জামায়াত অনলাইন লাইব্রেরি
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস
কোন ফলাফল নেই
সকল ফলাফল দেখুন
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস
জামায়াত অনলাইন লাইব্রেরি

ইসলামী আন্দোলন: সমস্যা ও সম্ভাবনা

অন্তর্গতঃ ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন, রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
Share on FacebookShare on Twitter

ইসলামী আন্দোলন: সমস্যা ও সম্ভাবনা

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী


স্ক্যান কপি ডাউনলোড


ইসলামী আন্দোলন : সমস্যা ও সম্ভাবনা
মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী

প্রকাশনা বিভাগ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
প্রকাশক
আবু তাহের মুহাম্মদ মাছুম
চেয়ারম্যান, প্রকাশনা বিভাগ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

লেখকের কথা

১৯৮৮ সনের মার্চ মাসে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে ইসলামী আন্দোলনের সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে আমাকে বক্তব্য রাখতে হয়েছিল। পরে উক্ত বক্তৃতার অনুলিপি পুস্তিকা আকারে প্রকাশের সুযোগ পাওয়ায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি।
এটা মূলত একটা বক্তৃতা বিধায় এর মধ্যে তেমন গবেষণা লব্ধ তথ্য পরিবেশন করা সম্ভব হয়নি। মাঠে ময়দানের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে আন্দোলনের একজন কর্মী হিসাবে আমি হৃদয় দিয়ে যা কিছু উপলব্ধি করেছি তাই এ ক্ষুদ্র পুস্তিকায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আল্লাহর দ্বীনকে যারা বিজয়ী দেখতে চান তারা যদি এর মাধ্যমে চিন্তার সামান্য খোরাকও লাভ করেন, তাহলে আমার শ্রম সার্থক হবে।
মতিউর রহমান নিজামী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইসলামী আন্দোলন: সমস্যা ও সম্ভাবনা

সূচীপত্র

  1. প্রাথমিক কথা
  2. ইসলামী আন্দোলনের পরিচয়
  3. চিরন্তন সমস্যা
  4. চিরন্তন সম্ভাবনা
  5. সমস্যা আজকের প্রেক্ষাপটে
    1. বাইরের সমস্যা
    2. আভ্যন্তরীণ সমস্যা
  6. পরাশক্তির ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা
  7. সম্ভাবনা আজকের প্রেক্ষাপটে
    1. নেতিবাচক দিক
    2. ইতিবাচক দিক

প্রাথমিক কথা

মানব জাতিকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় যে কাজের জন্য পাঠিয়েছেন, সেই কাজটার নামই ইসলামী আন্দোলন। মানুষকে মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে চলতে হলে আল্লাহর গোলামী আর বন্দেগী ছাড়া উপায় নেই। আর সেই আল্লাহর গোলামী না বন্দেগী করতে তে হলে, নিজের নফসের গোলামী থেকে শুরু করে গায়রুল্লাহর যে কোন ধরনের দাসত্ব ও গোলামী বর্জন করতে হবে। মানুষ হিসাবে জীবন যাপন করতে গিয়ে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই আমরা ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক, জেনে হোক আর না জেনে হোক, আল্লাহর দাসত্ব ও গোলামীর পরিবর্তে গায়রুল্লাহর দাসত্ব ও গোলামী করতে বাধ্য হচ্ছি। আল্লাহকে মানা, আল্লাহর প্রতি ঈমানের ঘোষণার অনিবার্য দাবীই হল জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল দিকে ও বিভাগে প্রতিষ্ঠিত খোদাহীন সভ্যাতার কর্তৃত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মূলোৎপাটন করে নির্ভেজাল ভাবে এক আল্লাহর কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব কায়েম করতে হবে। আল্লাহর প্রতি ঈমানের সিদ্ধান্ত যদি কেউ নেয় তাহলে আগে আকে খোদাদ্রোহী শক্তিকে প্রত্যাখ্যানের বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজের জীবন থেকে শুরু করে মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে খোদাহীন সভ্যতার প্রভাব মুক্ত করতে হবে। এভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবী পূরণের জন্য আল্লাহর ঈমানদার বান্দাদেরকে যে সংগ্রাম সাধনা করতে হয় প্রকৃতপক্ষে সেই সংগ্রাম সাধনাই “ইসলামী আন্দোলন”। এভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমানের ঘোষণাদানকারী ব্যক্তি যদি হয়, আর গোটা দুনিয়া এবং দুনিয়ার মানুষ তার পথে বাধা-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাকে এ ঈমানের দাবী অনুযায়ী পরিপূর্ণরূপে জীবনের সকল দিকে ও বিভাগে আল্লাহর হুকুম মানতে বাধা দেয়, এবং আল্লাহর হুকুমের বিপরীত কাজ করতে বাধ্য করে, অবস্থায় সে ঈমানদার ব্যক্তিটি তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐ বিরোধী শক্তির মুকাবিলায় আপোষহীন ভূমিকা পালন করতে করতে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। তাহলে সংগ্রামে সে হবে সফলকাম। আর গোটা দুনিয়ার মানুষ হবে ব্যর্থকাম। কারণ সে একলা হয়েও আল্লাহর মর্জি পূরণের চেষ্টা করল। সারা দুনিয়ার বাধা তাকে আল্লাহর পথ থেকে ফিরাতে পারল না।

অন্যদের ব্যর্থতা দু’ধরনের

এক: তারা নিজেরা আল্লাহর মর্জি পূরণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে দুনিয়ার কল্যাণ থেকেও প্রকৃত পক্ষে বঞ্চিত হবে, আর আখেরাতে মহাশান্তি ভোগ করবে।
দুই: তাদের বড় ব্যর্থতা সতোর ডাকে সাড়া দিতে না পারার ব্যর্থতা। সেই সাথে সত্যের আহ্বানকারীকে চতুর্মুখী আক্রমণ ও বিরোধিতা করে ও সত্য ত্যাগে বাধ্য করতে না পারার ব্যর্থতা দুনিয়ার ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। আল্লাহর ঘোষণা মতে এরা যেমন ফেরেশতাদের দ্বারা অভিশপ্ত হয়, তেমনি সুখ যুগান্তরের মানুষের আদালতে তাদেরকে অভিশপ্ত হয়েই থাকতে হয়। অতএব ইসলামী আন্দোলনকারী জনগোষ্ঠীর কাছে সমস্যা সম্ভাবনার ব্যাপারটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমস্যা যতই কঠিন ও জটিল হোকনা কেন তারা এ আন্দোলন থেকে পিছ পা হতে পারে না। পিছ পা হবার কথা কল্পনাও করতে পারে আন্দোলনের জাগতিক সাফল্যের আদৌ কোন সম্ভাবনা আছে কিনা এ প্রশ্ন তাদের কাছে কোন গুরুত্ব পেতে পারে না। সাফল্যের সম্ভাবনা থাকলে আছি, নইলে নেই, এটা তো বস্তুবাদী চিন্তাধারারই বহিঃপ্রকাশ। এই বস্তুবাদী চিন্তা যারা বর্জন করতে পারেনি, তারা সত্যিকার অর্থে ঈমানদার নয়, আর তাদের জন্যে ইসলামী আন্দোলন শোভনীয় নয়। ইসলামী আন্দোলনতো তাদের জন্যেই শোভনীয় “যারা এ দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের বিনিময়ে বিক্রি করেছে বা আখেরাতের স্বার্থে এ দুনিয়ার স্বার্থ বর্জনের পাকা-পোখত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।” এর পরও আন্দোলনের সমস্যা আমাদেরকে আলোচনা করতে হবে। সমস্যার জটিলতা দেখে ময়দান ছেড়ে পালাধার জন্যে নয়, বরং সমস্যার সার্থক মুকাবিলা করে বিজয়ের পথ সুগম করার জন্যে। আর সম্ভাবনার আলোচনাও করতে হবে; তবে তা বৈষয়িক কোন সুযোগ সুবিধার প্রতি আরর্ষণ সৃষ্টির লক্ষ্যে নয়, বরং আল্লাহর বান্দাদের মনে আল্লাহর আইন মেনে চলার সুযোগ পাওয়ার শুভ সংবাদ দেয়ার জন্যে। আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হলে বৈষয়িক দিক দিয়ে ও সত্যিকারের সুখ-শান্তি অবশ্যই আসবে। কিন্তু একজন ঈমানদারের জন্যে এই দুনিয়ার গড় পাওয়া হল, স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনের সবল দিক ও বিভাগে আল্লাহর আইন, আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলার সুযোগ ও পরিবেশ পাওয়া। যেমন আখেরাতে জান্নাতের অফুরন্ত অগণিত নেয়ামতের মধ্যেও ঈমানদারদের চরম ও পরম পাওয়া হল আল্লাহর দিদার ও সন্তুষ্টি। “ইসলামী আন্দোলন: সমস্যা ও সম্ভাবনা” বিষয়টি আমরা উপরোক্ত দৃষ্টিকোণ থেকেই আলোচনা করতে চাই। আমরা সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করতে চাই তার সার্থক মুকাবিলার জন্যে, আর সম্ভাবনার দিকগুলো তুলে ধরতে চাই তাকে কাজে লাগাবার জন্যে। আল্লাহ আমাদেরকে লক্ষ্য হাসিলে সাহায্য করুন। আমিন।

