্যর্থ হবে সে ব্যক্তি কাযেফ অর্থাৎ অপবাদদাতা, তাকে শাস্তি দিতে হবে অর্থাৎ তাকে ৮০ আশি দোররা (বেত্রাঘাত) মারতে হবে।[টিকা-সূরা নূর: ৪]
জেহারের বিবরণ
যে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলে যে, তুমি আমার নিকট আমার মায়ের পিঠের মত বা বলে, তোমাকে আমার মায়ের পিঠের মত মনে করি, কিংবা স্ত্রীর কোন অঙ্গকে মায়ের কোন অঙ্গের সাথে তুলনা করে তাহলে এ স্ত্রীর সাথে সহবাস করার পূর্বে কাফ্ফারা দেয়া ওয়াজিব।[টিকা-সূরা মুজাদিলা: ১ম রুফু] জেহারের কাফ্ফারা হচ্ছে- একজন মুমিন গোলাম আযাদ করা, যে ব্যক্তি গোলাম আযাদ করতে সমর্থ হবে না সে ষাটজন মিসকিনকে খানা খাওয়াবে, যে ব্যক্তি মিস্কিন খাওয়াতে সমর্থ হবে না সে একাধারে ষাটটি রোজা রাখবে।টিকা-সূরা মুজাদিলা: ১ম রুকু] যদি কাফ্ফারা প্রদান কারীকে ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান) কোন সাহায্য করেন, তা জায়েষ এবং কাফ্ফারা দাতা যদি গরীব হয় এবং ইমাম তাকে যা সাহায্য করেছে সেটা নিজের পরিবারের জন্য খরচ করে, তাহলে নিষেধ নেই।[টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী- সালমা বিন সাখর (রা:)] যে ব্যক্তি কাফ্ফারা দেয়ার পূর্বেই স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করে ফেলে তাকে একবার কাফ্ফারা দিতে হবে। কিন্তু কাফ্ফারা দেয়ার পূর্বে আর যেন মেলামেশা না করে।[টিকা-সুনানে আরবা- ইবনে আব্বাস (রা:)]
সন্তানের সাথে স্নেহ-সদ্ব্যবহার করার বিবরণ
ছোট বাচ্চাদের মুখে চুম্বন দেয়ায় আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ হয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা:)] মেয়েদের প্রতিপালনে যে কষ্ট হয় এর উপর ধৈর্য ধরলে তা জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তি পাবার উপায় হয়।[টিকা-প্রাগুক্ত] রাসূলুল্লাহ (স:) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার দুই মেয়েকে বা দুইবোনকে তাদের বালেগ হওয়া পর্যন্ত লালন পালন করবে, সে এবং আমি জান্নাতে এমনভাবে থাকবো; যেমন তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলীদ্বয়ের মাঝে ব্যবধান রয়েছে।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা:)] আর যে ব্যক্তি তাদের এলেম শিক্ষা দিল, সে তাদের প্রতি ইহসান করলো এবং তাদের (সুপাত্রে) বিয়ে দিল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।[টিকা-ইবনে হিব্বান (রা:)] রাসূলে কারীম (স:) আরো ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার মেয়েকে জীবন্ত কবরস্থ করেনি, তাকে ঘৃণা বা তুচ্ছ জ্ঞান করেনি এবং নিজের ছেলের মত তাকে স্নেহ ও আদর করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।[টিকা-হাকেম-ইবনে আব্বাস (রা:)] রাসূলে কারীম (স:) একথাও বলেছেন যে, যে ব্যক্তির তিনটি মেয়ে হবে এবং সে তাদের লালন পালনের কষ্টে ধৈর্য্য ধরবে, তাহলে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তির দুইটি কন্যা হবে তার জন্যও এ দুর্নংবাদ রয়েছে। বরং যার একটি মাত্র কন্যা জন্মিবে তার জন্যও উক্ত সুসংবাদ রয়েছে।[টিকা-হাকেম- আবু হুরায়রা (রা:)]
সন্তানের উত্তম নাম রাখা ও খারাপ নাম পরিবর্তন করা