ইসলামী আন্দোলনের পরিচয়

আখেরাতের কঠিন ভয়াবহ শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ইসলামী আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যে এই দুনিয়ার জীবনকে যে লক্ষ্যে পরিচালনা করতে হয় তাহল আল্লাহর জমিনে এবং মানুষের জীবনে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। যার অনিবার্য দাবী হল, মানুষের উপর থেকে মানুষের প্রভুত্ব খতম করে আল্লাহর প্রভুত্ব কায়েম করা। অন্য কথায় মানব জাতিকে মানুষের দাসত্বের কবল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্ব ও গোলামী করার সুযোগ করে দেয়া। আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে বলতে হয়, মানুষকে আল্লাহর আইন ও শাসনের ভিত্তিতে পরিচালনা করা এবং অনৈসলামী আইন ও শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্ত করা, ফিরিয়ে রাখা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে একদিকে যেমন মানুষের সমাজ থেকে মানুষের মনগড়া আইন-কানুন, রীতি-নীতি তথা সমাজ ও শাসন বাবস্থার অবসান ঘটিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসূল প্রদর্শিত সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে, তেমনি প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত খোদাহীন সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার ধারক-বাহক অসং, অযোগ্য ও খোদাদ্রোহী নেতৃত্বের অবসান ঘটিয়ে সমাজের সর্বত্র সৎ, যোগ্য ও খোদাভীরু লোকদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কঠিন কাজটি আনজাম দেয়ার জন্যে সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিচালিত সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং সংগ্রাম সাধনাই ইসলামী আন্দোলন। এ আন্দোলন আল্লাহর জমিনের সর্বত্র আল্লাহর প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে। আল্লাহর সরল বান্দাদেরকে দুনিয়ার শাস্তি ও আখেরাতের মুক্তির পথ দেখাবার জন্যে। তাই গোটা দুনিয়াই এই আন্দোলনের কর্মক্ষেত্র। তবে এর প্রাথমিক ক্ষেত্র যার যার জন্মভূমি।
আল্লাহর সৃষ্টি বিশাল পৃথিবী আজ বিচ্ছিন্ন দেশে বিভক্ত। এর যে অংশে যে জন্মগ্রহণ করেছে তাকে প্রথমে সেই আশে, সেই দেশে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে চেষ্টা সাধনা করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। কিন্তু তার চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকতে হবে গোটা বিশ্বে আল্লাহর এই দ্বীনকে বিজয়ী কথা। এ আন্দোলন মৌলিকভাবে পরিচালনা করেছেন নবী-রাসুলগণ (আ.)। তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরাতের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত নিজ নিজ জন্মভূমিতেই এ আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবনেও আমরা এ কথার জীবন্ত নমুনা দেখতে পাই। আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরাতের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তিনি শত বাধা, শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার জন্মভূমি মক্কাতেই অবস্থান করেছেন এবং আপোষহীনভাবে তাঁর লাওয়াত অব্যাহত রেখেছেন। হিজরাত করলেও নিজের জন্মভূমিকে স্থায়ীভাবে আগ করেননি। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরাতের আটি বছর পর মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে মক্কা ও মদিনা জুড়ে আল্লাহর দ্বীনের প্রাথমিক বিজয় সম্পূর্ণ হবার পরই গোটা বিশ্বে দাওয়াত মড়াবার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে দ্বীনের পূর্ণতা লাভের ঘোষণা আসে। এভাবে আল্লাহর রাসূল (সা.) এর নেতৃত্বে গড়ে উঠা ইসলামী উম্মাহ সেদিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ এ দুনিয়ায় আসবে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে তাদের মাঝে বংশ-পরম্পরায় দ্বীন পৌঁছাবার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়। আর তাদের সবার সামান রাসুল (সা) এব নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ সর্বকালের সর্বযুগের মানুষের জন্যে শান্তি সুখের ও ন্যায়-ইনসাফের সমাজের জীবন্ত নমুনা বা মডেল হিসাবে উপস্থাপিত হয়।
আমরা আল্লাহর বান্দা এবং শেষ নবীর উম্মত হিসাবে আজকের বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহর সমস্ত বান্দাদের কাছে তাঁর দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। এজন্যে সারা দুনিয়াই আমাদের কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু একদিনে একযোগে সারা দুনিয়ায় দ্বীনের দাওয়াত ছাড়িয়ে দেওয়া, পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়, বাস্তবও নয়। তাছাড়া দুনিয়ার কোন একটি দেশের মানুষকে সত্যিকারের ইসলামী হিসাবে গড়ে তোলা এবং সেই দেশের সমাজ ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে ইসলামী সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার বাস্তব নমুনারূপে দুনিয়ার সামনে তুলে না ধরে শুধু মৌখিকভাবে দাওয়াত ছড়ানোটা ফলপ্রসু হতে পারে না। অতএব আল্লাহ আমাদেরকে যে দেশে পয়দা করেছেন তাঁর দ্বীন কায়েমের জন্যে সেই দেশটাকেই আমাদের প্রাথমিক কর্মক্ষেত্র হিসাবে বাছাই করেছেন। আল্লাহর দ্বীন কায়েমের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সারা দুনিয়ার মৌলিক সমস্যা ও সম্ভাবনাকে যেমন সামনে রাখা জরুরী তেমনি বিশেষভাবে বাংলাদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে রাখা একান্তই অপরিহার্য।
ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে সমস্যার যেমন দু’টি দিক আছে, একটি চিরন্তন সমস্যা অপরটিকে আমরা আজকের প্রেক্ষাপটের সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি। আজকের প্রেক্ষাপটের সমস্যাও আবার দু’ধাণে আলোচিত হতে পারে। একটা বাহিরের সমস্যা, অপরটি আভ্যন্তরীণ সমস্যা। তেমনি সম্ভাবনারও। দুটি দিক রয়েছে। একটি চিরন্তন অপরটি আজকের প্রেক্ষাপটে। আল্লাহ তৌফিক দিলে আমরা উভয় ধরনের সমস্যা ও সম্ভাবনা বুঝবার, উপলব্ধি করার চেষ্টা করব। যাতে করে আল্লাহর সাহায্যে ঐসব সমস্যার মুকাবিলা করে সম্ভাবনা সমূহ কাজে লাগিয়ে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার কাজকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হয়।

চিরন্তন সমস্যা

ইসলামের চিরন্তন দাওয়াত: গায়রুল্লাহর ইলাহিয়াত বা সার্বভৌমত্বকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর ইলাহিয়াত বা সার্বভৌমত্বের ঘোষণা দেওয়া। এই ঘোষণা সর্বকালের সর্বযুগেই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কাছে ছিল অপ্রিয় ও অনাকাংখিত। অতএব তাদের পক্ষ থেকে বাধা প্রতিবন্ধকতা আসাটাই ছিল স্বাভাবিক। যে সমাজ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে চলে, সে সমাজে সর্বশ্রেণীর মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়। কেউ কারো না গোলামী করতে পারে, না প্রভুত্ব করতে পারে। মানুষের সমাজের সকলের জন্য কল্যাণকর হলেও যারা অতিরিক্ত সুযোগ ভোগ করে বা ভোগ করতে চায় তাদের জন্যে এটা কোনদিনই কাম্য হতে পারে না। যারা কোটি কোটি মানুষের উপর নিজেদের প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ক্ষমতার মোহ চরিতার্থ করতে চায়। যারা কোটি কোটি মানুষের রক্ত শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে ভুলতে চায়: যারা কোটি কোটি মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে তাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ও নজর-নিয়াজ ভোগ করার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মাঝখানে মধ্যস্বত্ব ভোগকারী হয়ে আল্লাহর বান্দার উপর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা কালেমার বিপ্লবী দাওয়াতকে সব সময়ই নিজেদের জন্য মৃতার পরওয়ানা মনে করে আসছে। শুধু মনে করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং সর্বশক্তি দিয়ে এর বিরোধিতা করে আসছে। সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে আসছে। সমস্ত নবী-রাসূলদের দাওয়াতের বিরোধিতা এরাই করেছে। নবী-রাসূল এবং তাঁদের অনুসারীদের উপর যুগে যুগে সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন এদের পক্ষ থেকেই চালানো হয়েছে। আজকের দিনেও এই চিরন্তন নিয়মে দুনিয়ার সর্বত্রই একই কারণে একই শ্রেণীর লোকদের পক্ষ থেকে জুলুম-নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তাই এই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বিরোধিতাকে আমরা ইসলামী আন্দোলনের চিরন্তন সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি। এই বায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী মানুষের সমাজের ক্ষুদ্র একটি অংশ। কিন্তু এরা অতি নগণ্য সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও সমাজে সংখ্যাগুরু অংশের উপর বিভিন্নভাবে এদের কর্তৃত্ব ও প্রস্তুত্ব প্রতিষ্ঠিত। এই গোষ্ঠীকে আমরা তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করতে পারি।