আল্লাহ্ তা’য়ালার নিকট খুব প্রিয় নাম হচ্ছে আবদুল্লাহ্ এবং আবদুর রহমান।[টিকা-মুসলিম-ইবনে উমর (রা:)] রাসূলুল্লাহ (স:) ইরশাদ করেন যে, তোমাদের সন্তানাদির নাম নবীদের নাম অনুযায়ী রাখবে।[টিকা-আবু দাউদ- আবু অহাব জুশামী (রা:)] সবচেয়ে খারাপ নাম হচ্ছে শাহান শাহ্ (রাজাধিরাজ বা জগতাধিপতী)[টিকা-বুখারী- আবু হুরায়রা (রা:)] উম্মুল মুমেনিন হযরত উম্মে সালামার এক মেয়ের নাম বাররাহ্ (برة) ছিল রাসূলুল্লাহ (সা:) তার নাম জয়নাব রাখেন।[টিকা-মুসলিম-জয়নব বিনতে আবী সালামা (রা:)] রাসূলে কারীম (স:) এর এক স্ত্রীর নাম বাররাহ ছিল তিনি তার নাম পরিবর্তন করে জুঅয়রিয়াহ রাখেন।[টিকা-মুসলিম-ইবনে আব্বাস (রা:] হযরত উমর (রা:) এর মেয়ের নাম ছিল আসিয়া عاصية (অবাধ্য, আল্লাহ তায়ালার হুকুম অমান্যকারী) রাসূলুল্লাহ (সা:) তার নাম রাখেন জামীলা (সুন্দরী)।[টিকা-মুসলিম-ইবনে উমর (রা:)] আর এক ব্যক্তির নাম ছিল আসরাম নবী করীম (স:) তার নাম রাখেন জুরআ (সাহসী)[টিকা-আবু দাউদ] এবং আরেক জনের নাম ছিল হুজন (চিন্তা) তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন সাহাল (সহজ)।[টিকা-বুখারী- আব্দুল হোমাইদ (রা:)] এভাবেই যার নাম অর্থের দিক দিয়ে খারাপ হতো তার নাম পরিবর্তন করে দিতেন।
ছেলে মেয়েদের আদব শিক্ষা দেয়ার বিবরণ
আলেম (জ্ঞানী) ও জাহেল (মূর্খ) কখনো সমান হতে পারে না।[টিকা-সূরা যুমার: ৯] পিতার উপর পুত্রের জন্য সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ-অনুদান হচ্ছে তাকে জ্ঞান ও আদব কায়দা শিক্ষা দেয়া।[টিকা-মুসলিম- আবু মুসা (রা:)]
মৃত্যুর পর মানুষের আমল (এর সওয়াব) ছিন্ন হয়ে যায় কিন্তু যদি সাদকায়ে জারিয়া করে যায়, বা কাউকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে যায়, কিংবা সুসন্তান রেখে যায় এবং সে সন্তান তার পিতার জন্য দোয়া করে তাহলে এর সওয়াব তার কাছে সর্বদা পৌঁছতে থাকে।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] নিছক দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করা নিজেকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার শামিল।[টিকা-প্রাগুক্ত]
জারজ সন্তানের বিবরণ
জারজ সন্তান মহিলার হবে (তার মায়ের নামে পরিচিত হবে) এবং ব্যভিচারী সন্তান হতে বঞ্চিত হবে (মিরাস এবং বংশ পরিচয় হতে) এবং তার জন্য রয়েছে পাথর ছুড়ে হত্যা এবং ব্যভিচারী (জিনাকারী) ব্যক্তির সাথে ঐ সন্তানের কোন সাদৃশ্য গ্রহণ যোগ্য হবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আয়েশা (রা.)] হায়েজ অবস্থায় (অর্থাৎ হায়েজ হতে পাক হবার পর) কোন ক্রীতদাসীর সাথে তিন ব্যক্তি সঙ্গম করে এবং এতে ক্রীতদাসীর গর্ভে কোন বাচ্চা জন্মে আর উক্ত তিন জনই সে সন্তানের দাবী করে তাহলে এদের মাঝে লটারী করা হবে এবং যার নাম উঠবে সেই এ সন্তানের অধিকারী হবে।[টিকা-দারেমী]
আত্মীয়তা রক্ষা ও পিতামাতার অধিকার
আত্মীয়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খিদমত পাবার অধিকারী হচ্ছে মা। মায়ের পর পিতা। পিতার পর যারা খুবই নিকটাত্মীয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] মাতাপিতা যদি কাফের হয় তবুও দুনিয়াতে তাদের সাথে সদয় ও সদ্ব্যবহার করতে হবে।[টিকা-সূরা লোকমান: ১৫] যে ব্যক্তি মাতাপিতা উভয়কে বা একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল অথচ তাদের খিদমত করল না, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
হযরত উমর (রা.) তার এক কাফের ভাইকে একখানা রেশমী চাদর উপহার দিয়েছিলেন।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা.)] বিধর্মী আত্মীয় স্বজনদের সাথেও আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষার হুকুম রয়েছে এবং পিতামাতার অবাধ্য হওয়া কবিরা গুনাহ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)] আর মা-বাপকে গালি দেয়াও কবিরা গুনাহ।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] নিজ পিতার বন্ধুদের সাথে সদ্ব্যবহার করা খুব বড় সেলারহমীর কাজ।[টিকা-মুসলিম- ইবনে উমর (রা.)] আত্মীয়তা রক্ষা বা সেলারহমী করায় রুজিতে বরকত হয় এবং দীর্ঘায়ু লাভ হয়।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আনাস (রা.)] আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী বেহেশতে প্রবেশ করবে না।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- জুবাইর বিন মুতেম] সদ্ব্যবহার কারীর সথে সদ্ব্যবহার করা প্রকৃত পক্ষে সদ্ব্যবহার নয় (এটা হচ্ছে তর প্রতিদান) প্রকৃত সদ্ব্যবহারকারী হচ্ছে ঐ ব্যক্তি, যে সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সদ্ব্যবহার করে।[টিকা-বুখারী- ইবনে উমর (রা.)] যে ব্যক্তি কারো সাথে খারাপ আচরণ করে, তার সাথে ভাল আচরণ করা বিরাট নেকী ও সওয়াবের কাজ।[টিকা-মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)]
যে সন্তানের উপর তার পিতা সন্তুষ্ট থাকেন, আল্লাহ তায়ালাও তার উপর সন্তুষ্ট থাকেন এবং যে সন্তানের উপর তার পিতা অসন্তুষ্ট হন, আল্লাহ তায়ালাও তার উপর অসন্তুষ্ট হন।[টিকা-তিরমিযী- আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.)]
মা যদি (সঙ্গত কারণে) পুত্রকে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বলে তাহলে পুত্র স্ত্রীকে তালাক দিবে।[টিকা-তিরমিযী, ইবনে মাজাহ- আবু দারদা (রা.)] তদ্রূপ পিতা যদি সঙ্গত কারণে পুত্রকে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বলে পুত্র স্ত্রীকে তালাক দিবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী- ইবনে উমর (রা.)] অস্বীকার করার উদ্দেশ্য মাতা পিতার প্রতি উহ: শব্দ করাও জায়েয নহে।[টিকা-সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩ নং আয়াত] এক ব্যক্তির সিলারহমী ছিন্ন করার কারণে তার গোত্রের লোকেরা আল্লাহ পাকের রহমত হতে বঞ্চিত হয়ে যায়।[টিকা-বায়হাকী- আব্দুল্লাহ বিন আবী আওফা (রা.)] যে ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্র প্রধানের বিদ্রোহী হবে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আল্লাহ তায়ালা তার উপর দুনিয়ায় আজাব নাজিল করেন এবং সে পরকালে লাঞ্ছিত হবে।[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ- আবী বাকরাতা (রা.)] সেলারহমীতে দুধমায়ের হক মায়ের সমান।[টিকা-আবু দাউদ- আবু তুফাইল (রা.)] যে ব্যক্তি মাতা-পিতার অবাধ্য ছিল সে যদি, তাদের মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে তাহলে সে অবাধ্য থাকে না। তাকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।[টিকা-বায়হাকী, মিশকাত- আনাস (রা.)]
মা-বাপ যদি সন্তানের উপর অন্যায়-অবিচার করে থাকে তবুও তাদের আনুগত্য করা জরুরী।[টিকা-বায়হাকী] পিতা-মাতার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে চাইলে একটি হজ্বে মাকবুলের সওয়াব লেখা হয়। এভাবে যতবার রহমতের নজরে চাইবে প্রতিবারে হজ্বে মাকবুলের সওয়াব লেখা হবে।[টিকা-প্রাগুক্ত] বড় ভাইয়ের হক (অধিকার) পিতার (হকের) অধিকারের মত।[টিকা-বায়হাকী, মিশকাত- সাঈদ ইবনুল আ’স (রা.)]