এক: খোদাদ্রোহী রাষ্ট্রশক্তি, খোদাদ্রোহী মতবাদ ও আদর্শের অনুসারী রাজনৈতিক শক্তি ও তাদের পৃষ্ঠপোষক সামরিক, বেসামরিক, উচ্চেপদস্থ আমলা গোষ্ঠী। আল্লাহর দ্বীন কায়েম না থাকায় এরা যেভাবে ক্ষমতার মোহ চরিতার্থ করার সুযোগ পায়: যেভাবে সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রেখে তাদের অধিকার হরণ করার প্রয়াস পায়, যেভাবে দেশের ও জাতির ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে সক্ষম হয়, যেভাবে দেশের ও জাতির সম্পদ নিজেদের স্বার্থে নিজেদের খেয়াল-খুশিমত ব্যবহার করতে সক্ষম হয়, আল্লাহর আইনের শাসন কায়েম হলে সে সুযোগ থাকবে না, এ আশংকার পাশাপাশি তাদের অপরাধী মনের অজান্তে সম্ভবত: এ আশংকাও হয়ত বা জাগে যে, আদের এই মানবতা বিরোধী কার্যক্রমের জন্য না জানি কোন ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয় যদিও ইসলামে এরূপ কোন হিংসাত্মক প্রতিশোধ গ্রহণের নজির নেই। বরং ইসলাম বিজয়ী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর ক্ষমার মহানুভবতাই প্রর্দশন করছে, এটাই ইসলামের নিজস্ব ঐতিহ্য। এরপর মানবতা ও মনুষত্বের দুশমন এই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ইসলামের জয়যাত্রাকে কিছুতেই বরদাশত করতে পারে না। ক্ষমতার মোহ অ্যাগ করতে না পারা এর কারণ।
দুই: এই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত দ্বিতীয় সংখ্যালঘু শ্রেণীটিকে আমরা অসাধু খোদাদ্রোহী ধনিক শ্রেণী হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি। আল্লাহর দ্বীন কায়েম না থাকার কারণে, হারাম হালালের সীমা না থাকার ফলে, আয় রোজগারের ব্যাপারে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে নীতি নৈতিকতার বালাই না থাকার ফলে এরা কোটি কোটি মানুষের রক্ত শোষণ করে সম্পদ উপার্জনের সুযোগ পাচ্ছে, খোলাহীন রাষ্ট্রশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জাতির সর্বনাশ করে নিজেদের ভাগ্য গড়ার সুযোগ পাচ্ছে, তাদেরও মনের অজান্তে ভয় ও আশংকা বিরাজ করে, অন্য কোন আদর্শ বা তন্ত্র মন্ত্র আসে আসুক, তাদের ধারক-বাহকদেরকে আয়ত্বে আনা বা ম্যানেজ করা তেমন কঠিন ব্যাপার নয়। সাম্প্রতিক কালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর নজির রয়েছে, অতএব এরা ইসলাম বাদ দিয়ে আর সব ধরনের রাজনৈতিক মতাদর্শকে বরদাশত করতে প্রস্তুত, কিন্তু ইসলামকে, আল্লাহর আইনকে বরদাশত করতে পারে না। কারণ আল্লাহর আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত শাসন ও সমাজ ব্যবস্থায় এভাবে অবৈধ আয় রোজগারের যেমন সুযোগ নেই, তেমনি সুযোগ নেই মানুষের অধিকার হরণের। জাতীয় সম্পদ লুটপাট করে খাওয়ার অভ্যাস যাদের মজ্জাগত তারা আল্লাহর দ্বীনের ভিত্তিতে ন্যায় ইনসাফের সমাজ গড়ে ওঠাকে তাদের জন্য চরম বিপজ্জনক ভাবে। আই আরা জান প্রাণ দিয়ে খোদাদ্রোহী রাষ্ট্রশক্তি ও খোদাহীন রাজনৈতিক শক্তিসমূহকে বিভিন্ন মুখী সহযোগিতা দিয়ে তাদের মাধ্যমে ইসলামী শক্তিকে পর্যুদস্ত করার অপপ্রয়াস চালায়।
তিন: এই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর অপর অংশটি মূলত উপরোল্লিখিত দুইটি শ্রেণীর স্বার্থেই সৃষ্ট। এই জন্য এদের দরবারের সাধারণ মানুষের আনাগোনা দেখা গেলেও প্রধানতঃ আনাগোনা খোদাদ্রোহী রাষ্ট্রশক্তির ধারক-বাহক এবং অসাধু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীরই। আল্লাহর দ্বীন তার মূল প্রাণ শক্তিসহ অর্থাৎ বিপ্লবী চরিত্রসহ সমাজে যাতে কায়েম হতে না পারে সেজন্য জনগণের ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্যে উপরোক্ত দুই শ্রেণীর খোদাদ্রোহী শক্তি দ্বীন-ধর্মের নামে ধর্মগুরু বা আধ্যাত্মিক গুরুর অনুরূপ একটা ইনস্টিটিউশনের জন্ম দিয়েছে। আজকাল এ ধরনের ইনস্টিটিউশনে আন্তর্জাতিক শক্তি সমূহের আনাগোনাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর রহস্য এক এবং অভিন্ন। ইসলামী বিপ্লব সফল হলে, ইসলামের বিপ্লবী চেতনার সাথে জনগণ পরিচিতি হলে, জনমনে ইসলামী বিপ্লবী চেতনা প্রতিষ্ঠিত হলে, আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মাঝে আর কারো মধ্যস্বত্ব ভোগ করার সুযোগ থাকবে না। এটা জেনে বুঝে কোন মধাস্বত্ব ভোগকারী তার ভোগের সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইতে পারে না। তারাও মনে করে যে কোন রাষ্ট্রশক্তি বা রাজনৈতিক শক্তির সাথে তাদের আপোষ হতে পারে। আজকের বিশেষ প্রেক্ষাপটে ধণতান্ত্রিক দেশ আমেরিকা এবং সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়া বিপ্লবী চেতনাবিহীন ধর্মীয় ইনস্টিটিউশন মেনে নিতে রাজী আদের রাজনৈতিক স্বার্থে। শুধু রাজী বলণে সহ্যের অপলাপ হয়। বরং এ ধরনের বিপ্লবী চেতনা বর্জিত ধর্মীয় কার্যক্রমকে তারা তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব প্রতিপত্তি সংরক্ষণের জন্য নয়াকৌশল হিসাবেই গ্রহণ করেছে। চিরন্তনভাবে ইসলামী আন্দোলনের পথে বাধা-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী উল্লেখিত তিন শ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক ময়দানে নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হবার কারণে, ইসলামী আন্দোলনে নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের অংশগ্রহণ প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় থেকে যায়। তাই যোগ্য নেতৃত্বের এ প্রকট অভাবও ইসলামী আন্দোলনের চিরন্তন সমস্যার অন্তর্ভুক্ত। অথচ আন্দোলনের মূল চালিকা শক্তিই হল নেতৃত্ব।

চিরন্তন সম্ভাবনা

দ্বীন ইসলাম দ্বীনে ফেৎরাত। মানুষকে আল্লাহ তায়ালা যে স্বভাব ও প্রকৃতি দান করেছেন, দ্বীন ইসলাম। সেই স্বভাব ও প্রকৃতির পরিপূর্ণরূপে সামঞ্জস্যশীল। মানুষ জন্মগত ভাবে সত্যকে পছন্দ করে আর মিথ্যাকে করে অপছন্দ। মানুষ জন্মগতভাবে ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে। মানুষ জন্মগতভাবেই ইনসাফের পক্ষে এবং জুলুমের বিপক্ষে। জন্মগতভাবেই মানুষ শান্তির পক্ষে এবং অশান্তির বিপক্ষে। আল্লাহর সৃষ্টি মানব প্রকৃতির স্বাভাবিক দাবীই হল পূত পবিত্র জীবন যাপন এবং অপবিত্রতা ও পংকিলতা থেকে নিষ্কৃতি লাভ। আল্লাহ প্রদত্ত মানুষের এই বিবেক, বিবেকের রায়, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে সাময়িক অবদমিত থাকতে পারে। কিন্তু কোন অবস্থায় একেবারে বিলীন হয়ে যায় না। আমরা এ ব্যাপারে একবার আমাদের দৃষ্টিকে আইয়্যামে জাহেলিয়ার সেই অগ্নকার যুগের দিকে ফিরিয়ে দেখতে পাখি। সেখানে অজ্ঞতার কারণে জাহেলিয়ার পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে সমাজের শতকরা নিরানব্বই ভাগ মানুষ অন্যায়, অনাচারে লিপ্ত, মিথ্যা ও পাপাচারে নিমজ্জিত। সেই যুগেই আল্লাহর শেষ নবী (সা.) তাঁর নবুয়াতের ঘোষণার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তাদের মাঝে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ হিসাবে পরিচিত। আল্লাহর বিশেষ হেফাজতে তিনি মাসুম বা নিষ্পাপ জীবন যাপন করেছেন। সমাজের অন্যদের সাথে তাল মিলিয়ে তিনি মিথ্যা বা পাপাচারে অংশ নেননি। অন্যায় অনায়ার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন। শুধু তাই নয়, অনাচার-দুরাচার থেকে সমাজকে যুক্ত করার জন্য তিনি হিলফুল-ফুজুলে শরীক হয়েছেন। জালেমের জুলুম থেকে মজলুমকে রক্ষা করার জন্য, অশান্তির কবল থেকে সমাজকে মুক্ত করে শান্তির সমাজ গঠনের জন্য তিনি বাস্তব পদক্ষেপও নিয়েছেন। সে পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হয়নি এটা জিন্ন কথা। আল্লাহর পক্ষ থেকে তখনও হেদায়েত আসেনি বলেই মানুষের মগজ প্রসূত ঐ কর্মসূচি সফল হতে পারেনি। কিন্তু মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সততা ও বিশ্বস্ততা তথা তাঁর জীবনের পবিত্রাতাকে পাপাচারে লিপ্ত লোকেরাও স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। জাহেলী যুগের সেই মিথ্যা ও অনাচারে লিপ্ত লোকেরাই তাঁকে আশ আমীন, আস সাদেক নামে অভিহিত করেছে। এটা একটা জ্বলন্ত প্রমাণ যে মানুষের বিবেক, তার বিবেকের বিচার শক্তি একেবারে শেষ হয়ে যায় না। চরম অজ্ঞতায় নিমজ্জিত অবস্থায়ও সে ভালকে ভাল এবং মন্দকে মন্দ বলে রায় দিতে সক্ষম।
আজও যদি আমরা কোন মিথ্যাবাদী লোকের সাথে একান্তে আলাপ করি, জিজ্ঞাসা করি কাজটা ভাল না মন্দ, যে অকাতরে স্বীকার করবে কাজটা খারাপ। কিন্তু সে এটা বর্জন করতে পারছে না, এটা তার দুর্বলতা। একজন ঘুষখোর মানুষকে যদি আমরা একান্তে জিজ্ঞাসা করি কাজটা ভাল না মন্দ, সেও অকপটে স্বীকার করবে কাজটা খারাপ। তবে সে এটা বর্জন করতে পারছে না, এটা তার দুর্বলতা। এমনিভাবে যে কোন অন্যায়ে লিপ্ত ব্যক্তিকে যদি আমরা তার কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞসা করি তাহলে একই উত্তর পাওয়া যাবে। মানুষের এই বিবেক ইসলামী আন্দোলনের চিরন্তন পুঁজি। আল্লাহ তার দ্বীন মাদার জন্য মানুষের এই বিবেককেই জাগ্রত করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। মানুষের সমাজের সক্রিয় ও সচেতন অংশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকদের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারণে দ্বীনের দাওয়াত গ্রহণের ক্ষেত্রা উর্বর হতে বাধ্য। উপরন্ত আল্লাহর দ্বীন যেখানে কায়েম নেই, সেখানে যেহেতু ইনসাফ থাকতে পারে না, শাস্তি থাকতে পারে না, বরং অশান্তি জুলুম শোষণই হয় সমাজের মানুষের নিত্যকার সাথী। সেই পরিস্থিতি ও পরিবেশে অধিকাংশ লোকই ক্ষতিগ্রস্ত এবং সর্বস্বান্ত হয়, আর ফায়দা লুটে খায় মুষ্টিমেয় কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী। অতএব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার মনে অন্যক্ত ব্যথাবেদনা থাকাই স্বাভাবিক। এখানেই শেষ নয়, এ অবস্থা থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতির জন্য তাদের মনে একটা আকুতিও থাকার কথা। এ অবস্থায় তাদের মাঝে ইসলামের ঠিক দাওয়াত উপস্থাপিত হলে তারা এতে তাদের মনের অব্যক্ত আকুতির প্রতিধ্বনীই শুনতে পাবে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সাধারণ মানুষ বা নির্যাতিত নিপীড়িত গরীব শ্রেণীর মানুষ স্বেচ্ছায় স্বত:স্ফূর্তভাবে কোন দিনই ইসলামী দাওয়াতের বা আন্দোলনের বিরোধিতা করেনি। আমাদের বর্ণিত তিন শ্রেণীর কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব প্রতিপত্তি এবং প্রচারণার ফনেই তারা দুনিয়ার ইতিহাসে বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র। এই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী দ্বারা জনগণের অংশ হিসাবে আরাও ক্ষতিগ্রস্ত। অতএব সঠিকভাবে, সাফল্যজনকভাবে হিকমত প্রয়োগ করে ইসলামের বিপ্লবী দাওয়াত মানুষের কাছে পেশ করতে পারলে আজ হোক, কাল হোক সাধারণ মানুষের মনকে এ লাওয়াত নাড়া দিবেই। শর্ত হল, জুলুম-শোষণ এবং নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি যাদের কামা-আল্লাহর দ্বীন কায়েম হলেই যে, তাদের এ কামনা-বাসনা পূরণ হবে, এছাড়া আর কোন শখেই এটা পূরণ হবার নয়; যোগ্যতার সাথে এ দাওয়াতকে সেইভাবে উপস্থাপন করা।

সমস্যা আজকের প্রেক্ষাপটে

আজকের প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলনের সমস্যাকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি।
(ক) বাইরের সমস্যা,
(খ) আভ্যন্তরীণ সমস্যা।

বাইরের সমস্যা

বাইরের সমস্যাকেও আবার আমরা তিন ভাগে আলোচনা করতে পারি।
এক: বিশ্বের দুটি পরাশক্তি সৃষ্ট সমস্যা ও তাদের সরাসরি ভূমিকা।
দুই: পরাশক্তি সমূহের প্রভাব বলয়াধীন নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিসমূহ।
তিনঃ মুসলিম শাসক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামের নাম ব্যবহারের নতুন কৌশল যা প্রতিপক্ষের সাম্রাজাবাদী শক্তিসমূহেরই নতুন রণনীতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
এক: বিশ্বের পরাশক্তিগুলো তৃতীয় বিশ্বে তাদের মুরুব্বীয়ানা ও মোড়লীপনা বহাল রাখার জন্য স্বৈরতন্ত্রকে লালন পালন করছে। দুর্ভগ্যবশত: মুসলিম জনবসতি প্রধান দেশগুলো এই তৃতীয় বিশ্বেরই অন্তর্ভুক্ত। সম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ এইসব দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সাহায্য সহযোগিতার ভান করে। কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি অগ্রগতি নির্ভর করে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর, সেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্টকারী শক্তিসমূহকেই তারা বাস্তবে উৎসাহ যুগিয়ে আসছে। মুখে অবশ্য তারাও সাবী করে, তারা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কামনা করে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এ সব দেশে নিজের রাজনৈতিক পদ্ধতি বা ইনস্টিটিউশন গড়ে উঠুক এ ব্যাপারে তাদের না আছে মাথা ব্যথা আর না আছে কোন আন্তরিকতা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বের বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্টের প্রধান কারণ সামরিক জান্তাদের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। আর এই হস্তক্ষেপ হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং প্ররোচনায় মুসলিম দেশগুলোতে বার বার সামরিক শাসন জারী হওয়া। সামরিক শাসন জারীর পর ক্ষমতার ছত্রছায়ায় রাজনৈতিক দল গঠন ও জনগণকে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না। দিয়ে নির্বাচনের নামে প্রহসন, রাজনীতিকে সামরিকীকরণের যাবতীয় কলা কৌশলের পিছনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদ রয়েছে। তারা এটা করছে মূলত বিশ্বের সর্বত্র ইসলামী গণজাগরণ ঠেকাবার জন্যই। তারা বিশ্বাস করে মুসলিম দেশগুলোতে যদি রাজনৈতিক পদ্ধতি ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সু-প্রতিষ্ঠিত হয়ে। যায়, যদি জনগণের রায়ের ভিত্তিতে সরকার গঠন ও পরিবর্তনের ব্যাবস্থা ও প্রক্রিয়া পাকাপোক্ত হয়ে যায়, তাহলে এইসব দেশে ইসলামী সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা কায়েম হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। দু’দিন আগে হোক আর পরে হোক ইসলামী সমাজ বিপ্লব অবধারিত। এই বিপ্লবের ঢেউ একদিন তাদেরকেও প্লাবিত করতে পারে, এই ভয়ে ভীত হয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আদের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব শেষ হবার আশংকায় তারা এই ভূমিকা পালন করে চলেছে। এইভাবে মুষ্টিমেয় লোকদের মাথা কিনে তারা এক একটা দেশকে, এক একটা জাতিকে পদানত করে রাখতে বদ্ধপরিকর।
দুই: বাইরের সমস্যা। দ্বিতীয় দিকটির সাথে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রশক্তি এবং খোদাদ্রোহী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ জড়িত। পরাশক্তি সমূহের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য স্ব স্ব দেশে ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন সমূহের উপর জুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে। বল প্রয়োগ করে আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেখার অপ-প্রয়াস চালাচ্ছে। অপপ্রচার ও মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে এসব আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদী শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করে অত:পর বেআইনী ঘোষণা করার মত ঘৃণ্য কাজকর্ম করতেও তারা কসুর করছে না। তারা জনগণকে ধোঁকা দেবার জন্য ইসলামের কথা মুখে মুখে উচ্চারণ করলেও ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন সমূহের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে তারা ইসলামের প্রকাশ্য দুশমনদের সাহায্য করে, অথবা সাহায্য গ্রহণ করে থাকে। অপরদিকে গণতন্ত্রের শ্লোগান দিয়ে যারা এসব স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, তারাও স্বৈরশাসকদের পক্ষ থেকে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে গৃহীত গণবিরোধী কার্যক্রমকে সমর্থন দিছে বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করে না। এভাবে পরিস্থিতি গভীরে পৌঁছার প্রয়াস পেলে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ পাওয়া যাবে। গণবিরোধী সামরিক স্বৈরতন্ত্র আর খোদাদ্রোহী রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা ইসলামের বিরুদ্ধে। ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক ও অভিন্ন। এদের যৌথ উদ্যোগে ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনের বিরুদ্ধে একদিকে চলে অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রপাগান্ডার ঝড় তুফান-অপরদিকে চলে বল প্রয়োগের মাধ্যমে এই আন্দোনানের নেতা ও কর্মীদেরকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপকৌশল ও অপ্রয়াস। আদের এহেন অপকৌশলের ধরন। প্রকৃতি আজকের মুসলিম দেশগুলোর প্রায় সর্বত্রই এক এবং অভিন্ন। মিশর, সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ইসলামী আন্দোলন প্রায় একই অবস্থা ও পরিস্থিতির শিকার। এর মধ্যে যারা সর্বাবস্থায় জনগণকে সাথে রাখতে। পেরেছে অথবা জনগণের সাথে থাকার কৌশল ও বাস্তব পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছে, তারা ময়দানে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থাকে সুসংহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর যারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তারা সাময়িকভাবে হলেও বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
বস্তুত: জনগণকে সাথে রাখতে পারার যোগ্যতার উপরই এ সমস্যার মুকাবিলা করা নির্ভরশীল। এ জন্য একদিকে যেমন আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের গণমুখী চরিত্র ও গণমুখী ভূমিকা অপরিহার্য তেমনি বুদ্ধিমত্তার ও বিচক্ষণতার সাথে অপ্রচারের মোকাবিলা করে জনমনের বিভ্রান্তি দূর করা এবং সৎসাহসের সাথে, বলিষ্ঠতার সাথে ময়দনে টিকে থাকা জনশক্তিকে জনগণের মাঝে সদা সক্রিয় রাখা অপরিহার্য। ঠান্ডা মাখায় এ পরিস্থিতির মুকাবিলা করে ময়দানে টিকে থাকতে পারণে প্রতিপক্ষের প্রতিটি পদক্ষেপ বুমেরাং হতে বাধ্য।
তিন: এই পর্যায়ে তৃতীয় সমস্যাটি সৃষ্টি হয় চরিত্রহীন, গণবিরোধী স্বৈরশাসকদের পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলামের নাম ব্যবহারের ফলে, এই সমস্যাটি এই দৃষ্টিতে বাইরের সমস্যা যে, এটা যারা সৃষ্টি করে তাদের সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই। আদের মন মগজে চরিত্রে ইসলাম নেই শুধু তাই নয়, বরং তারা বাস্তবে ইসলাম বিরোধী। ইসলামী আন্দোলনের শত্রুদের হাতের ক্রীড়নক। ইসলামী আন্দোলন ঠেকাবার জন্যেই এরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষ হয়ে ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু ইসলামী উদ্দার একাংশ রাজনৈতিক দেদার আভান হেতু তাদের এই নোসখায় সাময়িনের জন্যে বলেও বিভ্রান্ত হয়। এমন কি রাজনৈতিক দিক দিয়ে অপরিপক্ক কিছু আলেম ওলামা, গণবিরোধী চরিত্রহীন মুসলিম নামধারী স্বৈর শাসকদের মুখে ইসলামের কথা শুনে অনেক সময় সরল বিশ্বাসে ধোঁকার পড়ে যায়। এবং ইসলামী আন্দোলনের জন্যে কিছুটা সমস্যা সৃষ্টির প্রয়াস পায়, যেটা বাইরের সমস্যার পরিবর্তে আভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসাবে বিবেচিত হবার যোগ্য।
মুসলিম দেশ সমূহের শাসকদের মাধ্যমে সরাসরি ইসলামের বিরোধিতা করে সম্রোজ্যবাদী শক্তির একটা তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারা উপলব্ধি করছে এভাবে সরাসরি ইসলামের, ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করে তাদের সুবিধার পরিবর্তে বরং অসুবিধাই হচ্ছে বেশী। পক্ষান্তরে এতে ইসলামী আন্দোলন আরো বেশী শক্তি পাচ্ছে, বীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী ইসলামী গণজাগরণের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে, অতএব তারা ইসলাম ঠেকানোর, ইসলামী জাগরণ ঠেকাবার জন্য তাদের রণকৌশল পাল্টিয়েছে।
বিপ্লবী ইসলাম ঠেকাবার জন্য বিপ্লবী চেতনাবিহীন ধর্মীয় কার্যক্রমকে সরকারীভাবে আনজাম দেয়ার ব্যবস্থা করে সাধারণ মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। এর মধ্যে জনগণের মাধ্যমে তাদের ইসলাম বিরোধী রূপটি লুকাবার প্রয়াস পায়, অপর দিকে তাদের সকল গণবিরোধী কার্যক্রমের দায়দায়িত্ব ইসলামের খাড়ে চাপিয়ে দেয়। অর্থাৎ ইসলামের দুশমনদেরকে ইসলামকে শোষণের জুলুমের হাতিয়ার রূপে চিহ্নিত করার সুযোগ করে দেয়। যার ফলে আধুনিক শিক্ষিত, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ যুব সমাজের মনকে ইসলামের ব্যাপারে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। সরাসরি ইসলামের বিরোধিতা করার তুলনায় ইসলামের নাম দিয়েই এরা ইসলামের সবচেয়ে বেশী ক্ষতিসাধনের প্রয়াস পাচ্ছে। এ সমস্যার মুকাবিলার জন্য একদিকে যেমন ইসলামের সঠিক ধারণা, ইসলামের বিপ্লবী চেতনার সাথে জনগণকে বেশী বেশী পরিচিত করা দরকার, তেমনি দরকার ইসলামী জনতাকে রাজনৈতিকভাবে আরো বেশী সজাগ-সচেতন করা। সেই সাথে অতীতের মুসলিম নামধারী জালেম-শাসকদের প্রতি ওলামায়ে হক তথা মুজাদ্দিদ ও মুজতাহিদগণের আপোষহীন ভূমিকা সম্পর্কেও মুসলিম উম্মাকে এবং আলেম সমাজকে অবহিত করতে হবে। অতীতের শাসকগণ বর্তমানের শাসকগোষ্ঠীর তুলনায় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের অনেক বেশী পাবন্দ হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের মূলনীতি এবং সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার বিকৃতি ঘটানোর কারণে তাদের সমকালীন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আলেম ওলামা (যারা ইসলামের ইতিহাসে আ-দত্তায়ে মুজতাহেদীন এবং মুজাদ্দেদীন নামে পরিচিত) তাদের ধারে কাছেও ঘেঁছেনি। এমনকি তাদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়া পছন্দ করেছেন, কিন্তু তাদের দরবারে কোন পদমর্যাদা গ্রহণে রাজি হননি। ইসলামী উম্মার স্বীকৃত চারজন ইমামের তিনজনই তাদের সমকালীন শাসকদের হাতে জুলুম নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু তাদের সাথে আপোষ করেননি। তাদেরকে ইসলামের খাদেম হিসাবে কোন সার্টিফিকেট দেননি। এটাই ওলামায়ে হক্কানীর সত্যিকারের ঐতিহ্য। আর আলেম নামধারী যারা এধরনের শাসকদের দরবারে আসা-যাওয়া, উঠা-বসা করেছেন, বিভিন্ন পদমর্যাদা, নজর, নিয়াজ, উপহার, উপঢৌকন লাভ করেছেন, তাদেরকে ইসলামের খাদেম বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। আমাদের ইতিহাসে তারা ওলামায়ে সু’বা- আলেম সমাজের কলংক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন।