বিধবা মহিলাদের বিবাহ দেয়ার বিবরণ
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّلِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَآمَنكُمْ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ –
অর্থৎ- আর তোমাদের মাঝে যারা জুড়িহীন আর তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সচ্চরিত্রবান তাদের বিবাহ দাও। তারা যদি গরীব হয়, তাহলে আল্লাহ তা’আলা নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে ধনী করে দিবেন। আল্লাহ বড়ই প্রশস্ততা বিধানকারী এবং মহাবিজ্ঞ।[টিকা-সূরা নূর: ৩২]
রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে (রা.) বলেন, যখন কোন বিধবা মহিলার জন্য সঙ্গী পেয়ে যাবে তখন তাদের বিয়ে দিতে মোটেই দেরী করবে না।[টিকা-তিরমিযী- হযরত আলী (রা.)] হযরত রাসূলে কারীম (সা.) এর মেয়ে রোকাইয়ার বিয়ে আবু লাহাবের পুত্র উতবার সাথে হয়েছিল। এরপর হযরত উসমান (রা.) এর সাথে বিয়ে হয়। হযরত ফাতেমা (রা.) এর কন্যা উম্মে কুলসুমের বিয়ে প্রথমে হযরত উমর (রা.) এর সাথে হয়েছিল। এরপর হযরত জাফর (রা.) এর পুত্র মুহাম্মদের সাথে বিয়ে হয়। মুহাম্মদ মারা যাবার পর জাফর (রা.) এর আরেক পুত্র আব্দুল্লাহর সাথে বিয়ে হয়। হযরত উসমান (রা.) এর মায়ের পক্ষের এক বোন উম্মে কুলসুম (রা.) এর বিয়ে সর্বপ্রথম হযরত জায়েদ বিন হারেসার সাথে হয়। তিনি শাহাদাত বরণ করলে জুবাইর বিন আওয়াম এর সাথে বিয়ে হয়। তিনি ইন্তিকাল করলে তৃতীয়বার আমর বিন আস বিন আওফের সাথে বিয়ে হয়। একমাত্র হযরত আয়েশা (রা.) ছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা.) এর অন্যান্য স্ত্রীরা এমনটি ছিলেন যে, কারো ইতিপূর্বে একস্বামী মারা গেছে, কারো দুই জন স্বামী, কারো তিন জন স্বামী মারা গেছে, আর কেউ কেউ তালাক প্রাপ্তা ছিলেন। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন মহিলার দ্বিতীয় বিয়েকে দোষণীয়, অপমান-কর মনে করে, সে প্রকৃত পক্ষে মুসলমান নহে।[টিকা-তাকবিয়াতুল ঈমান, লাহোর, পৃ. ২৭৮]
আকীকার বিবরণ
যখন কারো ঘরে কোন ছেলে বা মেয়ে জন্ম গ্রহণ করবে, তখন প্রথমে তাকে গোসল করিয়ে নেবে এবং পাক সাফ কাপড়ে জড়িয়ে নিবে [টিকা-বুখারী, মুসলিম- হযরত আসমা (রা.)] এবং তার কানে আযান দিবে।[টিকা-তিরমিযী, আবু দাউদ- আবু রা’ফে (রা.)] এটিও বর্ণিত হয়েছে যে তার ডান কানে আযান এবং বাম কানে একামত বলা হলে তাকে আঁতুর ঘরে কোন ব্যাধিতে ক্ষতি করবে না এবং হাইয়া আলাস্, সলাহ এবং হাইয়া আলাল ফালাহ বলার সময় নামাযের আযানে যেভাবে দুইদিকে মুখ ঘুরাই সেভাবে দুই দিকে মুখ ঘুরাবে।[টিকা-জা’মে সগীর- হযরত হোসাইন (রা.)] প্রথম দিন অথবা সপ্তম দিন বাচ্চার নাম রাখবে এবং সপ্তমদিন বাচ্চার মাথা ন্যাড়া করে দিবে [টিকা-আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ সামুরা (রা.)] এবং মাথার চুলের সম পরিমাণ ওজনের রোপ্য সাদকা করবে। তবে এ হাদীসটি জয়ীফ [টিকা-তিরমিযী, মিশকাত] এবং সপ্তম দিনে আকীকা করবে। অর্থাৎ যদি ছেলে হয় তাহলে দুইটি ছাগল বা দুইট বকরী এবং মেয়ে হলে একটি ছাগল বা একটি বকরী জবেহ করবে।[টিকা-বুখারী- সালমার বিন আমের (রা.)] ছেলের পক্ষ থেকে একটি ছাগল বা একটি বকরী জবেহ করলেও হয়ে যাবে।[টিকা-আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ- উম্মে কুরয (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে সন্তানের আকীকা করা হয় না সে তার আকীকার জন্য বন্ধক থাকে। (এর এক অর্থ হতে পারে যে, সে তার পিতা-মাতার জন্য শাফায়াত করবে না।)[টিকা-আবু দাউদ, নাসাঈ সামুরা (রা.)]