আভ্যন্তরীণ সমস্যা

ইসলামী আন্দোলনের আভ্যন্তরীণ সমস্যাকেও আমরা দুই ভাবে আলোচনা করতে পারি।
এক: সহায়ক শক্তির সমস্যা
দুই: আন্দোলন ও সংগঠনের নিজস্ব সমস্যা
এক: সহায়ক শক্তির সমস্যারও আবার তিনটি দিক রয়েছে:
(ক) আলেম ওলামার সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্যা;
(খ) সাধারণ দ্বীনদার লোকদের সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্যা;
(গ) ইসলামের সঠিক ধারণা ও চেতনা সংক্রান্ত সমস্যা;

আলেম ওলামা সংক্রান্ত সমস্যা
বৃটিশ ভারতের আমল থেকে আমাদের দেশের আলেম সমাজকে আর্থ-সামাজিকভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। এরপর আমরা দু’বার স্বাধীন হওয়া সত্বেও সেই অবস্থার কোন গুণগত পরিবর্তন হয়নি। বরং খোদ বৃটিশের আমলে আলেম সমাজের যতটা মর্যাদা ছিল, বৃটিশ বিদায় নেয়ার পর তাদের মানসপুত্রদের শাসন আমলে সেই মর্যাদাটুকুও অবশিষ্ট রাখা হয়নি। ফলে আলেম সমাজের বৃহত্তর অংশ নিজেদের বিশেষ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে আসছেন। তবে দ্বীনি শিক্ষার অনিবার্য দাবী অনুসারে এদের বৃহত্তম অংশ ইসলামী আন্দোলনের সমর্থক এবং সহায়ক। কিন্তু সক্রিয় ভূমিকা না রাখার কারণে তাদের এই সমর্থন ও সহযোগিতা তেমন একটা অনুভূত হয় না। পক্ষান্তরে খুবই নগণ্যসংখ্যক লোক নিজে ভুল বুঝে, অথবা অন্যের প্ররোচনায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করে থাকেন। আলেম সমাজের এই অংশের সংখ্যা খুবই নগণ্য হলেও এদের অনেকেই ইসলাম বিরোধী শক্তি, বিশেষ করে রাষ্ট্রশক্তি হাতিয়ার স্বরূপ ব্যবহার করার কারণে এরা মানুষের চোখে পড়ে বা এদের ভূমিকাটা বিভিন্ন মহলের আলোচনা ও পর্যালোচনার সুযোগ পায়। ইসলাম বিরোধী মহল প্রাচার প্রোপাগান্ডার ময়দানে অপেক্ষাকৃত বেশী অভিজ্ঞ ও দক্ষ হওয়ার ফলে এদেরকে গোটা আলেম সমাজের মুখপাত্রের ভূমিকায় নিয়ে আসে। ফলে এদের মাধ্যমে সাধারণ জনমতও বিপ্রাপ্ত করার অপপ্রায়াস চালায় এবং অনেকাংশে আরা সফলকামও হয়ে থাকে। এই ধরনের সমস্যাটা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের বেশ কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন করে, কিন্তু একটু উদারাভাবে দেখলে এর বিরুদ্ধে লোকদের বিরোধিতাকে একান্ত আপনজনের সমালোচনা গালমন্দ হিসাবেও এটাকে সহজভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। এভাবে এটাকে সহজভাবে গ্রহণ করেই এ পর্যায়ের বিরোধিতাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করাই হেকমাতের দাবী।
এ পর্যায়ের সমস্যা যেহেতু ভিত্তিহীন কিছু কাল্পনিক অভিযোগের মাধ্যমেই সৃষ্টি করা হয়, অতএব ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিগণ আদের বাস্তব আমল-আখলাক দ্বারাই এর মোকাবিলা করতে সক্ষম। তাদের অভিযোগের সাথে আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের কথা ও কাজকে জনগণ মিলিয়ে দেখার প্রয়াস পেলে অবশ্যই তাদের অভিযোগগুলো অসত্য ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হবে। এ ছাড়া যে সব সহজ সরল আলেমে দ্বীন অন্যাদের প্ররোচনায় ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেন, আন্দোলনের ব্যক্তিদের সাথে তাদের ওঠাবসার সুযোগ হলে ইসদামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের চালচলন আচার-ব্যবহার তাদের নিকট থেকে দেখার সুযোগ পেলে, তাও দূর হয়ে যেতে বাধ্য। অতএব আমাদের দেশের আলেম সমাজের এক অংশের এই বিরোধিতা ও সমালোচনাকে সমস্যা মনে না করে আমরা এটাকে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বীনি যোগ্যাতা বৃদ্ধির একটা উছিলা হিসাবেও নিতে পারি।

সাধারণ দ্বীনদারদের সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্যা

আমাদের দেশের সাধারণ দ্বীনদার লোকেরা ইসলামী আন্দোলনের প্রধান সহায়ক শক্তি। এদের দ্বীনি আবেগ-অনুভূতিকে ইসলামের চিহ্নিত দুশমনেরাও হিসাব করে। কিন্তু সমাজের সবচেয়ে সহজ ও সরল প্রকৃতির মানুষের পক্ষে রাজনৈতিক মারপ্যাচ এবং কলাকৌশল বুঝে উঠা অসম্ভব। সেই কারণে বিভিন্ন মহল তাদের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগাতে পারে। বাস্তবে লাগায়ও। ইসলামের নাম নিয়ে ইসলামের কট্টর দুশমন ব্যক্তিরাও যেমন তাদেরকে ধোঁকা দেয়ার প্রয়াস চালায়, তেমনি দ্বীনের লেবাসধারী লোকদের আরাও এরা বিভ্রান্ত হতে পারে, হয়ে থাকে। এ সমস্যা মুকাবিলার একমাত্র উপায়, এদেরকে আসল পুঁজি ধরে নিয়ে একান্ত সহানুভূতি ও পূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে এদের সাথে সংযোগ ও সম্পর্ক রক্ষা করা। ব্যাপক যোগাযোগের মাধ্যমে এদেরকে রাজনৈতিক দিক দিয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। আন্দোলনের বহির্মুখী সকল কর্মসূচীতে এদের ব্যাপক অংশ গ্রহণের ব্যবস্থা নিয়ে এদের মাঝে বিপ্লবী চেতনা সৃষ্টি করতে হবে। ইসলাম বিরোধী মহলের রাজনৈতিক কূটকৌশল সম্পর্কে তাদেরকে সজাগ ও সচেতন করে ভুলতে হবে। ইসলামী আন্দোলনের গণমুখী কার্যক্রমে এদের যত বেশী সামিল করা যাবে, তত বেশী পরিমাণে এদের মন মগজে ইসলামের বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটবে এবং সাধারণ রাজনৈতিক চেতনাও বৃদ্ধি পাবে। এই মহলকে তাদের মনের ষোলআনা আবেগ-অনুভূতি সহকারে পেতে হলে, ইসলামী আন্দোলনের দ্বীনি মর্যাদার যথার্থ প্রতিনিধিত্ব একান্তই অপরিহার্য। এজন্যে আন্দোলনের জনশক্তির বিশেষ করে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দ্বীনি যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে।

ইসলামের সঠিক ধারণার অভাবজনিত সমস্যা

আমাদের দেশের মানুষ ঐতিহ্যগতপ্রবে ধর্মপ্রাণ। ইসলামের সঠিক ধারণা না থাকলেও ইসলামের প্রতি। তাদের মনে গভীর আবেগ-অনুভূতি আছে। কিন্তু ইসলাম যে একটি পূর্ণাংগ জীবন বিধান, ইসলাম যে একটা বিপ্লবী আদর্শ, ইতিপূর্বে এই অঞ্চলে এর চর্চা ছিল না। ইসলাম এর বিরোধী মতবাদ-মতাদর্শকে গ্লান করে দিতে সক্ষম হয়েছে। ইসলামের বিরোধিতা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মুসলমান নামধারীদের মাধ্যমেই হচ্ছে। মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসে এমন লোকেরাও মনের অজান্তে অবচেতন মনে ঐসব ইসলাম বিরোধী কার্যক্রমের সহায়ক শক্তিরূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটাও মাঠে-ময়দানে কর্মতৎপর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। বাস্তবে করেও থাকে। কিন্তু একটু হবরের সাথে ব্যাপারটি বিশ্লেষণ করলে, মনের সকল বিরক্তি দূর করে এদের প্রতি আমরা সহানুভূতিশীল হতে পারি। অতীতে এদের সামনে ইসলামের এই বিপ্লবী দিক তুলে ধরা হয়নি বলেই তারা এ পরিস্থিতির শিকার। বর্তমানে ইসলামী আন্দোলনের সাহিকোর প্রচার-প্রসারের ফলে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, দেশের ওয়াজ মাহফিলগুলোর ধরন-প্রকৃতিতে পর্যন্ত পরিবর্তন আসা শুরু করেছে। ওয়ায়েজদের ভাষায় এখন ইসলামের বিপ্লবী দিকের উপস্থাপনা শুরু হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে ইসলামের বিপ্লবী দাওয়াতকে যত দ্রুতগতিতে ছড়ানোর চেষ্টা করা হবে, এত দ্রুত এই সমস্যা কেটে যাবে। তাই এটা আদৌ সমস্যা মনে না করে বরং আমাদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। আল্লাহর বান্দাদের কাছে দ্বীনের সঠিক দাওয়াত পরিবেশনের যে দায়িত্ব আমরা গ্রহণ করেছি, সে ব্যাপারে আমরা কতটা নিষ্ঠার পরিচয়। দিচ্ছি। কতটা যোগ্যতার সাথে সে দায়িত্ব পালন করছি।

নিজস্ব সমস্যা

আন্দোলন ও সংগঠনের নিজস্ব সমস্যা আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আলোচনা করতে হয় নেতৃত্বর সমস্যা। ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্ব সমাজ গঠনের প্রধান উপাদান। ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ গড়ার আন্দোলনে যে বাঞ্ছিত মানের নেতৃত্ব অপরিহার্য, বর্তমানে ঘুণে ধরা সমাজে, নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার এই সমাজে তা পাওয়া দূরহ ব্যাপার। যুগ যুগ ধরে ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা। এই দর্শনের ফলে মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব ঐসব লোকদের মধ্যে কুক্ষিগত হয়ে গিয়েছে যারা বাস্তবে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বঞ্চিত। ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্বের জন্য সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতার সাথে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সাহসিকতা অপরিহার্য। কিন্তু কোন এক ব্যক্তির মাঝে আজকের দিনে গুণগুলোর সমাবেশ প্রায় অসম্ভব ও অকল্পনীয় ব্যাপার হয়ে আছে। যাদের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও নীতি নৈতিকতা আছে, দুর্ভাগ্যবশত: তারা সমাজে যোগ্য, দক্ষ এবং সাহসী হিসাবে স্বীকৃত নয়। আর যাদের যোগ্যতা এবং সাহসিকতা আছে তাদের মধ্যে সততা ও নীতি নৈতিকতার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়। দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিক্রিয়াও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। ইসলামী নেতৃত্বের জন্য একদিকে যেমন ইসলামের মূল উৎস কুরআন-হাদীসের সরাসরি জ্ঞান প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আধুনিক জীবন ও জগত সম্পর্কীয় সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয় জ্ঞান। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় না দ্বীনি মাদ্রাসাগুলো এ প্রয়োজন পূরণ করতে পেরেছে, না আধুনিক স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এ ব্যাপারে কোন অবদান রাখছে।
এ সমস্যার তড়িৎ কোন সমাধান নেই। ইসলামী আন্দোলনের সংগঠনকে এ সমস্যা সমাধানের জন্য একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজের রেডিমেড নেতৃত্ব যেমন এ সমস্যার সমাধান নয়, তেমনি এজন্য আসমান থেকেও নেতৃত্ব নাজিল হবে না, পাতাল স্কুড়েও বের হবে না। এই সমাজের সচেতন অংশের মধ্য থেকে মৌলিক মানবীয় গুণাবলীসম্পন্ন লোকদেরকে রসূলের (সা.) অরিকায় যথার্থ প্রশিক্ষণ দানে এবং মাঠে ময়দানে সক্রিয় ভূমিকা পালনের মধ্যেই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে ইসলামী সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলনের প্রধান কাজ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- এই নেতৃত্বের উপযোগী লোক তৈরীর কাজ। সত্যি বলতে গেলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় দানের জন্যে এই একমাত্র শর্তই দেওয়া হয়েছে। এই অভাব পূরণের জন্যে, একদিকে আন্দোলনে শরীক লোকদেরকে যোগ্যতা অর্জনের জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিরলস সাধনা করতে হবে। সেই সাথে কাতর কণ্ঠে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। অপরদিকে সমাজের সচেতন সক্রিয় ও মৌলিক মানবীয় গুণাবলী সম্পন্ন লোকদেরকে আন্দোলনে শরীক করার জন্যে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
এই পর্যায়ে অপর সমস্যাটি সৃষ্টি হয় ইসলামী আন্দোলনের বিপক্ষের শক্তির পক্ষ থেকে নানা বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা দানের মাধ্যমে এবং অবাস্তব অসম্ভব খালগুরা ওয়াদার মাধ্যমে জনমনে অন্ধ আবেগ সৃষ্টির মাধ্যমে। এ সমস্যার কারণে যদি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মনে অনুরণ পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা-ভাবনা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়, তাহলে সেটা আন্দোলনের জন্যে একটা আভ্যন্তরীণ সমস্যারূপে বিবেচিত হতে পারে। নতুবা একটা আদর্শবাদী আন্দোলনের জন্যে এটা কোন সমস্যা হতে পারে না, সমস্যা হওয়া উচিত নয়। কারণ বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারটি ব্যাপক হতে পারেনা। মুষ্টিমেয় লোকদের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। আর সেই মুষ্টিমেয় লোকেরা এ সমাজের কোন ভাল মানুষ হিসাবেতো পরিচিত নয়ই বরং তাদের সম্পর্কে জনমনে কোথাও গুপ্ত কোথাও প্রকাশ্যে ঘৃণাই বিরাজ করছে। আর অবাস্তব অসম্ভব ওয়াদা দ্বারা এদেশের জনগণ একবার দুইবার নয়, বার বার প্রতারিত,
অতএব তাদের অবাস্তব ওয়াদার মোকাবিলা করার জন্যে কোন সন্তা শ্লোগানের আশ্রয় নেয়ার আদৌ কোন প্রয়োজন হয়না। ব্যাপক গণসংযোগের মাধ্যমে, ইসলামী আন্দোলনের মাধ্যমে বাস্তব ও বিজ্ঞান সম্মত কর্মসূচীর প্রচার এবং রাসূলের (সা.) দেয়া সমাজ বিপ্লবের ইতিহাস জনগণের বোধগম্য ভাষায় তুলে ধরেই আমরা এর মুকাবিলা করতে পারি। আজকের মানুষ যেসব সমস্যায় জর্জরিত, এগুলোর মূল কারণ আল্লাহর আইন না থাকা, সৎলোকদের শাসন না থাকা, এই সহজ কথা দেশের অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত লোকেরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে। আল্লাহর আইন ছাড়া ও সৎলোকের শাসন ছাড়া মানুষের মনগড়া পথে চলায় যে কোন লাভ হয়নি তারা একথার বাস্তব সাক্ষী। তাই তাদের বিবেকের কাছে তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলাফল তুলে ধরে তাদেরকে বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি এবং যুক্তিভিত্তিক সমাধানের পক্ষে নিয়ে আসা আজ কোন কঠিন ব্যাপার নয়।
ইসলামী আদর্শ মুকাবিলা করার মত যেহেতু কোন আদর্শ নেই, ইসলামী আন্দোলনের প্রতিপক্ষ, আদের নেতৃত্বের যে মান মানুষের সামনে উপস্থাপন করছে, তাও ইসলামী নেতৃত্বের মুকাবিলায় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আদের আদর্শের স্বপক্ষে এবং ইসলামী আদর্শের বিপক্ষে পেশ করার মত কোন বিজ্ঞানভিত্তিক এবং যুক্তিভিত্তিক কোন পুঁজিই তাদের কাছে নেই। নেতৃত্ব, আদর্শ এবং কর্মসূচি কোনটা দিয়েই যেহেতু ইসলামী আন্দোলনের মুকাবিলা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, এজন্যে সর্বশেষ অবলম্বন, সর্বশেষ কৌশল হল সন্ত্রাস। একদিকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা, অপরদিকে বলপ্রয়োগ ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে তারা এমন একটা পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, যাতে করে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব মানুষের সামনে আসতে না পারে, ইসলামী আন্দোলনের আদর্শ ও কর্মসূচি স্বাচ্ছন্দ্যে জনগণের কাছে পৌঁছাতে না পারে। আরা এর মাধ্যমে এটাও কামনা করে যে, এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামী। আন্দোলনের লোকেরা অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় এবং এভাবে জনগণ থেকে এক পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ইসলামী আন্দোলনের জন্যে এ সমস্যা কোন নতুন ব্যাপার নয়। এর মাধ্যমে আন্দোলনের কোন ক্ষতি হওয়া দূরের কথা বাস্তবে আন্দোলন আরো শক্তি পায়, আন্দোলনের গতি সৃষ্টি হয়। বলতে গেলে শাস্তি ও কল্যাণপ্রত্যাশী জনমানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের এটাই হল প্রকৃত ও প্রকৃষ্ট সময়। ইসলামের বিরুদ্ধে যারা অপপ্রচার এবং সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয় তাদের সমাজ বিরোধী ও মানবতা বিরোধী চরিত্রের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের লোকদের তাকওয়া ভিত্তিক চরিত্র বিচার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমেই ছবর এবং ইন্তেকামাতের সাথে ঠান্ডা মাথায় এ পরিস্থিতি মুকাবিলা করাটাই আন্দোলনের দাবী। এদের মুকাবিলায় জনগণকে ব্যাপকভাবে সাথে পাওয়ার জন্যেও পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমেই এর মুকাবিলা করতে হবে। কিন্তু কোন কোন দুর্বল মুহূতে আন্দোলনের কর্মীদের মনে সন্ত্রাসের মুকাবিলা সন্ত্রাসের মাধ্যমেই করার চিন্তা ভাবনা জন্ম দেয়। সীমাহীন সন্ত্রাসের মুকাবিলায় এমন চিন্তা হওয়াটা মানবিক দুর্বলতাজনিত একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন এমন চিন্তাকে সুস্থ ও গঠনমূলক চিন্তা মনে করতে পারে না। মুসলিম বিশ্বের দু’একটি দেশের ইসলামী আন্দোলনের লোকদের মধ্যে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনার কুফল আমরা দেখেছি। সে সব দেশে এর মাধ্যমে একদিকে যেমন আন্দোলনের সম্ভাবনাকে অকালে শেষ করেছে, তেমনি আন্দোলনের আভ্যন্তরীণ সংকটেরও কারণ ঘটেছে। অতএব সন্ত্রাসের মুকাবিলা অবশ্যই করতে হবে। তবে তার জন্যে ইসলাম যে ছবর ও হিকমতের উপর গুরুত্ব দিয়েছে তার প্রতি যথার্থ খেয়াল রেখেই তার উপায় বের করতে হবে।