খাতনার বিবরণ
খাতনা করা হযরত ইব্রাহীমের (আ.) এর সুন্নাত। তিনি তার নিজের খাতনা ৮০ (আশি) বছর বয়সে করেছিলেন।[টিকা-বুখারী- আবু হুরায়রা (রা.)] হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর পুত্র ইসহাকের (আ.) খাতনা করেছিলেন সপ্তম দিনে এবং ইসমাঈল (আ.) এর খাতনা করেছিলেন তের বছর বয়সে।[টিকা-প্রাগুক্ষ] রাসূলে কারীম (সা.) হযরত হাসান (রা.) এবং হযরত হোসাইন (রা.) এর খাতনা করেছিলেন সপ্তম দিনে।[টিকা-সফরুস্ সাআদাত] সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাদের সন্তানেরা বালেগ হবার পর খাতনা করাতেন।[টিকা-হাকেম, বায়হাকী হযরত- আয়েশা (রা.)] মহিলাদের খাতনা করার ব্যাপারে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তা জয়ীফ (দুর্বল)।[টিকা-মহিলাদের খাতনা করার ব্যাপারে কিছু রেওয়ায়েত এসেছে। তাদের খাতনা করার ব্যাপারটি ঐচ্ছিক। মিসরসহ আফ্রিকার অনেক দেশে মেয়েদের খাতনা করা হয়ে থাকে। উষ্ণ আবহাওয়ার দেশে মেয়েদের খাতনা করলে তারা শারীরিক ভাবে উপকৃত হয়।]
প্রতিবেশীর হক (অধিকার)
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ
অর্থাৎ- তোমরা ইহসান (সদ্ব্যবহার ও সহানুভূতি) করো আত্মীয় প্রতিবেশী এবং অনাত্মীয় প্রতিবেশীর সাথে।[টিকা-সূরা নিসা: ৩৬]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতিবেশী হচ্ছে চল্লিশ ঘর পর্যন্ত।[টিকা-তবারানী- কাব ইবনে মালিক (রা.)] প্রতিবেশী কোন মহিলার সাথে জিনা (ব্যভিচার) করার গুনাহ অপ্রতিবেশীর দশ জনের বাড়িতে চুরি করার চেয়েও বেশি।[টিকা-আহমাদ] রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দিল সে আমাকে কষ্ট দিল, আর যে আমাকে কষ্ট দিল, সে আল্লাহ তায়ালাকে কষ্ট দিল।[টিকা-বিশারাফুল ফুসসাক- আনাস বিন মালিক (রা.)] যে ব্যক্তি পেটভর্তি করে খেল অথচ তার প্রতিবেশী না খেয়ে থাকলো সে মুসলমান নহে।[টিকা-বায়হাকী, মিশকাত- ইবনে আব্বাস (রা.)] যার অনিষ্ট হতে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নহে, সে বেহেশতে প্রবেশ করবে না।[টিকা-মুসলিম- আনাস (রা.)] যার অনিষ্ট হতে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে মুসলমান নহে।[টিকা-বুখারী, মুসলিম- আবু হুরায়রা (রা.)] কিয়ামতের দিন প্রথম ঝগড়াকারী প্রতিবেশীর বিচার করা হবে।[টিকা-আহমাদ- উকবা বিন আমের (রা.)] রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নিকট এক মহিলার কথা বলা হলো যে, সে বেশ নামায পড়ে, অনেক দান-খয়রাত করে এবং অনেক রোজা রাখে কিন্তু প্রতিবেশীকে নিজ কথার দ্বারা কষ্ট দেয়, রাসূল পাক (সা.) বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। অত:পর দ্বিতীয় আরেক মহিলার কথা বলা হলো যে, তার নামায রোজা কম, দান-খয়রাত করে না, কিন্তু প্রতিবেশীদের গলি-গালাজ দিয়ে কষ্ট দেয় না, রাসূলে কারীম (সা.) বললেন, এ বেহেস্তে প্রবেশ করবে।[টিকা-আহমাদ, বায়হাকী- আবু হুরায়রা (রা.)] আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিই ভাল, যে তার প্রতিবেশীদের মঙ্গল করে।[টিকা-তিরমিযী, দারেমী- আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.)] যাকে প্রতিবেশীরা ভাল বলবে সেই ভাল লোক, আর যাকে প্রতিবেশীরা খারাপ বলবে সে খারাপ লোক।[টিকা-ইবনে মাজাহ- ইবনে মাসউদ (রা.)] যে ব্যক্তি কথাবার্তা সত্যবাদী হবে, আমানতের খিয়ানত করবে না এবং প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করবে, সে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল (স:) এর বন্ধু।[টিকা-বায়হাকী, মিশকাত- আব্দুর রহমান বিন আবী কুরাদ (রা.)]
সমাপ্ত