পরাশক্তির ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা

সমসাময়িক বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের উপর যেসব আঘাত এসেছে তার পেছনে কোথাও প্রত্যক্ষ কোথাও পরোক্ষভাবে কোন না কোন পরাশক্তি জড়িত। তাদের নিজেদের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ইস্যুতে যত মত পার্থক্য থাক না কেন, ইসলামী পুনর্জাগরণ ও আন্দোলন ঠেকাবার প্রশ্নে তারা এক ও অভিন্ন। এমনকি তাদের কৌশলও এ ক্ষেত্রে একই। তারা পুনর্জাগরণ আন্দোলন ঠেকাবার জন্য প্রধানত মুসলিম দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হবার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। তাদের মুখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের বুলি উচ্চারিত হলেও বাস্তবে তারাই মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বৈরতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে এবং নিজেদের মোড়লীপনা বহাল রাখার জন্য এসব দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা তারাই লালন করছে। আজবের মুসলিম দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও উচ্চাভিলাষী সামরিক জান্তাদের হাতে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে যাওয়ার মূল রহস্য এখানেই। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডে তাদের সহযোগিতাও এই কৌশলের বাইরের কোন ব্যাপার নয়। সম্প্রতি এনজিওদের মাধ্যমে জনগণের সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াসটাও আন্দের এই কৌশলের অন্তর্ভুক্ত। এইভাবে মুসলমানদেরকে ধর্মান্তরিত করা না গেলেও তারা ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি অনীহা সৃষ্টি বা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকেও নিজেদের একটা বিরাট সাফল্য মনে করে।তাছাড়া বর্তমানের প্রেক্ষাপটে তারা ইসলামের বিপ্লবী চেতনাকে চাপা দেয়ার জন্য সরকারী উদ্যোগে ইসলামের ধর্মীয় দিকের কিছু ছিটেফোটা আনুষ্ঠানিকতাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করা শুরু করেছে। রেডিও টেলিভিশনসহ গোটা প্রচার মাধ্যমই তারা এ কাজে ব্যবহার করে ধর্মপ্রাণ জণতাকে বোকা বানানোর অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। এভাবে জনগণের দৃষ্টিকে ইসলামের বিপ্লবী দিক থেকে ফিরিয়ে রাখার মাধ্যমে তারা ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলন ঠেকাতে চায়। এক্ষেত্রে এটা তাদের সর্বশেষ কৌশল। তাদের এ কৌশলসমূহ খন্ডন করে এর মুকাবিলার উপায় বের করা একান্তই অপরিহার্য। আজকের দিনে ইসলামী আন্দোলনকারী বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের জন্য এটা একটা বড় ধরনের মাখা ব্যথায় কারণ হিসাবে বিরাজ করছে। এজন্য একদিকে কিছু সংখ্যক লোককে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের ও স্ট্রাটেজি নির্ধারণের দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়োজিত হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনের লোকদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থাও সহায়ক হতে পারে। অপরদিকে ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি গণমানুষের মাঝে অত্যন্ত মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। ইসলামী জনতার মাঝে বিপ্লবী চেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের যাবতীয় পদক্ষেপের মুকাবিলায় জনগণকে স্বত:স্ফূর্তভাবে সাথে পাওয়ার মত পরিবেশ ও পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া দরকার।

সম্ভাবনা আজকের প্রেক্ষাপটে

আমরা এ পর্যন্ত যেসব সমস্যার আলোচনা করেছি, এগুলোর সমাধান কোন দুঃসাধ্য ব্যাপার নয়। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, মজবুত সংগঠন ও দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাহিনী তৈরী হলে এর ভিতর দিয়েই ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের স্বর্ণোজ্জল সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। প্রকৃত প্রস্তাবে দুনিয়ার ইতিহাসে অসম্ভব আয় সম্ভব বলে কোনকিছুর অস্তিত্ব নেই। দক্ষ, যোগ্য, সাহসী ও বলিষ্ঠ সংকল্পের অধিকারী লোকদের অসাধ্য সাধন করার ইতিহাস যেমন সত্য, তেমনি অযোগ্য, অদক্ষ ও দুর্বল চিত্তের লোকদের কারণে নিশ্চিত সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার ঘটনা দুনিয়ার ইতিহাসে কোন বিরল ব্যাপার নয়।

অতএব আমরা সমস্যার আলোচনা এজন্য করছিনা যে সমস্যার জটিলতা দেখে হাল ছেড়ে ঘরে বসে যাব। আবার সম্ভাবনার আলোচনাও এজন্য নয় যে, সড়াবনা থাকলেই চেষ্টা করা হবে, নতুবা হবে না। অথবা, যেহেতু সম্ভাবনা আছে অতএব তেমন কোন চেষ্টা সাধনার প্রয়োজন নেই, সাফল্য বা বিজয় এমনি এসে যাবে। বরং আমরা সমস্যার আলোচনা করছি মুকাবিলা করে সাফল্যের পথ উন্মুক্ত করার জন্য। আর সম্ভাবনার আলোচনা করতে চাই, তাকে সাধ্যমত কাজে লাগানোর জন্য।

আমরা এই সম্ভাবনার আলোচনা দুই ভাগে ভাগ করতে চাই। প্রথমে আলোচনা করতে চাই নেতিবাচক দিক। দ্বিতীয় পর্যায়ে আলোচনা করতে চাই ইতিবাচক দিক।

নেতিবাচক দিক

নেতিবাচক দিক বলতে ইসলামের প্রতিপক্ষের অর্থাৎ মানব রচিত মত ও পথের তথা জড়বাদী সভ্যতার দুর্বলতা ও ব্যর্থতার পটভূমিতে সৃষ্ট সম্ভাবনাকেই আমরা বুঝাতে চাচ্ছি। জড়বাদী সভ্যতার দুটো প্রধান রণ, ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র মানবজাতিকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করেছে। মানুষের সমাজে সত্যিকারের মনুষত্ব ও মানবতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে এ দুটো মতবাদের ফলে মানুষের সমাজে আজ পশুত্ব ও বর্বরতার প্রাধান্য চলছে। শান্তি ও কল্যাণের পরিবর্তে অশান্তি আর অকল্যাণেরই প্রসার ঘটছে। আজকের দিনে প্রাচ্য ও প্রতিচোর মানুষ এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তাই মানব ইতিহাসের একটা স্বাভাবিক নিয়মেই জড়বাদ ও বস্তুবাদের ব্যর্থতার প্রতি তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতিতে মানুষের মাঝে আধ্যাত্মিকতার প্রতি ঝোঁক প্রবণতা ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই কৌক প্রবণতা যেমন পাশ্চাত্যের ধনতান্ত্রিক বিশ্বে পরিলক্ষিত হচ্ছে, তেমনি সেই যবনিকার অন্তরালে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বেও লক্ষিত হচ্ছে। বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনসমূহ এই ঝোঁক প্রবণতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে গোটা দুনিয়াব্যাপী ইসলামের সঠিক চিন্তা-চেতনার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। অন্যথায় জড়বাদ ও বস্তুবাদের প্রতিক্রিয়া অর্থহীন ও প্রাণহীন আধ্যাত্মিকতাবাদের দিকে নিয়ে যেতে পারে। মতবাদের সুনিয়া এখন একটা টার্নিং পয়েন্ট এ অবস্থান করছে। ইসলামের সঠিক দাওয়াত বা বিপ্লবী চেতনা দক্ষতার ও যোগ্যতার সাথে উপস্থাপনাই এ সময়ের দাবী।

ইসলামের প্রতিপক্ষের দ্বিতীয় যে নেতিবাচক দিকটি আমাদের সামনে পরিষ্কার, তা হলো- মানব রচিত কোন মতবাদের পক্ষে স্রোত সৃষ্টিকারী, চমক সৃষ্টিকারী ক্ষণজন্মা যুগশ্লষ্টা ব্যক্তিদের আবির্ভাব আপাতত: আর ঘটছেনা। মানব সমাজকে নতুন কিছু উপহার দেয়ার মত উদ্রাবনী (ইজতেহাদী) যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বেরও বড় একটা পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে মানব রচিত মতবাদ আ পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হোক আর সমাজতান্ত্রিক মতবাদই হোক না কেন, বন্ধ্যাত্বের শিকারে পরিণত হয়েছে। ইসলামের প্রতিপক্ষের শক্তির তৃতীয় যে নেতিবাচক দিবটাকে আমরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে পাতি আহলো তাদের মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে চিন্তার বিভ্রান্তি তেমনি অপরদিকে রয়েছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব: যাকে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্ব আজ সংঘাতের মুখে, মানবতা আজ বিপর্যস্ত। এই দ্বন্দ্ব সংঘাতের ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে দুই পরাশক্তি, যাদের কারণে আজ গোটা দুনিয়ায় বিভিন্ন স্থানে মানবতা বিধ্বস্ত হতে চলেছে। এটাকে কেন্দ্র করে উভয় শক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমনে ঘৃণার তীব্রতা দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বা পরিণামে দুনিয়াজোড়া ইসলামী পুনর্জাগরণের পথকে প্রশস্ত ও সুখম করবে ইনশাআল্লাহ।

ইতিবাচক দিক

এক: সাধারণভাবে দুনিয়ার সর্বত্র, বিশেষভাবে মুসলিম দেশগুলোতে নতুন করে ইসলামকে জানার ও বুঝার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বত্র ইসলামের জ্ঞানচর্চা বিভিন্নমুখী তৎপরতা পরিচালিত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য যে, অ-মুসলিম চিন্তাবিদ ও পন্ডিত ব্যক্তিদের মাঝেও এ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ক্রমশঃই গতিশীল রূপ নিচ্ছে।
দুই: ইসলামকে জানার বোকার ক্ষেত্রে নিছক ধর্মীয় দিকটা প্রাধান্য না পেয়ে ধরা ইসলামের বিপ্লবী চিন্তা চেতনার চর্চাই প্রাধান্য পাচ্ছে। যারা ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলন ঠেকাতে চান, আজ তারাও এর প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারছেন বলে মনে হয় না। বরং, আজকের বিশ্ব জড়বাদী ও বস্তুবাদী সভ্যতার যাঁতাকলে নিষ্পেধিত হবার পর অনেকে শাস্তির ও স্বস্তির জন্য ইসলামকেই বিকল্প ভাবতে শুরু করেছে। আধুনিক যুগ জিজ্ঞাসার জবাবে মুসলিম বিশ্বের চিন্তানায়কদের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য আজ চিন্তার জগতকে প্রবলভাবে নাড়া দিতে সক্ষম হচ্ছে। জড়বাদী চিন্তাধারায় যেখানে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিয়েছে সেখানে ইসলামী চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রে গতিশীলয়া ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
তিন: বিশেষভাবে যে ব্যাপারটি আমাদের মনে আশার সঞ্চার করে তাহলো সমস্ত মুসলিম বিশ্বেরই ইসলামী বিপ্লবের চেতনাসম্পন্ন একটা নতুন বংশধর গড়ে উঠছে। এই নতুন বংশধর গড়ে উঠার ক্ষেত্রে একটা আশানুরূপ গতি পরিলক্ষিত হয়। ইসলামের বিপরীত শক্তি ও বিভিন্নদেশের যুবশক্তিই এতদিন পর্যন্ত ব্যবহার করে এসেছে। কিন্তু আজ ইতিহাসের একটি স্বাভাবিক পরিণতি স্বরূপ হোক আর ইসলামী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের অ্যাগ প্রিতীক্ষার ফলেই হোক বুবমানসে জড়বাদী সভ্যতার তুলনায় ইসলামী চিন্তা চেতনার আকর্ষণ দিন দিন বেশ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই নতুন বংশধরেরা নিছক একটা হবি হিসাবে এটা গ্রহণ করছে না বরং জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে ইতোমধ্যেই সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য জানমালের কোরবানীর ঝুঁকি নিচ্ছে। আজকের দিনে ইসলামী বিপ্লবের জন্যে শাহাদাত বরণের সৌভাগ্য মুসলিম উম্মার যুব সমাজই লাভ করতে সক্ষম হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে বাতিলপন্থীদের মুকাবিলায় ইসলামী চিন্তা গবেষণার ক্ষেত্রে ইজতেহাদী বা উদ্ভাবনী যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের যেমন আবির্ভাব ঘটেছে, তেমনি এখানে গতিশীলতাও লক্ষণীয়। এ কারণেই ক্রমবর্ধমান হারে বাতিলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমছে এবং ইসলামের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। খোদ বাতিলপন্থীদের মধ্যেও এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে ধনতন্ত্রের ধারক-বাহক হোক আর সমাজতন্ত্রের ধারক-বাহকই হোক, ইসলামের বিপ্লবী চেতনাকে ঠেকাবার জন্য ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার নামে নতুন নতুন কলাকৌশলের আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা এই যে, শর্তের ভিত্তিতে আল্লাহতায়ালা বিশ্বজোড়া ইসলামী খেলাফত দানের ওয়াদা করেছেন। সেই শর্ত পূরণের লক্ষ্যে আজ দুনিয়ার সর্বত্র সৎ ও যোগ্য লোক তৈরীর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। বাতিলপন্থীদের তুলনায় অন্তত: মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী সংগঠনগুলো ভুলনামূলকভাবে বেশী সংগঠিত, সুশৃংখল ও সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। এসব দেশে ইসলাম বিরোধী, সমাজতান্ত্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল ও শক্তি ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে আসছে। পক্ষান্তরে ঐসব শিবির থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেকেই ইসলামী আন্দোলনের দিকে ফিরে আসা শুরু করেছে। ইসলামের প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলো কোন না কোন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লেজুড়বৃত্তির কারণে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাধারণ জনমানুষের কাছে ক্রমেই ঘৃণার পাত্রে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে খোদ ঐ সব শিবিরের একাংশের মনে হতাশা-নিরাশা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকে নিষ্ক্রীয় হয়ে যাচ্ছে। এই সব ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক উপাদান হিসাবে কাজ করছে। আল্লাহ ইসলামী আন্দোলনের সর্বস্তরের জনশক্তি বিশেষ করে নেতৃস্থানীয়দের এসব সুযোগের পূর্ণ সদব্যবহার করার যোগ্যতা দিয়ে বিশেষভাবে সাহায্য করুন। আমীন

© Bangladesh Jamaat-e-Islami

  • আমাদের সম্পর্কে
  • প্রাইভেসি পলিসি
  • যোগাযোগ
কোন ফলাফল নেই
সকল ফলাফল দেখুন
  • নীড়
  • সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
  • বিভাগ ভিত্তিক
    • আল কুরআন
    • আল হাদিস
    • ফিকাহ
    • দাওয়াত ও তাবলিগ
    • ঈমান ও আক্বীদাহ
    • আমল-আখলাক ও মুয়ামালাত
    • ইসলাম ও ইবাদাত
    • পারিবারিক ও সামাজিক জীবন
    • ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
    • সীরাত ও ইতিহাস
    • সীরাতে সাহাবা
    • নারী
    • রাজনীতি
    • অর্থনীতি
    • বিবিধ
  • কর্মী সিলেবাস
  • রুকন সিলেবাস
    • রুকন সিলেবাস (স্বল্প শিক্ষিত)
    • রুকন সিলেবাস (শিক্ষিত)
  • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (শিক্ষিত)
    • বাৎসরিক পাঠ্যসূচি (স্বল্প শিক্ষিত)
  • উচ্চতর অধ্যয়ন
  • অডিও বই
  • অন্যান্য
    • দারসুল কুরআন
    • দারসুল হাদিস
    • আলোচনা নোট
    • বইনোট
    • প্রবন্ধ
    • বুলেটিন
    • স্মারক
    • ম্যাগাজিন
    • এপস
    • রিপোর্ট বই
    • ছাত্রী সিলেবাস

@BJI Dhaka City South